জনগণ, এ এক বড় বিচ্ছিরি জীবের নাম। এরা কখন যে কী করে বসে জ্যোতিষের বাপের সাধ্য নেই বলে দেবে। মানুষ নামের এই জীবরা খেপে গেলে ক্ষমতাবানকে এক মুহূর্তে ক্ষমতার চূড়া থেকে টান মেরে মাটিতে ফেলে দিতে পারে। ফলে তারা ফুঁ দিয়ে দিয়ে চা খাওয়ার পথ পদ্ধতি নেয়। ধীরে ধীরে তারা এগুতে থাকে একটা সুনিয়োজিত পরিকল্পনা অনুসারে। তারা এমন একটা পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায় আমিও যেন সন্দীপবাবুর মতো কাউকে কিছু না বলে রাতের অন্ধকারে কেটে পড়ি।
.
রমা এক মহিলা, এসেছিল হোস্টেলের মেয়েদের দেখাশুনো করার কাজে। সে বড়ই সাহসী আর স্বাভিমানী ছিল। কাউকে বিশেষ পাত্তা দিত না। মাদার চাইত পদানত করবে, সে চাইত স্বাধীন থাকবে, এই নিয়ে একটা শীত-যুদ্ধ শুরু হল দুজনার মধ্যে। রমার ছিল মানসিক শক্তি আর মাদারের পিছনে ছিল সুপার ও ওয়ার্ডেন। হঠাৎ একদিন দেখা গেল চারদিকে কানাঘুসো হচ্ছে। কী ব্যাপার? না, রমার স্বভাব ভালো নয়। রমার স্বামী থাকে দেশে, সে এখানে থাকে একা দোতলার লেডিস হোস্টেলে। রাতকালে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে চুপচাপ সে নাকি নীচে নেমে যায়। কোথায় যায়? যায় এক দ্বারোয়ান-যার বউ বিহারে রয়েছে, সে এখানে থাকে একা, তার কাছে। প্রমাণ স্বরূপ এখানে ওখানে ব্যবহৃত নিরোধ পাওয়া গেল বেশ কদিন ধরে বেশ কয়েকটা। সেই খবর একদিন কেঁদে ঝাঁকিয়ে বড় সাহেবের কানে দিয়ে এল মাদার ফলে এখান থেকে তাড়িয়ে দিলেন বড়সাহেব। লজ্জা অপমানে মাথা নীচু করে চলে গেল সে।
মাঝে আর একটা মেয়ে এসেছিল সুপ্তি নামে। সেও মাদারের মনোমত না হওয়ায় চোখের জলে নাকের জলে হয়ে চলে যায়। এরপর আসে কানন। সে বেচারার বিয়ে হয়নি। আর হবেও না। জগতে তার তেমন আপন কেউ নেই। এখানে একটা কাজ পেয়ে ভেবেছিল জীবনটা এই সব মেয়েদের সাথে কেটে যাবে। খুব ঠাণ্ডা খুব নরম, সাত চড়ে রা কাড়েনা, হাঁটলে মাটি টের পায় না–এমন শান্ত মহিলা। কেন কে জানে তার পিছনেও লেগে গেল মাদার। রোজ ঝগড়া, নোংরা ভাষায় কদর্য গালাগালি দিয়ে তাকে অতিষ্ট করে তুলল। শেষে সেও কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে গেল।
এবার এই মাদারকে উসকানি দিয়ে লাগিয়ে দেওয়া হল আমার পিছনে।তিন তিনবার সফলতার কারণে মনোবল তার তুঙ্গে। মাছ চুরি ধরা, দুধ নেওয়া নানাবিধ কারণে সে আমার উপর ক্ষিপ্ত তো ছিলই। বলে না–একে মা মনসা, তার উপর ধুনোর গন্ধ। পিছনে খুঁটির জোর পেয়ে সে হামলে পড়ল তার গালাগালি অস্ত্র নিয়ে।
একদিন–সেদিন তখনো বাচ্চাদের টিফিন দেওয়া হয়নি, মাপের মুড়ি-বাতাসা থেকে ইচ্ছেমতো বাতাসা ভরে নিচ্ছল একটা ঠোঙায়। অত একা নেবেন না। আমার সবাইকে দিতে হবে। বাধা দিলাম আমি। তখন একটু ঝগড়া মতো হয়ে গেল। একটু ঝগড়া, তাতেই তুই তোকারি। যে ভাষায় উনি বললেন আমিও জবাব দিলাম সেই ভাষায়। আমি তখনো অসহায় এক মহিলা-কাননের উপর অত্যাচারের কথা ভুলতে পারিনি। তাই বয়স্ক বলে সম্মান দেবার ব্যাপারটা মাথায় ছিল না।
তখনকার মতো ব্যাপারটা থেমে গেল। তখন সময় সকাল সাতটা। তিন ঘন্টা পরে ওয়ার্ডেন এল তার বাচ্চা গোনা ডিউটিতে। তখন ফুঁসতে ফুঁসতে মাদার ছুটে এল তার সামনে নালিশ নিয়ে বাবা, এই কুত্তার বাচ্চাকে বারণ করে দাও, আমার সাথে যেন লাগতে না আসে।
কুত্তার বাচ্চা। ছোট্ট দুটো শব্দ। মাথার মধ্যে যেন দপ করে আগুন জ্বলে উঠল। ভুলে গেলাম কোথায় আছি। আমার সামনে পিছনে ডানে বামে কারা দাঁড়িয়ে আছে। ছুটে গেলাম তার দিকে শুয়োরের বাচ্চা, আর একবার বল কি বললি, তোর পেটের উপর পা তুলে দিয়ে জিভ টেনে ছিঁড়ে নেব। আমাকে কানন পেয়েছিস নাকি। মারব শালী, দাঁতফাঁত সব পেটে ঢুকে যাবে।
পাল্টা আক্রমণ এত তীব্র হবে সে বুঝতে পারেনি। একটু মিইয়ে গেল। তবে ফোঁস করতে ছাড়ল না–আমি রজতকে বলব। রজত মানে বর্ধমানের সাইবাড়ি খুনে কেসের এক আসামি।
চিৎকার করে জবাব দিই আমি বোলো, যাকে ইচ্ছা বোলো, কী করবে আমাকে? খুন করবে? আসতে বোলো।
বলার দরকার নেই, এটা নিয়ে পরে একটা ঝড় উঠেছিল। দু-একটা শুকনো পাতা উড়েছিল। তবে তা আমার কাছে তেমন কিছু নয়।
এর কিছুদিন পরে, ময়দানে নামলেন বাল্যবন্ধু। এ যেন সেই কুরুক্ষেত্রের মহারণ। এক সেনাপতির পতন হলে তার জায়গা নিচ্ছে অন্য আর একজন। সেদিন রাত আটটা নাগাদ লোডশেডিং হয়ে গিয়েছিল। স্কুলে জেনারেটর আছে।বললে যে চালাতে জানে, সে চালিয়ে দেয়। আমি চালাতে জানি না। শিখিনি।
আমি আর আমার সহকারি দুজনে রান্না ঘরে ছিলাম। এমন সময় ঝুপ করে অন্ধকার। একটা ফেজ গেছে, তাই রান্নাঘর অন্ধকারে ডুবে গেলেও অন্য বিল্ডিং-এ আলো আছে। আমি অন্ধকার হাতড়ে বাইরে এসে ‘ডানহাত’-কে সামনে পেয়ে বললাম তাকে, জেনারেটর চালাতে হবে। সে আবার ফোনে কাকে যেন নির্দেশ দিল–জেনারেটর চালাও। অন্ধকার, আমি এখন কী করব? যতক্ষণ আলো না জ্বলে কাজ করা যাবে না। তাই বলে পড়লাম একটা পাতানো চেয়ারে–বাইরের আলোয়।
এই সময় কী করতে যেন রান্নাঘরে যাচ্ছিল বাল্যবন্ধু। অন্ধকারে বাধা পেয়ে ফিরে এসে দেখে, আমি বসে আছি। বড় সাহেবের বন্ধু, গলায় তার সেই দর্প দম্ভ অহঙ্কার অধিকার। সেই অধিকার এখন বর্ধিত হয় আমার উপর। তুমি এইখানে ঠ্যাংয়ের উপর ঠ্যাং দিয়া বইসা আছে, একজোন ওইখানে একলা ভূতের নাহান বইয়া আছে। কোন চিন্তা নাই তোমার।
