বলি-আমি তো দাদাকে বলেছি।
কী কইছো?
জেনারেটার চালাতে।
সে জেনারেটার চালায়?
উনি কাকে যেন চালাতে বললেন।
কারে?
আমি ঠিক জানি না।
তেড়ে এলেন উনি আমার দিকে, ওঠো, দেখো গিয়া। কে চালায়।
আমি উঠি না, চেয়ারে বসেই থাকি। বসে বসেই বলি, যাকে বলার বলেছি, উনি কাকে যেন বলছেন। পাঁচ দশ মিনিট দেখি।
কইলেই হইয়া গেল। ওঠো চেয়ার থিকা।
তবু আমি উঠি না। ওনার হম্বিতম্বিকে আমলই দেই না। এটা ওনার বড় সম্মানে লেগে যায়। আর তাই এক ধাক্কায় আমাকে চেয়ার থেকে নীচে ফেলে দেন। উনি লোককে মারতে বড় ভালোবাসেন। প্রতিবন্ধী মালি, নাইট গার্ড সাহা, দু-চারটে বোবা বাচ্চা একবার তো মাস্টার দাসকে পেটে বুকে দুমদাম ঘুষি মেরে দিয়েছিলেন। যারা এই বাবুর হাতে মার খায় তাদের বলার মতো কোনো জায়গা নেই। শোনাবার মতো কোনো লোক নেই। সেই মনোবলে আজ আমাকেও মেরে বসেছেন।
কিন্তু আমি আমি তো সেই মানুষ, যে, শ্রদ্ধেয়দের শ্রাদ্ধ করার সুযোগ পেলে আর ছাড়তে পারি না। এখানে যে তেমন কেউ আছে তা তাদের আচার আচরণে বোঝাই যায় না।
এরা শক্তিমান। শক্তির উৎস, একটি রাজনৈতিক দলের ঝাণ্ডা এবং ডাণ্ডা। তবে সম্মানীয় কেউ নয়। অন্ততঃ আমার কাছে। তাই আমাকে মেরে আজ তিনি পার পেলেন না। মাটি থেকে উঠে সজোরে আমিও দিয়ে দিলাম এক ধাক্কা। বোঁটা কাটা কুমড়োর মতো বিশাল ওজোনদার দেহ নিয়ে পতিত হলেন মাটিতে।
তারপর আর তিনি এই স্কুলে কারো গায়ে হাত দেননি। পুরো অহিংস।
.
একদিন মণ্ডল পদবির একটা ছেলের সাথে মারামারি হয়ে গেল। মারামারি নয়–মার। এক চড় জমিয়ে দিলাম তার গালে। গ্রাম থেকে আসা মাথা মোটা ছেলে। কেউ তাকে বাড় খাইয়েছিল। তাই তার ধারণা হয়েছিল–আমি একটি অপমানযোগ্য প্রাণী। হাঁটুর বয়েসী তবু তুই তোকারি করে কথা বলত। কেউ তাকে উস্কে দিয়েছিল। বারণ করলে আরো বেশি করত। বেশ মজা পেয়ে গিয়েছিল।
এই স্কুলের কেউ নয়–আশ্রিত। যাদের ভয়ে সে পাড়া ছেড়ে পালিয়ে এসেছে তারা সিপিএম। যারা তাকে আশ্রয় দিয়েছে, তারাও সব সিপিএম। একেই বলে রাজনীতি। সেই যে, সেবার যার পরিচিতি… ডাক্তার বলে, সে মার্ডার হয়। সেই কেসের কার্য-কারণ অনুসন্ধানে অঞ্চলের অনেকের সন্দেহের তির বড় সাহেবের দিকে গিয়েছিল।… ডাক্তার সিপিএম নেতা, যারা তাকে খুন করে তারাও সব ওই পার্টির লোক। হতে পারে কেউ তাদের বুঝিয়েছিল, ডাক্তার লোকটা ঠিক নয়। গোপনে দল বিরোধী কাজ করছে। ওকে সরিয়ে দাও। সেই কেউ, ওদের তিন লক্ষ টাকাও দিয়েছিল বলে জানা যায়। জানা যায় না তার পরিচয়।
এই খুনিদের দলে মণ্ডল ছিল। যখন … ডাক্তার তার ডাক্তারখানা বন্ধ করে ভ্যান রিকশা চেপে বাড়ি ফিরছিল, মাঠের মধ্যে তাকে খুনিরা গুলি করে, চপার দিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলে। অকুস্থলে সে ছিল না। ছিল একটু দুরে। খুনিরা পালিয়ে যাবার সময়ে তার কাছে তিরিশ হাজার টাকা আর তাদের সাইকেল রেখে যায়।
গোটা দলটা ধরা পড়ার পর সে রাজসাক্ষী হয়ে যায়। তাকে থানা থেকে মুক্ত করা, এখানে এনে রাখা, কোর্টে নিয়ে গিয়ে সাক্ষী দেওয়ানো, এই পুরো প্রক্রিয়াটা বড় সাহেবের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়। খুনিদের চারজনের যাবজ্জীবন সাজা হয়। আর বড় সাহেব তার ভূমিকার জন্য যেটুকু যা বদনাম হয়েছিল তা মুছে যায়। যে… ডাক্তারের খুনিদের প্রতি এত নির্মম, তার নামে… ডাক্তারের হত্যার দায় চাপানো একটা হিমালয় তুল্য ভুল।
সেই থেকে মণ্ডল সপরিবারে এই স্কুলে আছে। বড় সাহেবের অনেকটা বাড়ি। সেইসব বাড়ির বাগানটাগানগুলোর দেখাশুনো করে। রাজার বাড়ির কুকুর রাজার এঁটো খায়, তাই তার মধ্যে প্রকাশ পায় রাজকীয় দম্ভ। বড় সাহেবের আগে পিছে ঘুরঘুর করে তার ধারণা জন্মে গেছে সে আমাকে অপমান করতে পারে। সেও একজন কেউকেটা–তাই তুই তোকারি।
আমি যখন রিকশা চালাতাম, তখনই কেউ ওই ভাষায় কথা বললে তাকে ছাড়তাম না। এখন কেন ছাড়বো।
বলি তাকে পাঁচিলের মধ্যে আছি তাই ওইসব কথা বলে পার পেয়ে যাও। এখানে আমার হাত পা বাঁধা। যদি হিম্মত থাকে একবার গেটের বাইরে গিয়ে তুই তোকারি করে দেখাও।
সে ছুটে গেটের বাইরে গিয়ে দাঁড়ায়, কী করবি কর, বান্ডিল করে দেয় রে।
আমি আর কী করি? মদন হয়ে যাই এক মুহূর্তের জন্যে। সেই বাইশ চব্বিশ বছরের মদন। হাত চালিয়ে দিই।
.
আর একদিন, সেদিন–
না, কোন মারপিট হয়নি। তবে হতে পারত। যেভাবে গায়ের কাছে ধেয়ে ধেয়ে আসছিল। আমি অপেক্ষা করছিলাম, আগে ও আমার গায়ে হাত দিক। আর তা দিলে আমি জানিনা, কী হয়ে যেত। একটা ধারালো বঁটি ছিল আমার নাগালে।
ব্যাপারটা আর কিছু নয়–ইগো। আমি তোমার ‘অফিসার”। আমি বলছি, সেটা ভুল হোক ঠিক হোক, মানতে হবে। মানাবো তোমাকে দিয়ে।
রান্নাঘরের জন্য একটা নতুন ওভেন আনা হয়েছে। দুটো ছিল এখন তিনটে হল। এবার থেকে তিনটে বড় ওভেনে রান্না হবে। তোক বেড়ে গেছে খাবার। প্রায় ষাটটা মেয়ে এসেছে নার্সিং ট্রেনিং নিতে রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে। তারাও এখানে খাবে।
এখানে এটা হয়, এক বধির স্কুলের রন্ধন শালায় দশটা অন্য সংস্থার রান্না খাওয়া হয়। এনার্জি পার্ক, সম্মিলনী প্রেস, রুবীর কাছে কেকের দোকান মনজিনিশ, বিগ বাজারে কাছে এক এক অসুধের দোকান, এখানকার বি.এড, কলেজ, কোথাকার এক এস.টি.ডি.বুথ পাশের এক সেলাই কারখানা–কত জায়গার লোক যে এখানে খায় কে জানে। তারা মাস গেলে টাকা দেয়। কে নেয়, তা কে জানে!
