না, আমি পারিনি। আমি মনে করি খাদ্য নষ্ট করা একটা সামাজিক অপরাধ। খাবার নষ্ট করলে বাচ্চাদেরও ধমক দিই। অভ্যাস বসে একবার তো আমার সেই ভাই-গণেশের মেয়ের বিয়েতে এক নিমন্ত্রিত পাতে প্রায় গোটা পঁচিশ তিরিশ রসগোল্লা নিয়ে ফেলে চলে যাচ্ছিল বলে–তাকেও ধমকে দিয়েছিলাম। “ও রিক্সা চালায়। বহু কষ্টে মেয়ের বিয়ে দিচ্ছে। তোমাকে নিমন্ত্রণ করে ও কী কোনো ভুল করেছে? এইভাবে ওর ক্ষতি করছো? খাও ওগুলো, খেয়ে তারপর ওঠো।”
এই কারণে আমার ধারণা হয়, আদুরি টিচার ইনচার্জের গোপন নির্দেশে বস্তায় আলু ঢুকিয়ে দিয়েছে। আমিও সুযোগের সন্ধানে থাকি কবে মওকা পাই।
আর একবার এসে গেল সরস্বতী পূজা। এবারও আমার নামে দেড়শো টাকা চাঁদা। তখনো মাইনে হয়নি, হাত ছিল একেবারে খালি। দয়া করে স্কুল দিয়ে দিল, পরে বেতন থেকে কেটে নেবে। এমনিতে আমি নাস্তিক–সে জন্য নয়, স্কুলের পূজো হোক বা কোনো অনুষ্ঠান আমার ভালো লাগে না। কষ্ট হয়, কারণ কাজের চাপ বেড়ে যায়। এমনিতে রোজ প্রায় দেড়শো লোক খায়। সরস্বতী পূজায় তাদের বাড়ির লোক স্কুলের স্টাফ, বড় সাহেবের কিছু নিমন্ত্রিত সব মিলিয়ে প্রায় চারশো লোকের রান্না করতে হয় সেদিন। স্কুল ছুটি থাকে, সবাই পকেটে হাত ঢুকিয়ে ঘোরে আর খেটে মরি আমি। এটাতেই সবচেয়ে কষ্ট!
সেদিন প্রতিবারের মতো ফল প্রসাদ কাটার ভার পড়েছিল আদুরি গোঁসাই ও মাদারের উপর। প্রতি বারের মতো সেদিনও ফল কাটার ফাঁকে ফাঁকে একটা দুটো করে আপেল, কলা, কমলা সরিয়ে ব্যাগে ঢোকাচ্ছিল। যা পরে দুজনে ভাগ করে নেবে।
এরপর বড় সাহেবের আপ্যায়নে আসা অতিথি অভ্যাগতদের জন্য আনা ‘আশীর্বাদের’ মিষ্টি, কাজু, চিপস, বিস্কুক থেকেও যা সটকানো গেছে, সবার পাতে দুটো করে দেবার পর যে কটা রসগোল্লা রয়ে গেছে, নিজের জন্য এক বালতি খিচুড়ি আধ বালতি পায়েস, সবটা মিলিয়ে যা বোঝা হয়ে গেল, তা একা আদুরি গোঁসাইয়ের পক্ষে বয়ে নেওয়া কঠিন। এরপর আবার আছে, রান্নার পরে যা বেঁচে গেছে সেই চাল ডাল নুন মশলা আলু আরো কত কী!
খিচুড়ি পায়েস পর্যন্ত আমার সহন ক্ষমতার মধ্যে ছিল। এরপর আর থাকলো না। এই চাল ডাল তেল নুন কেনার পিছনে আমারও কষ্টে টাকা আছে। আমার ছেলে একটু খিচুড়ি খেলে আজেবাজে কথা বলা হয়, তাহলে এই কঁচা মাল সব আদুরি নিয়ে যায় কোন্ অধিকারে?
তাই রিক্সার হ্যান্ডেল চেপে ধরলাম, চাল ডাল যাবে না।
টিচার ইনচার্জ আর কেরানি রায় আদুরিকে বাঁচাবার চেষ্টা বলে, যেতে দিন। এর একটা দাম ধরে নেব। সেই টাকা পরের বছরের পূজার চাঁদার সাথে যোগ করে নেব।
আমি বলি, তবে নিলাম হোক। যে বেশি দাম দেবে সেই নেবে। কিন্তু আমার প্রস্তাব কারো মনোমত না হওয়ায় অবশেষে সেই বাড়তি চাল ডাল গুদামে জমা করে দেওয়া হয়। পরে একদিন বোবা বাচ্চাদের তা দিয়ে খিচুড়ি খাওয়ানো হয়।
.
এটা সেই সময়–এটা সেই ভয়ঙ্কর সময় যখন সিঙ্গুর ব্লকের জমি অধিগ্রহণ সমাপ্তি হয়ে গিয়েছিল। জমির চারদিকে উঁচু পাঁচিল ঘিরে জমির দখল নিয়েছিল টাটা বাবুরা। নন্দীগ্রাম জ্বলছে। মানুষকে ভিটে মাটি থেকে উচ্ছেদ করার জন্য সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে এক বর্বর সরকার।
এটা সেইভীষণ কাল–যখন জিন্দাল নামক এক বহুজাতিক কোম্পানির কাছে জঙ্গল মহলকে বিক্রি করে দেবার চক্রান্তের অঙ্গ হিসাবে মুখ্যমন্ত্রীর গাড়ি চলে যাওয়া পথের উপর পটকা ফাটানো হয়েছে একটা। কেউ মরেনি কেউ আহত হয়নি, শুধু শব্দ, তাও মুখ্যমন্ত্রী চলে যাবার মিনিট দশেক পরে। আর এই ঘটনাকে শিখণ্ডি করে সারা জঙ্গলমহল জুড়ে পৈশাচিকতাণ্ডব চালাচ্ছে সিপিএমের পুলিশ। গড়ে উঠেছে জনসাধারণের মধ্য থেকে একটা গণ প্রতিরোধ কমিটি। এই কমিটিতে এমন বহু মানুষ এসেছে যারা আগে সিপিএম করত।বহু মানুষ আসেনি–দলেইআছেকিন্তু তারা সিপিএমের এই তাণ্ডবের পক্ষে নয়। কে বা কাহারা যেন রাতের অন্ধকারে পাইকারি হারে এদের খুন করছে। খুনের পরে পাশে ফেলে যাচ্ছে একটা পোেস্টার। মাওবাদ জিন্দাবাদ।
এই প্রসঙ্গে আমার একটি গল্প মনে পড়ছে। গল্পটা শোনা, কাজেই কিছু তথ্যের ভুল থাকতে পারে। একবার নাকি হিটলারের সে দেশে বেড়ে ওঠা কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের নিকেশ করার শখ চাগাড় দেয়। তাই তার লোক এক জেলখানায় চলে যায়। গিয়ে যেখানে বন্দী কিছু কুখ্যাত অপরাধীকে বলে তোমাদের একটা কাজ করতে হবে। যদি তোমরা তা করো জেল থেকে ছাড়া পেয়ে যাবে, কিছু টাকাও দেওয়া হবে। তোমাদের জীবন সুখে কেটে যাবে। তবে কাজটার বিষয় কাউকে কিছু বলা চলবে না।
কী কাজ? না রাইখস্ট্যাগ নামের একটা জায়গা আগুন দিয়ে পোড়াতে হবে। তারা রাজি হয়ে যায়। এরপর তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ-নির্দেশ দিয়ে রেডগার্ডের পোষাক পরিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয় রাইখস্ট্যাগে। আর সাদা পোষাকে প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করা হয় সেখানে, যাদের প্রতি আদেশ থাকে যদি কেউ কোনো ধ্বংসাত্মক কার্য করে, গুলি করে মারবে। একটাও যেন বেঁচে না যায়।
অপরাধীরা এত রাজনীতি জানবে কী করে। তারা সরকারের সহযোগিতা করছি এই ভেবে মনের আনন্দে সরকারি-বেসরকারি ভবনে আগুন ধরায়। আর তারপর পুলিশের গুলিতে মারা পড়ে। সেই মৃতদেহ দেখিয়ে হিটলার প্রচার করে এটা কমিউনিস্টদের কাজ। আর তার কমিউনিস্ট নিধন জেলে পোরার কোনো বাধা থাকে না।
