রান্নাঘরে রান্না আমরা করি, কোনদিকে ওভেনটা বসালে আমাদের কাজে সুবিধা হবে, সেটা আমরা বুঝি। কিন্তু না, সেখানে বসাতে দেবে না। বসাতে হবে ওয়ার্ডেনের পছন্দমতো জায়গায়। আমাদের অসুবিধা হলেও। আর সে তাই চায়। বিকৃত মানসিকতার মানুষ, মানুষকে বিপদে ফেলে কষ্ট দিয়ে অসুবিধা ঘটিয়ে পৈশাচিক আনন্দ পায়। রুনু গুহ নিয়োগী মহিলা বন্দীদের যোনীতে গরম ডিম সেদ্ধ ঢুকিয়ে দিত। এ তারই ভক্ত।
ফলে যা হবার তাই ঝগড়া। ছুঁড়ে মারা ভাষার আর কোনো যা বাপ থাকে না। আসলে এতে কোনো সাধারণ ঝগড়া নয়, এক দলকশ্রেণির বিরুদ্ধে এক দলিতের প্রতিবাদ। একটা হার্মাদ পার্টির হার্মাদ সরকারের হার্মাদ সদস্যের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের নিজস্ব ভঙ্গি।
.
এই সময় মমতা ব্যানার্জী সিপিএম-এর আশ্রিত ডাকাত, গুণ্ডা, ধর্ষক, প্রমোটার, ঠিকাদার সবকিছুর সম্মিলিত বাহিনীকে একটা নতুন নাম দিয়েছেন-হার্মাদ। এর আগে বলতেন ভৈরব বাহিনী। ভৈরব শিবের আর এক নাম। শিব সারল্য-সাহস-ন্যায়নিষ্ঠ-স্মরণাগত রক্ষক, নির্লোভ এক দেব। তারই বাহিনীর নাম ভৈরব বাহিনী। সিপিএম দুবৃত্তদের এই নাম যথোপযুক্ত নয়। সেটা কানা ছেলেকে পদ্মলোচন বলা। তাই হার্মাদ। যা একটা বিদেশি, দস্যু লুঠেরা দলের নাম। সিপিএমের পক্ষে যথার্থ নাম।
এই সময় ছোট আঙারিয়ার হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়ে গেছে। সীতারাম ইয়েচুরি, প্রকাশ কারাত, জ্যোতি বসু, বিনয় চৌধুরী নয়–দলের সম্পদ হিসাবে সামনের সারিতে চলে আসছেতপন-সুকুর, মজিদ মাস্টার এইসবনাম। যে সিপিএম একদা বলেছিল টাটা বিড়লারা শোষক-দেশের জনগণের শত্রু। তারা এখন মনোভাব বদলে টাটাকে কমরেড় বানিয়ে নিয়ে হুঙ্কার দিচ্ছেন “টাটার কেশাগ্র স্পর্শ করতে দেবনা।” যেতা করতে চাইবে–”মাথা ভেঙে দেব”। যে সালেম একদিন ইন্দোনেশিয়ায় লক্ষ লক্ষ কমিউনিস্টদের হত্যা করেছিল, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এক সিপিএম নেতা, তার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের লুঠ করায় খোলা ছুট দিয়ে আনন্দে গদ গদ চিত্তে মৌ চুক্তি স্বাক্ষর করে বলে উঠলেন এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দের দিন।
যেদিন তিনি প্রথম পার্টি মেম্বার হলেন–সেদিন নয়, যেদিন প্রথম বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এল সেদিন নয়, যেদিন তিনি মুখ্যমন্ত্রী হলেন সেদিনও নয়, সর্বাপেক্ষা আনন্দের দিন সেদিন, যেদিন দেশের কৃষকদের সর্বনাশের পথ প্রশস্ত করার পথে প্রথম পা রাখলেন। এত দিনে বোঝা গেল সিপিএম দলটাকে রাজনৈতিক এইচআইভি-র জীবাণু পুরোপুরি কবজা করে নিয়েছে। শ্রমিকশ্রেণির একনায়কতন্ত্রের বদলে পুঁজিবাদী সমাজতন্ত্রের যে পথে তারা হাঁটা দিয়েছে ওই পথ আমেরিকার বড় পছন্দের।
এক সময় শুনতাম মার্কসবাদ সর্বশক্তিমান। আর আমরা সেটা বিশ্বাসও করতাম। এখন দেখেছি সব ‘বাদ’-এর চেয়ে শক্তিমান–পুঁজিবাদ। পুঁজির এত ক্ষমতা যে, আগমার্কা মার্কসবাদীকেও রূপোর জুতোর তলে পিষে দিতে পারে। যে কারণে যে কমিউনিস্ট পার্টি একদিন বলতে টাটা বিড়লা গোয়েঙ্কা ডালমিয়া–এই সব বৃহৎ পুঁজিপতিরা এ দেশের সবচেয়ে বড় শত্রু, কিছুকাল পরে সেই দলেরই এক নয়া নেতা হুঙ্কার দেয়-কাউকে টাটার কেশাগ্র স্পর্শ করতে দেব না। সর্ব শক্তিমান পুঁজির কী মহিমা!
কমিউনিস্ট পার্টি ও তার গণ সংগঠন ইস্পাতের মতো দৃঢ় আর মজবুত হয়। বাইরে থেকে একে যত আঘাত করা হোক কিছুতে কোন ক্ষতি করা যাবে না। বরং যত আঘাত পড়বে তা আরো মজবুত হবে, শক্তিবৃদ্ধি ঘটবে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ-নকশালবাড়িকে সামনে রেখে গড়ে ওঠা আন্দোলন। শাসক শ্রেণি তাকে তীব্র আক্রমণ চালিয়ে সত্তর দশকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। কিন্তু ধ্বংস হয়েছে কী? তারা আবার নবরূপে নিজেদের সংগঠিত করেছে, শক্তি বৃদ্ধি করেছে। যা ছিল একটা ছোট জেলার আন্দোলন–এখন আঠারোটা প্রদেশকে কবজা করে ফেলেছে। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও স্বীকার করতে হচ্ছে এই বিপদের কথা।
এটা পুঁজিপতিরাও জানে। অভিজ্ঞতা দিয়ে তারা জেনেছে এবং নতুন কৌশল আবিষ্কার করে নিয়েছে।
আমরা সবাই জানি এইডস্ এক মারাত্মক মারণ রোগ। এর কোন ওষুধ নেই। রক্তের সঙ্গে বীজাণুবাহী রক্তের সংমিশ্রণে এই রোগ হয়ে থাকে। মানব দেহের শিরা-উপশিরায় যে প্রবহমান রক্তস্রোত, এর মধ্যে শ্বেত কণিকা নামের একটি ক্ষুদ্র প্রাণ আছে। যারা বাইরে থেকে কোন জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলে আক্রমণ করে মেরে ফেলে। সাধারণ কোন অসুস্থতায় ওষুধ না খেয়েও আমরা সেরে উঠি।
কিন্তু এইচ আই ভি-র ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঘটে অন্যরকম। এই জীবাণুগুলো খুব চালাক। তারা জানে যে, শ্বেত কণিকা দিরামোফোব। তাই শরীরে প্রবেশ করার তিন-চার দিনের মধ্যে এরা এদের আকৃতি বদলে নেয়। ধারণ করে নেয় শ্বেত কণিকার মতো আদল। ফলে, আসল শ্বেত কণিকা ধোঁকা খেয়ে যায়। আপন জন স্বজাতি ভেবে আক্রমণ করে না আর। আসল শ্বেত কণিকার মধ্যে মিশে রয়ে যায় ওই নকল শ্বেত কণিকা। এরপর সে তার বংশবৃদ্ধি শুরু করে। আসল শ্বেত কণিকা যদি মিনিটে একটা করে সংখ্যা বৃদ্ধি করে, সে করে দশটা-বিশটা। এর ফলে একদিন আসল কোণঠাসা হয়ে পড়ে নকলের চাপে।
এরপর যখন মানব শরীরে কোন রোগ-যক্ষ্মা টাইফয়েড ম্যালেরিয়ার জীবাণু প্রবেশ করে, আসল শ্বেত কণিকা হলে সেতাকে আক্রমণ করত–কিন্তু নকল তা করে না। ফলে, বিনা প্রতিরোধে সেই রোগ মানুষকে মেরে ফেলতে কোন অসুবিধার সম্মুখীন হয় না।
