কে বলতে পারে বুদ্ধবাবুর পটকার পিছনে এমন কোনো চক্রান্ত নেই? তা না হলে মাসাধিক কাল ধরে হাজার হাজার পুলিশ-গোয়েন্দা-কুকুর, পার্টি ক্যাডার–সব দিয়ে তন্ন তন্ন তল্লাশির পরও কারো চোখে পড়ল না এক ধান ক্ষেতের উপর দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া তিন মাইল লম্বা সেই তারটা? যা পটকার সাথে যুক্ত?
জিন্দালের দরকার হাজার হাজার একর জমি। এর জন্য উচ্ছেদ করতে হবে আদিবাসীদের। এমন অবস্থা সৃষ্টি করতে হবে যেন তারা ঘরবাড়ি ফেলে জলের দরে জমি জায়গা বেচে পালাতে বাধ্য হয়। তাই ও পটকা মাওবাদীরা ফাটিয়েছে, এই অঞ্চলে মাওবাদী আছে এই অজুহাতে আদিবাসীদের উপর হামলে পড়ল প্রশাসন। শুরু হয়ে গেল খুন আর ধর্ষণের এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। তবে এটা ঠিক যে ও তরফ থেকেও মাঝে মাঝে পাল্টা মার দেওয়া হতে লাগল।
সারা দেশ উত্তাল হয়ে উঠল এই সব ঘটনায়। ছাত্র, শিক্ষক, লেখক, গায়ক, অভিনেতা, চিত্র পরিচালক, সমাজের সর্বস্তরে শোনা গেল ধিক্কার ধ্বনি–ছিঃ মুখ্যমন্ত্রী ছিঃ!
এখন সারা দেশে আগুন জ্বলছে সর্বত্র জমছে লাশের গাদা। দীর্ঘ তিরিশ বত্রিশ বছরে সিপিএম দলটাকে এমন বিপদের সামনে কোনদিন পড়তে হয়নি এখন তারা ক্ষমতাকে ধরে রাখার চেষ্টায়, এমন সুখের সাম্রাজ্য চলে যাবার আশঙ্কায় মরিয়া ক্ষিপ্ত-উন্মাদ। যেখানে দেখছে সামান্য বিরোধ চরম আঘাত হানছে। তৃণমূল, কংগ্রেস, এস.ইউ.সি এমনকি আর.এস.পি, ফরোয়ার্ড ব্লক–কেউ রেহাই পাচ্ছে না। আর জঙ্গলমহল? শ্মশান হয়ে যাচ্ছে।
বধির স্কুলের তিরিশ পঁয়ত্রিশ জন কর্মী। সবাই সিপিএম। বাইরের আগুনের তাপে তারাও উত্তপ্ত। মনোভাব এমন যেন হাতে বন্দুক দিলে এখনই একটা তৃণমূল বা মাওবাদী মেরে আসবে।
আমি যেন এখানে ওই দুই দলের প্রতিনিধি। চালাও আক্রমণ।
পঞ্চপাণ্ডব আমার উপর রেগে তো ছিলই তার সাথে যোগ দিয়েছে বাল্যবন্ধু, মাদার, আদুরি গোঁসাই আর মণ্ডল।
পঞ্চ পাণ্ডব অফিসিয়াল ব্যাপারে তাদের যা ক্ষমতা তা দিয়ে আমাকে জব্দ করতে চায়। অন্য তিন জন সাথে দুতিনজন আশ্রিতকে নিয়ে আমার রান্না করা খাবারে সুযোগ পেলে নুন-বালি মিশিয়ে দিয়ে বোবা বাচ্চাদের আমার উপর খেপিয়ে তোলে। আর মাথা মোটা, খুনের কেসের রাজসাক্ষী, সে চেষ্টা চালায় গ্যাস সিলিন্ডারের ক্ষতি করে কোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে আমাকে পুড়িয়ে দিতে, উড়িয়ে দিতে।
আমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই যে সে-ই ওসব করছে। কিন্তু সে ছাড়া আর কে বা এত দুঃ সাহসী আছে যে এত মাথা মোটার মতো কাজ করবে? হতে পারে সে, হতে পারে অন্য কেউ, আমি জানি না। তবে কে বা কারা যেন একদিন ওভেন আর গ্যাস পাইপের সংযোগ স্থলের নাট রেঞ্জ দিয়ে আলদা করে রেখে দেয়। আমি যখন গ্যাস ওভেন জ্বালাই আমার ডান হাতে একটা শিকের মাথায় ন্যাকড়া জড়ানো কেরোসিন তেলে ভেজানো মশাল থাকে। সেটা ওভেনে চেপে রেখে বাঁ হাতে সিলিন্ডারের মুখের চাবি ঘোরাই!
এবার এই নাট খুলে রাখার কারণে গ্যাস ওভেনে পৌঁছাবে না। বের হবে সেই খোলা জায়গা থেকে যা আমার শরীর থেকে এক ফুট দূরে। বড় ওভেনে তার খুলে রাখা পাইপ থেকে গলগল করে বের হয়ে আসা গ্যাসে আমার হাতের মশাল থেকে মুহূর্তে আগুন ধরে যাবে। লেগে যাবে আমার লুঙ্গিতে–পুড়ে যাব আমি। অনেক হিসেব কষে দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের ফলে কোনো এক মাথা থেকে এই বুদ্ধি বেরিয়েছে। তবে আমার সৌভাগ্য, এটা করা হয়েছিল দুপুরে আমি বাড়ি চলে যাবার পর রান্না ঘর ফাঁকা পেয়ে। বিকালে কী এক কারণে যেন আমি কাজে আসতে পারিনি। ফলে আমার জায়গায় রান্না করতে গিয়ে আমার সহকারি বিপদে পড়ে। আগুন ঠিকই জ্বলে ছিল, সে কোনোক্রমে ছিটকে গিয়ে বেঁচে যায়।
এরপরে আবার সেই গ্যাস সিলিন্ডারে কারিকুরি করা হল দিন কয়েক পরে দুপুরে আমি না থাকা সেই অবসরে। সকালে ওভেন ভালোই ছিল–রান্নাও করেছিলাম সেই ওভেনে। বিকালে ওভেন জ্বালাতে গিয়ে দেখি এবার কে যেন ওভেন আর রেগুলেটারের মধ্যেকার গোল যে চাকতি যা গ্যাস চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে সেটা খুলে বের করে ফেলে দিয়েছে। এখন আমি সেই চাবি ঘোরাবো, গলগল করে বের হওয়া সেই গ্যাস সন্নিকটে জ্বলতে থাকা আর একটা ছোট ওভেন-যেটায় ডাল সেদ্ধ বসিয়ে আমার বড় ওভেন জ্বালানোর কথা তা থেকে সিলিন্ডারের মুখে আগুন ধরে যাবার সম্ভাবনা আছে। এতে গ্যাস ভরা সিলিন্ডার ব্লাস্ট হয়েও যেতে পারে। তখন আর আমি একা মরব না। অন্য কেউও যেতে পারে। আমার সহকারিও হতে পারে।
কিন্তু সে সব কথা তখন ভাববার মতো মানসিক অবস্থা আমার শত্রুদের ছিল না। তবে শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে সেবারও আমি বেঁচে যাই। আগুন ধরার আগে দ্রুত যথেষ্ট ঝুঁকি নিয়ে চাবি ঘুরিয়ে গ্যাস বন্ধ করে দিতে সক্ষম হই।
আবার একবার ক্ষতি করা হয় গ্যাস ওভেনের। ওভেনের একেবারে নীচে যে সরু তামার পাইপ সেটা সাঁড়াশি দিয়ে চেপে দেওয়া হয়। ভর্তি সিলিন্ডারে প্রচণ্ড গ্যাসের চাপ থাকে। সেই চাপে ধীরে ধীরে গরম আর নরম হয়ে যাওয়া পাইপ কোনো এক সময় ফেটে যেতে পারে। আমি দুর্ঘটনায় পড়তে পারি সেই আশায় এটা করা হয় এবং এটা যে কোনো মানুষের দ্বারা কৃত সেটা বলে–ওভেন মিস্ত্রি বাবু দাস। যার গ্যাস ওভেন সারাইয়ের দোকান আছে।
