সেদিন লজ্জা অপমানে মাটিতে মিশে যাচ্ছিলাম আমি। সবাই বড় মজা পেয়ে মুখ টিপে হাসছিল। একমাত্র প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিল ‘ছোটজাত’সমপাল। সে এই স্কুলের জমাদার-এ্যাই, ইরোকাম বোলবিনা, বোলবি নাই-ই রকম। আমাদের সোব্বার বাচ্চা আছে, এ্যাকজনকে বোলছিস, সোব্বার গায়ে লাগছে।
এই ঘটনা নিয়ে স্কুলে পরে তুলকালাম হয়েছিল, যাতে রায়কে ক্ষমা চাইতে হয়। সেটা সে স্বেচ্ছায় নয়, চেয়েছিল চাপে পড়ে। তাই সে রাগ আজও রয়ে গেছে। একটা মেয়ের অপমান হলে সেটা যেমন সমগ্র নারী জাতির অপমান, একটা বাবুশ্রেণির লোকের মান গেলে অপমান বোধহয় সব বাবু সমাজের। রায়ের ক্ষমা যাচনায় তারই সমমনস্ক আর এক বাবুর বুকে বড় লেগেছিল। যার ধারণায় ক্ষমা চাওয়ানোটা একটু বাড়াবাড়ি। রায়দার মুখের ভাষাটা একটু ঠিক নয়, তাবলে সে যা বলেছে, কথাটা তো ভুল না। স্কুল একটা প্রাইভেট সেক্টর। যে ইচ্ছা ঢুকে গেল, যার ইচ্ছা খেতে বসে গেল–এই নিয়ম চলে না।
যে রায় স্কুলের সামান্য খিচুড়ি খাওয়ায় একদিন জ্বলে উঠেছিল, সেই তিনি একদিন লক্ষ লক্ষ শোনা যায় দশ লাখ, খেয়ে ধরা পড়ে গিয়ে এখন বড় মনমরা জীবন কাটাচ্ছেন।
তবে তখন, বড় সাহেবের ওই আদেশের বলে, ওয়ার্ডেন আমার উপর রায়ের অপমানের একটা বদলা নেবার অস্ত্র পেয়ে গিয়েছিল পেট টিপে পরীক্ষা-মুখ গুঁকে গন্ধ পরীক্ষা, এই সব শুরু করেছিল। আসুন আসুন–এদিকে আসুন। কী ব্যাপার, পেটটা এত মোটা কেন! এতেকী ঢোকালেন? মুখে ভাজা মাছের গন্ধ মনে হচ্ছে।
সে যাইহোক, সেদিনের শ্রদ্ধানুষ্ঠান গণ্যমান্য অতিথিদের উপস্থিতিতে সুসম্পন্ন হয়ে গেল। যাদের শোক খুব বেশি তারা ভাত ফাত না খেয়ে এক প্লেট মিষ্টি, কিছু কাজু বাদাম এইসব খেয়ে চলে গেলেন। সেদিন বাবু আমাকে বার দশেক দেখেও না দেখার ভান করে মুখ ঘুরিয়ে রইলেন। উনি চলে যাবার পর আমার মনে হল, এত শোকের নীচে সম্ভবত সেই আনন্দবাজার জনিত ছোট্ট শোকটা চাপা পড়ে গেল। কিন্তু তা যে যায়নি টের পেলাম দিন পনের পরে।
সেদিন কিছু উদারমনা প্রতিবন্ধী দরদী গণ্যমান্য লোককে নিয়ে তিনি বোবাদের স্কুল পরিদর্শন করাতে নিয়ে এলেন। তারা মানব সেবার এমন মহৎ কর্ম চর্মচক্ষে অবলোকন করে কত টাকার চেকে সই করলেন তা কে জানে। তবে তারা বিল্টুদায় হবার পর বড় সাহেব ধরলেন আমাকে প্রতিবাদ পত্র পাঠিয়েছিলেন?
বলি–নিজে গিয়ে দিয়ে এসেছিলাম।
ছাপা হয়নি তো! কার কাছে দিয়েছিলে? আমি খোঁজ নেব।
এখন কী বলি আমি কার ঘাড়ে দোষ চাপাই? এক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে বলি–ঋজু বসু ছিলেন না, কোথায় যেন গিয়েছিলেন। রিসেপশান কাউন্টারে যে মহিলা ছিলেন, তিনি বললেন–চিঠি লেটার বক্সে ফেলে দিন। তাই করেছিলাম।
কী লিখেছিলে চিঠিতে কপি আছে?
আমি জানতাম, এমন একটা সমস্যা আসতে পারে। প্রস্তুত হয়েই আছি। একটা চিঠি লিখে আসলটা ছিঁড়ে কুচিকুচি করে হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে তার জেরক্সটা বয়ে বেড়াচ্ছিলাম ব্যাগে।এখন সেটা বার করি–এই যে।
পড়।
পড়ি সেই চিঠি। মাননীয় সম্পাদক মহাশয়, আপনাদের পত্রিকায় গত ৩ এপ্রিল ২০০৬ তারিখে ঋজুবসুর প্রতিবেদন–মহীরুহনয়, লড়াকুবটের চারাই তার প্রেরণা–বিষয়ে এইপত্রের অবতারণা। একজন অতি সাধারণ মানুষের জীবন সংগ্রাম নিয়ে যে দরদ যে আন্তরিকতায় শ্রী বসু প্রতিবেদনটি লিখেছেন, তার জন্য ওনাকে কোন্ ভাষায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব তা আমার জানা নেই। তবে আর একটু ভালো হতো, যদি বড় সাহেবের বিষয়ে কিছু কথা থাকত। ওনার অনুগ্রহ না পেলে আশ্রয় এবং অন্ন সমস্যার সমাধান হতো না। আর তা না হলে এমন নিশ্চিন্তে সাহিত্য সাধনায় নিমগ্ন থাকতে পারতাম না। আশা করি আমার এই চিঠিখানি প্রকাশ করে এই ভুলের সংশোধন করবার একটা ব্যবস্থা নেবেন।
নীচে আমার সই এবং তারিখ। চিঠির বয়ানে উনি কী সন্তুষ্ট, নাকি চিঠি ছাপা না হবার জন্য ক্রুদ্ধ, মুখ দেখে বোঝা গেল না। আমি কিছু বুঝিবা না বুঝি, যারা বোঝার তারা বুঝে গেল, আমার দ্বারা একটা গর্হিত অপরাধ হয়ে গেছে। যেটায় বড় সাহেব মনে বড় ব্যথা পেয়েছেন। যে খরগোশ বাঘের মনে কষ্ট দেয় তাকে শেয়ালে মারলে তার উপর বাঘ খুশি বই অসন্তুষ্ট হয় না। যারা আমার প্রতি নানা কারণে ক্রুদ্ধ তারা এবার বুঝে নেয় এবার মনের ঝাল ঝাড়ায় আর বাধা রইল না।
আমার পিছনে কোনো দাদা, মামার খুটির জোর নেই, যা তাদের আছে। তবু আমি মাথা নত করি না, এ কী সহ্য হয় কারো!
তবে রাগে তারা একেবারে অন্ধ বা দিশেহারা হয়ে যায় না। অনেকটা দুর তারা দেখতে পায়। আমি তাদের বলে দিয়েছি, আমার চাকরি চলে গেলে, ছাড়িয়ে দিলে, আমি কী করব বলে দিয়েছি, আমার আদর্শ মুম্বাইনগর পালিকার বরখাস্ত কর্মী খেরনার। যে একা একটা আন্দোলন হয়ে উঠেছিল। তখন জনগণের চাপে বাধ্য হয়ে তাকে পুনঃবহাল করতে হয়েছিল। আমি তাই করব। টিভিতে, পত্রিকাতে যেভাবে আমার কথা লেখা, বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের জনগণের সহানুভূতির কেন্দ্রে পোঁছে গেছি। এটাই আমার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। তাদের কাছে বিচার চাইতে যাব। তখন কী হবে?
ওরা বোঝে–আমি শহিদ শঙ্কর গুহ নিয়োগীর আন্দোলনে ছিলাম। ফলে পশ্চিমবঙ্গের গণসংগঠনগুলোর আমার প্রতি একটা টান থাকা স্বাভাবিক। গল্প লিখি। লিখতে এসেছি একেবারে নীচের তলা থেকে। ফলে নীচের তলের মানুষ আমাকে নিজেদের লোক মনে করতে পারে। আমাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দিলে জনমানসে শহিদের মর্যাদা পেয়ে যাব। সেটা সঠিক হবে না।
