কমিউনিস্ট পার্টিকে ধ্বংস করার জন্য বুর্জোয়া শ্রেণি এখন এই পদ্ধতির প্রয়োগ করেছে। তাদের বেতনবোগী কিছু লোককেঢুকিয়ে দিচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে যারা পার্টির মধ্যে অনুপ্রবেশ করে আসল কমিউনিস্টদের চেয়ে বড় বড় আদর্শের বুলি কপচে, আর নিজের চারপাশে তারই মতো নকল কমিউনিস্টদের ভিড় করে সংখ্যাধিক্যের সমর্থনে দখল করে নেয় সর্বোচ্চ ক্ষমতা। তারপর ভেতর থেকে ক্ষইয়ে ধ্বংস করে দেয় সংগঠন।
এই পদ্ধতির দ্বারা তারা সোভিয়েত রাশিয়াকে সতেরো টুকরো করে দিয়েছে। নির্জীব হীনবল করে দিয়েছে অতবড় একটা শক্তিশালী দেশকে। যা আকাশ থেকে পরমাণু বোমা ফেলেও করতে পারত না বিশ্ব পুঁজিবাদীদের প্রভু আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদীরা।
আমাদের এই দেশ আমার ধারণায় ছয়ের দশক থেকে বুর্জোয়া শ্রেণি তাদের বেতনভোগি-তাবেদার একটা গোষ্ঠীকে ধীরে ধীরে অনুপ্রবেশ করিয়ে দিয়েছে কমিউনিস্ট দলগুলোর মধ্যে। যে সব দল এখনো সংগ্রামের মধ্যে আছে তাদের পক্ষে ওইসব লোককে শনাক্ত করা সহজ। কিন্তু যে দল সংগ্রাম বিমুখ, সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে পা দিয়ে নিজেকে আটকে ফেলেছে ক্ষমতার চিটেগুড়ে, তারা কী করে ভেজাল লোকদের চালুনি ছাটা করবে? লড়াই, আন্দোলন, সংগ্রাম–যা দিয়ে কে কতটা মার্কসবাদী জনদরদী পরখ করার যে বাস্তববাদী পদ্ধতি সে তো আর নেই। আসল নকল সব নেতা-ই নাদুস ভূঁড়ি নিয়ে শীততাপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে জনসেবা সারছে।
ফলে, ধীরে ধীরে জনগণ এদের উপর বিরূপ হয়ে গেছে। নকল কমিউনিস্টরা তো এটাই চায়। তারা এমন সব কাজ করে এবং করায়, মানুষ যেন ওই নাম, ওই দলের পতাকা দেখলে ঘৃণায় থুতু ফেলে। পশ্চিমবঙ্গে সেটা তারা খুব সুচারুভাবে করে দিতে পেরেছে। এখন এই বাংলায় আর কাউকে চোর-ডাকাত-খুনে-ধর্ষক বলে গাল দেবার দরকার পড়ছে না, শুধু একটা শব্দ বললেই সবটা বলা হয়ে যাবে। মমতা ব্যানার্জী যার নতুন নাম দিয়েছে হার্মাদ। এই হার্মাদ বিশ্লেষণ থেকে মার্কসবাদের আত্মা আমার ধারণায় আর কোনদিন মুক্তি পাবে না। ঘটনাচক্রে আমি এই রকম একদল লোকের মধ্যে এসে পড়েছি। চেষ্টা তো বহুবার করেছি এখান থেকে বের হয়ে যাবার। কিন্তু কোথায় যাব, কে দেবে আহার আর আশ্রয়, সেই ভাবনায় রয়ে গেছি এতগুলো বছর। এতগুলো বছরের মধ্যে এমন একজনও কাউকে পাইনি যে আমার পাশে দাঁড়াবে।
যে মানুষগুলোর মধ্যে থাকি এদের বাবা কাকা দাদা মামা সব তো একদিন সত্যিকারের জনদরদী ছিল। মানুষকে ভালোবেসে একদিন তোতারা বহু দুঃখকষ্ট স্বীকার করেছে। সেই মানুষগুলো আজ এত বদলে গেল কীভাবে।
এখন দোষারোপ করা হয় নিচের তলার কর্মীদের দিকে। আসলে প্রথমে পতন পচন দূষণ বিচ্যুতি–সব কিছু শুরু হয়েছিল ওপরতলার নেতাদের মধ্যে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকার ফলে, ক্ষমতার মোহ-দর্প-দম্ভ-অহঙ্কার এবং আরো দীর্ঘকাল ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখার যে সব ঘৃণ্য অপচেষ্টা–তা ক্রমে ক্রমে উপর থেকে চুঁইয়ে নেমে এসেছেনিচে। যা এখন চারিয়ে গেছে সংগঠনের শাখা প্রশাখা থেকে শেকড়ে বাকড়ে। সংগঠনের নেতা কর্মী সদস্য সমর্থক কেউ আর মুক্ত থাকতে পারেনি ওইমরণ ভাইরাস থেকে। যার ফলে মাত্র চৌত্রিশ বছরে মরে গেল সে, যার শত শত বছর বেঁচে থাকা উচিত ছিল।
তখন সিঙ্গুরের জমিহারাদের প্রবল আন্দোলন চলছে। একশো চুয়াল্লিশ ধারা জারি করে, চাষিদের পিটিয়ে, রাজকুমার ভুলকে খুন করে, তাপসী মালিককে ধর্ষণ এবং পুড়িয়ে মেরে তাদের মনোবল ভাঙার চেষ্টা পূর্ণ উদ্যমে চলছে। ২০০৬ সালে মোটামুটি সিঙ্গুরকে কিছুটা শান্ত করে ২০০৭ সালে সিপিএম-এর পুলিশের পোষাক পরা ক্যাডার আর ক্যাডারের ভূমিকা পালন করা পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়েছে নন্দীগ্রামের নিরীহ মানুষদের উপর–খুন আর ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ আর অপহরণ নির্বিচারে চলছে।
আমার পরিচয় তখন আর কারো অজানা নেই–আমি মহাশ্বেতা দেবীর বাড়ি যাই। সে কথা সবাই জানে। মহাশ্বেতা দেবীর কলমে তখন আগুন ঝরছে, সূর্য সমান অনল আর অনির্বাণ তেজে লড়ে যাচ্ছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক কলম কা সিপাহি।
যখন মমতা ব্যানার্জী ধর্মতলায় অনশন বসেছিলেন, সেখানে এসেছিলেন মেধা পাটেকর। আমি তার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। চারিদিকে তখন বহু টিভি ক্যামেরা চলছিল। কোনো এক ক্যামেরায় কে জানে উঠে যায় আমার ছবি যখন আমি মেধা পাটেকরের সাথে কথা বলছিলাম। এক ঝলক–সেই ছবি দেখে যে আমাকে চেনার চিনে নেয়।
তখন এই স্কুলে কে যেন একখানা দামি টেলিভিশন দান করেছে। সেখানা বসানো হয়েছে আমাদের নতুন রান্নাঘরের কাছে একটা দরজার ওপাশে একটা বড় কামরায়। সন্ধের পরে ওয়ার্ডেন আর বেশ কিছু সিপিএমের কট্টর সমর্থক বসে বসে টিভি দেখে। আর যখনই নন্দীগ্রামে সিপিএমের হার্মাদ বাহিনীর হাতে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির কোনো পরাজয় ঘটে–পিছু হটে, কেউ গুলিবিদ্ধ হয়–সেই খবর দেখে এরা এমনভাবে চিৎকার করে ওঠে-যেন খেলার মাঠে সৌরভ কোনো ছক্কা মেরেছে। চিৎকার করে এমনভাবে যেন আমার কানে যায়। মন পোড়ে।
পোড়ে, খুব মন পোড়ে আমার। তখন ইচ্ছা করে তাপসী মালিক, রাধারানী আড়ি, নর্মদা শীটকে যারা ধর্ষণ করেছে। এরা সেই ধর্ষক। এদের একটাকে….।
