কেন আত্মহত্যা করলেন তার স্ত্রী? সেকি এক পথভ্রষ্ট স্বামী না আদর্শচ্যুত এক নেতার উপর মোহভঙ্গ হবার দুঃখে, সেটা কেউ জানেনা। জানলেও কেউ মুখ খোলেনি।
তবে তার শোকে বধির বিদ্যালয় দশদিন মুহ্যমান হয়ে রইল। দশদিন পরে এই স্কুলকেই বেছে নিলেন বড়সাহেব। তার প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন অনুষ্ঠানের জন্য। এর একটা সুবিধা হল এই যে, অতিথি অভ্যাগতদের আপ্যায়ন সবই স্কুলের কর্মীদের দ্বারা সেরে নেওয়া গেল। বড় সাহেব প্রতি বছর তার জন্মদিনের অনুষ্ঠানও এখানে করেন। এতে অনেক কম খরচে সারা হয়ে যায়।
তবে বড় ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠান এখানে করতে পারেননি। কয়েক হাজার লোকের নিমন্ত্রণ ছিল। এত লোকের এখানে সংকুলান হতো না। সেই অনুষ্ঠানে স্কুলের সবাই গিয়েছিল। ছোট বড় সবাই, শুধু আমি একা বাদ। আমার কোনো নিমন্ত্রণ ছিল না।
আর এবারও, সব কর্মচারির কাছে তার স্ত্রীর শ্রদ্ধা বাসরে যোগদানের অনুরোধ সম্বলিত ছাপাননা পত্র পৌঁছে গেছে। শুধু আমার নামে কোনো চিঠি দেওয়া হয়নি। তবে এখানে থাকতে হবে। আমার ডিউটি যে।
অনেকদিন তা প্রায় বছর পাঁচেক আগে এক বিকালে এই স্কুলে এসেছিলেন বড়সাহেব। তখনো তিনি এম.এল.এ. হয়নি মন্ত্রী হননি। তাই খুব বেশি একটা কাজের চাপ ছিল না। তখন মাছ মারা, আড্ডা, দুপুরে ঘুমাবার মতো অবকাশ পেতেন। মাছ মারার জন্য এখানে বড় পুকুর আছে, আড্ডা দিতে চাইলে ফোনে লোক ডেকে নিতেন। ঘুমের জন্য এসি বসানো নিজস্ব কামরা আছে। এই এসি আমাদের বেতন কেটে লাগানো হয়েছিল। আমার বেতন থেকে নেওয়া হয়েছিল সাড়ে আটশো টাকা। সেদিন সেই এসি লাগানো ঘরে আমাকে ডেকে পাঠালেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা বদ্ধমূল ধারণা আছে, যারা রান্না করে তাদের নাগালে থাকে মাংস মাছ ডিম। ফলে তারা খুব খায়। কিন্তু সত্যটা হচ্ছে এর একেবারে বিপরীত। তারা খায় না, খেতে পারে না।
আমি অবশ্য খেতাম। কিছুতেই আমার মাথায় আসেনি যে সেটা কোনো অন্যায়। সকাল ছটা সাড়ে ছটা তখন কাজে আসতাম, যেতে যেতে সেই সাড়ে এগারো-বারোটা। এত সময় খিদে সহ্য করা যায় না, তাই মুড়ি খেয়ে নিতাম ডাল বা ঝোল দিয়ে। রবিবার লুচি হয়। তাও খেয়ে নিতাম দু চারখানা। সেটাই কেউ ওনার কানে দিয়েছে।
বড় সাহেবের একটা অসাধারণ গুণ আছে, যখন তিনি চিৎকার চেঁচামেচি করেন, আসলে তখন ওনার ভিতরটা থাকে একদম ঠাণ্ডা। আর যখন উপরটা ঠাণ্ডা দেখায়, ভিতরটা থাকে গনগনে গরম।
সেদিন সেই সময়, যখন উনি ধীর স্থির শান্ত। আমাকে দেখে নরম গলায় বলেন তিনি তোমরা এখানে চাকরি করে। তার জন্য বেতন পাও। বাকি পাওনা? তা হলে বাচ্চাদের খাবার কেন খাও? খাবে না। আজকের পরে আমি যেন কোনো দিন না শুনি।
আগে যখন অনু আসেনি, আমি এখানে থাকতাম। তখন সেই ডাল মাছ ডিম যা সবাই খায়, আমিও খেতাম। সেটা কোনো গোপন ব্যাপার ছিল না। অনেকেই জানত। যেটা অনেকে জানে না তা হল এর জন্য আমার কাছ থেকে দাম কাটা হয়েছে। বাবুর কাছে কোন সূত্রে প্রথম খবরটা পৌঁছেছিল। পরের খবরটা পৌঁছায়নি। তাই তার মাথায় চেপে বসেছিল সেই খবরটা আমি খাই। তবে তখন সেটা অপরাধ হলেও ক্ষমার যোগ্য ছিল, কারণ বেতন পেতাম না। এখন আর ক্ষমা করার মতো নেই কারণ এখন বেতন পাই।
বড় সাহেব এখানকার প্রতিদিনের খবর পেয়ে থাকেন। সে ব্যবস্থা করে রেখেছেন। তাই কেরানি রায় কী করে না করে তা ডানহাত তার কানে দেয়, সে কী করে বলে আসে বাল্যবন্ধু। তার খবর দিয়ে আসে মাদার, আমি কী করি না করি তার দিকে তো অনেকেরই তীক্ষ্ম নজর।
যারা কথা বলতে পারে আর যারা পারে না দুপক্ষের মধ্যে সংবাদ আদান প্রদানের একটা মস্ত অসুবিধা ভাষার। বোবারা চা আর কফি, পানীয় জল আর শরবত, ইলিশ, আর তেলাপিয়া, দুটোর পার্থক্য আলাদা করে বুঝিয়ে বলতে পারে না। যত সময় ধরে বুঝিয়ে বলবে সাধারণ মানুষ বোঝাবার সময় দেবে না।
বোবারা, যাদের অনেক ক্ষোভ-অনেকঅভিযোগ, সুযোগ পেলেই কিছু বলতে চায়, তাদের সামনে নিজের ডান হাতের চারটে আঙুল মুখের কাছে এনে ইশারায় আমার বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন বড় সাহেব–এখনও খায় নাকি রে? বোবারা ঘাড় কাত করে জানিয়েছে-খায়। তবে ডালে ভেজানো মুড়ি আর ভাতের যে মৌলিক পার্থক্য, বোঝাতে পারেনি। ফলে বাবুর মাথা গরম। সব খেয়ে নিল রে।
যাইহোক, সেদিনের খিচুনি খাবার পর থেকে আর এখানকার কোনো খাদ্যদ্রব্যের দিকে ফিরেও তাকাই না। কত অনুষ্ঠান হয়, কত রকমারি মেনু। কত কত লোক খায়। সব আনন্দ উৎসব থেকে দূরে সরিয়ে রাখি নিজেকে। ‘ওরা’ আমাকে খেতে বলে না আমিও খাই না। মনে দুঃখ পাই, তখন মনকে বোঝাই ওরা এই রকমই সিপিএম যেরকম হয়।
একদিন স্কুলে কী যেন একটা অনুষ্ঠান ছিল–যতদূর মনে পড়ে সরস্বতী পূজো। যাতে প্রতি বছরের ন্যায় সে বছরও আমার দেড়শো টাকা চাঁদা কাটা হয়েছিল। সেদিন আমার ছেলে মানিক, তার বয়েস তখন দশ কি বারো, বাবার স্কুলের পূজো দেখতে এসে পাড়ার অনেক বাচ্চার সাথে নিমন্ত্রিতদের মাঝে খিচুড়ি ল্যাবড়া খেতে বসে গিয়েছিল। কাউকে কিছু বলেনি কেরানি রায়, শুধু আমার ছেলেকে চিনতে পেরে ঘর ভর্তি লোক, আর স্কুলের একগাদা কর্মচারির চোখের উপর, আমাকে ধমকে দিয়েছিলেন–এটা কী বিয়ে বাড়ি নাকি যাকে ইচ্ছা ডেকে এনে খেতে বসিয়ে দেবেন।
