রাতে যখন সেই বহিরাগত বোবা স্কুলে আশ্রয় প্রাপ্ত লোকজন খেতে আসে ওয়ার্ডেন আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে তাদের বলে–শুধু বাটাম দেওয়া দরকার। আর কিছু না ভালো মতো বাটাম পড়লে সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। মরিচঝাঁপির মালগুলোকে যেরকম দেওয়া হয়েছিল–চারদিক থেকে ঘিরে সেই রকম বানালে আর মাথা তুলতে পারবে না।
এই মানসিকতার লোক আমার কাছে একটা ঘৃণিত নর্দমার পোকা। ফলে যে কোনো বিষয় নিয়ে সে কথা বলুক ঝগড়া তর্কাতর্কি বেধে যাবেই। তবে সেদিন সে ঝগড়া ছিল আগের চেয়ে অনেক বিষ বাক্যে ভরা। যার পরেই খুনোখুনি হতে পারত।
ঝগড়া কোন পর্যায়ে যাবে, তা নির্ভর করে বিবদমান দুজনের মনে কতখানি বিষবাষ্প আছে তার উপর। তখন কথার উপর কথা, কথার উপর কথা চাপাতে গিয়ে দুজনেই ভুলে যায় আসলে ঝগড়াটা কী নিয়ে শুরু হয়েছিল। তাই এক সময় সে যখন বলে, আপনাদের মতো মানুষের সাথে আমার ভদ্রভাবে কথা বলাই উচিত না, আমার জবাব থাকে, যে, আপনি চাইলেও পারবেন না। ভদ্রতা কাকে বলে আপনি জানেনই না।
সে বলে আমার ধৈর্য্যের পরীক্ষা নেবেন না। আমার ভদ্রতাকে আমার দুর্বলতা ভাববেন না, তাহলে ভুল করবেন।
আমার জবাব, ভদ্র ব্যবহার যেমন দুর্বলতা নয়, অভদ্র ব্যবহারকেও সবলতা বলে না। আপনার কোনো ধমকিতে আমি ভয় পাচ্ছি না। হোন অধৈর্য, আমি দেখি।
সে বলে-রিক্সা চালাতেন, ভদ্রলোকের সাথে মেশেননি। কী ভাবে কথা বলতে হয় কিছুই জানেন না। একবার দুবার টিভি পেপারে নাম উঠলে কিছু হয় না।
আমার জবাব–আমি যাদের সাথে মিশি, এ জনমে তো তাদের সাথে মিশতে পারবেন না। চেষ্টা করে দেখুন যদি পর জনমে কিছু হয়। মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত, আপনার দৌড় ওই বড় সাহেব পর্যন্ত। লেজ নড়ে হাতির জোরে। যেদিন হাতি ফঁদে পড়বে লেজ কোথায় যাবে।
সে বলে-ছোট বেলা থেকে মারধোর খেয়ে বড় হয়েছেন। ওই ভাষা ছাড়া আপনারা ভালো কথা বোঝেন না।
আমার জবাব–শুধু মার খাইনি, কতো লোককে চিৎও করে দিয়েছি। তেমন হলে এখনো পারি। কামারপাড়ার কার্তিককে শুইয়ে দিয়েছিলাম। জানেন? এখন পারি।
সে বলে-পারুন দেখি, কেমন পারেন।
আমি বলি, আগে আপনি কতটা যেতে পারেন গিয়ে দেখান। তবে তো। এই সেই বর্ডার লাইন–যার ওপাশে ধারালো বটি। তবে সে পর্যন্ত যাবার আগে ঝগড়া থেমে যায় সেদিন। পিছু হটে এক দাম্ভিক রুনুর চেলা হার্মাদ।
.
এক মহিলার নাম আদুরি গোঁসাই। তার কাজ দুপুরে কয়েক কাপ চা বানানো, বিকালে কৌটো মেপে বাচ্চাদের একটু মুড়ি দিয়ে দেওয়া। সে জানে এত আরামের সরকারি চাকরি করতে হলে তার জন্য কিছু ত্যাগ অবশ্যই থাকা দরকার। তাই বেশ কিছু ছোট ছোট বাটি কিনে রেখেছে। আদুরি গোঁসাই জানে হৃদয়ের রাস্তা শুরু হয় পাকস্থলি থেকে। তাই রোজ ডিউটিতে আসার সময়ে ওইসব বাটিতে কিছু না কিছু ভরে নিয়ে আসে। এবং যারা স্কুলে প্রভাবশালী–ইচ্ছা করলে ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে। তাদের টিফিন টেবিলে যথা সময়ে পৌঁছে দেয়। সে কারণে পঞ্চ পাণ্ডব তার উপর ভীষণ প্রীত। আদুরি গোঁসাইকে রায় আর বড়দি খুব ভালোবাসে। আদুরিও ওই দুজনকে ভগবান ভাবে। যাদের মুখের যে কোন বাক্য তার কাছে বেদ বাক্য।
সেই যেবার আমার টিচার ইনচার্জের সাথে বচসা হয়, তার দিন কয়েক পড়ে সিঁড়ি থেকে পা পিছলে পড়ে আমার সহকারি কোমরে চোট পেয়ে কিছুদিন কাজে আসতে পারে না। বাচ্চাদের রান্না খাওয়ার দেরি হয়ে যাচ্ছিল বলে সে সময় সকালের দিকে একটু আদুরি গোঁসাইকে পাঠানো হয়, আমাকে সাহায্যের জন্য।
তখন তিনতলার ছাদে রান্না হত। আর তরিতরকারি কাটার পর খোসাগুলো একটা আলুর বস্তায় ভরে রাখা হতো। বস্তাটা ভরে গেলে আমি ছাদ থেকে নীচে ফেলে দিলে পৌরসভার সাফাই কর্মীরা নিয়ে যেত।
একদিন রোজকার মতো বস্তা ফেলছি। তখনই মনে হল রোজকার মতো নয়–বস্তা কিছু ভারি। ছুটে নীচে গিয়ে বস্তা খুলে দেখি খোসার মধ্যে একগাদা আলু। বুঝতে পারি এটা আদুরির কীর্তি। আমাকে সাবার জন্য পাতা একটা ফঁদ। সেই দিন গেটে ডিউটি দিচ্ছে সাহা, যে রায় এবং বড়দির আর এক বিশ্বস্ত। যে মাঝে মাঝে আমার ব্যাগ চেক করে, যদি কিছু পায়। যেই বস্তা নিয়ে পৌরসভার লোক রওনা দেবে, সাহা গিয়ে বস্তা চেক করবে। প্রমাণ হয়ে যাবে পৌরসভার লোকের সাথে সাঁটগাট করে এভাবেই আমি চাল ডাল আলু সব পাচার করি।
সে পরিকল্পনা ফেল মেরে গেল কারণ মালটা আমি ধরেছি। তখন ব্যাপারটা এইভাবে চাপা দেওয়া হল আদুরিদি বুড়ো মানুষ। বুঝতে পারেনি মনে হয়। বস্তায় আলু আছে। খোসা ভেবে ভরে দিয়েছে।
হতে পারে। সেটাও হতে পারে। তবে আমার সন্দেহ ভুলে নয়, ওটা করা হয়েছিল পরিকল্পনা অনুসারেই।
পঞ্চপাণ্ডব পাঁচ ভাই, কিন্তু মাতা তো দুই। সৎ ভাইয়ের সাথে সৎ ভাইয়ের কিছু মনোমালিন্য তো থাকেই। এখানেও আছে। টিচার ইনচার্জ আর কেরানি রায় একদিকে, অন্যদিকে বাকি তিন। এই গ্রুপ সেই গ্রুপকে সব সময় বিপাকে ফেলার চেষ্টা করে।
তখন একদিন টিচার ইনচার্জের সাথে হোস্টেল সুপার-এর খুব ঝগড়া হয়ে গেছে। আমার সাথে ঝগড়া তো রোজ চলে। তাই একদিন আমাকে ডেকে সুপরামর্শ দিয়েছিলেন বড়দি, এক গামলা ভাত তরকারি বেঁধে জমাদারের ড্রামে ঢেলে নষ্ট করে দিন। হোস্টেলে থাকেনা, বাচ্চাদের দেখেনা, সুপারকে আমি একটু টাইট দিই। আচ্ছা করে কড়কানি দিয়ে দেব। পারবেন?
