তখনও কেউ আমাকে বলে দেয়নি যে আক্রমণই আত্মরক্ষার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়। সে শিক্ষা দিল সেই অস্থির অবিশ্বাসী সময়ের উদ্ভুত এক পরিস্থিতি। তখন আর আমার এ কথা মনে করবার মতো অবস্থা বা অবকাশ ছিল না, ওরা এক একা কিশোরকে পেয়ে ভয় দেখিয়ে একটু মজা পেতে চাইছে। কিনা! চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম, কোথাও কোন জনমানব নেই। রাস্তার পাশের নিরেট দেওয়ালের ওপাশের মানুষগুলো বিশ্ব জগৎ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ঝড়ের মধ্যে বালির ভিতর মুখ গুঁজে পড়ে থাকা উটের মত নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। তাকালাম আমার ডাইনে বাঁয়ে সামনে পিছনে। দেখলাম সামান্য কিছু দূরে একখানা আধলা ইট পড়ে আছে। এ সেইইট যা একবার আমার জীবন বাঁচিয়ে ছিল। সারা দেশটায় এখন শেয়াল কুকুরে ভরে গেছে। এ সময়ে মানুষকে বাঁচতে হলে বারবার ইট পাথর তুলতে হবে।
ওরা কিছু বুঝে উঠবার আগে বিদ্যুৎ গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে কুড়িয়ে নিলাম আধলা খানা তারপর সমস্ত শক্তি দু-হাতে সংহত করে সেটা বসিয়ে দিলাম চাকু বাগিয়ে থাকা ছেলেটার ব্রহ্মতালুতে। এটা সেই জায়গা যেখানে সাধারণ একটা আঘাতে মানুষ মরে যেতে পারে। ইঁটের একটা কোন বসে গেল মাথার মাঝখানে। ছিটকে নিচে পড়ে গেল তার ধারাল চাকু। গোঁ গোঁ করে সে লুটিয়ে পড়ল পথের ধুলোর উপরে। চাকুটা কুড়িয়ে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ালাম আমি–আয় এইবার কেডা আবি। কিন্তু তারা কেউ এগিয়ে এল না। আহত সঙ্গীকে পেলে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালাল অন্ধকারের মধ্যে।
ছোটবেলায় প্রচণ্ড রোগে ভুগেছিলাম। কোনদিন পেট ভরে খেতে পাইনি। সে কারণে শরীরটা ছিল খুবই রোগা আর দুর্বল। আমার বয়সে যে ভাবে বাচ্চাদের শরীর বৃদ্ধি পায় আমার তা হয়নি। ফলে খেলাধুলোয় আমি সব সময় হেরে যেতাম। কারও সাথে ঝগড়া মারামারি হলে মার আমিই খেতাম। সেই আমি–পরাজিত দুর্বল অক্ষম আমি আজ বিজয়ী হয়েছি। আমার পায়ের কাছে এখন পড়ে আছে সবল সশস্ত্র প্রতিপক্ষ। যার গরম রক্তের ছিটে লেগে রয়েছে আমার হাতে। জীবনে কখনও একটা ইঁদুরও মারতে পারিনি। পারব সে বিশ্বাসটাই মরে গিয়েছিল। এখন মনে হচ্ছে, পারি। আমিও মারতে পারি। আর মারতে যখন শিখে গেছি বাঁচাটাও শিখে নিতে পারব।
আমার আর এরপর বিড়ি নিয়ে সেই দোকানে ফিরে যাওয়া হল না। কে জানে পালিয়ে যাওয়া ওই ছেলেরা কেউ হয়ত আমাকে চেনে। কোন দোকানের কর্মচারী সেটা জানে। ওরা এতক্ষণে নিজেদের মহল্লায় গিয়ে খবরটা নিশ্চয় দিয়েছে। তখন মহল্লার লোক অবশ্যই ধাওয়া করে আসবে চা দোকানের দিকে। আমাকে নাগালে পেলে ধরে পাঠা কাটা করে দেবে। তাই পালিয়ে গেলাম দোকান মালিককে কিছু না বলে, আমার পাওনা পয়সাও না নিয়ে।
সেদিন সেই ভয়ানক রাতে আমার দিগ্বিদিক কোনও জ্ঞান ছিল না। অর্ধচেতন অধঅচেতন একটা বোধশূন্য ঘোরের মধ্যে কেবলই ছুটে যাচ্ছিলাম সামনের দিকে। সর্বক্ষণ মনে হচ্ছিল আমার পিছনে পিছনে কেউ তাড়া করে আসছে। আমি থামলেই সে ধরে ফেলবে।
এইভাবে কতক্ষণ ছুটে ছিলাম, কতপথ পার হয়েছিলাম, কোথায় গিয়ে পৌঁছে ছিলাম তার কিছুই জানা নেই। সামনে একটা পার্ক দেখতে পেয়ে পথশ্রমে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঢুকে পড়েছিলাম তার মধ্যে। একটা অন্ধকার কোণ খুঁজে নিয়ে সেখানে লুকিয়ে কাটিয়ে ছিলাম সারাটা রাত। সূর্য ওঠার আগে পার্ক থেকে বের হয়ে আবার শুরু করেছিলাম ছোটা। ছুটে ছুটে আমি যেন পৌঁছে যেতে চেয়েছিলাম পৃথিবীর সেই প্রান্তে যেখানে কোন মানুষ থাকে না। হিন্দু মুসলমান থাকে না, শ্মশান গোরস্থান মন্দির মসজিদ থাকে না। হন্তা থাকে না হন্তব্য থাকে না।
সেটা সেই ১৯৬৫ সালের কথা। যে বছর ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে একটা যুদ্ধমতো হয়েছিল! দু-দেশই ছিল অভ্যন্তরীণ সমস্যায় জর্জরিত। তাই মানুষের দৃষ্টি মূল সমস্যা থেকে অন্যদিকে ঘোরাতে একটা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা না খেলে উপায় ছিল না। সে সময় একটা পাকিস্তানি প্লেন উড়ে এসে ব্যারাকপুরে বোমা ফেলে গিয়েছিল। জনরব ছিল, পাকিস্তানি বোমারু বিমান নাকি হাওড়া ব্রিজ গুঁড়িয়ে দেবে। যে কারণে ভারতীয় প্রতিরক্ষা বিভাগ ব্রিজ পাহারার ব্যবস্থা খুবই জোরদার করে রেখেছিল। পঞ্চাশ ফুট অন্তর একজন অস্ত্রধারী পুলিশ।
আমি এক পলাতক ‘খুনি’। বহুদিন ধরে বহু পথ পার হয়ে ঘুরতে ঘুরতে এসে পৌঁছেছিলাম হাওড়া ব্রিজের উপর। যার নীচ থেকে বয়ে চলেছে হিন্দুধর্মের কাছে বড়ই পবিত্র নদী গঙ্গা। এ নদীতে নাকি একবার স্নান করলে সব পাপ ধুয়ে যায়। যে কারণে কলকাতার বড় বাজারে একটি বেওসায়ি জাতি গোষ্ঠির মানুষ ব্যবসা ফেঁদে ছিল। সারা দিন লোক ঠকাবে আর পরদিন সকালে গঙ্গায় ডুব মেরে আসবে। লোক ঠকানো পয়সায় ইহকাল, গঙ্গাস্নানের পুণ্যে পরকাল, দুকালই সুখে কাটবে।
আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গঙ্গা দেখছিলাম। গঙ্গা নদীর বুক বেয়ে ভেসে চলেছে কত লঞ্চ জাহাজ নৌকা। মানুষ ভেসে চলেছে জলযানে কোথায় কোন নিরুদ্দেশে তা কে জানে। ওই ভাসমান জলযানে চেপে আমার মনটাও ভেসে যাচ্ছে। আমার বাবা কাকা, উধ্বর্তম দশ পুরুষ এমনই জলপথে নৌকা নিয়ে চলে যেতেন মাছ ধরতে। যদি দেশভাগ না হোত আমিও একদিন বাবা কাকার সাথে যেতাম। বলা যায় না, কোন এক নদীর মোহনায় আমার সাথে দেখা হয়ে যেত অতল জলের তল থেকে উঠে আসা কোন এক জলপরীর। সুলোচনা, সুকেশী, সুনাসিকা সেই জলকন্যার দর্শন পেয়ে পূর্ণ হয়ে যেত জীবন। এই সব কত কী ভাবছিলাম তখন সেই কিশোর মনে, ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে। যা একান্তই নাবালক ভাবনা।
