বলেন তিনি-পত্রিকায় একটা প্রতিবাদ পত্র পাঠিয়ে দে। আমি বুঝে উঠতে পারি না এখানে প্রতিবাদপত্র লেখার যুক্তি কী? কেন আপনারা বড়সাহেবের নামে খুব সুন্দর সুন্দর কিছু লিখলেন না এই ভাবে কী কোনো সাংবাদিককে লিখতে বাধ্য করা যায়? সবাই জানে যে, যে সংবাদ ছাপা হয়েছে তার মধ্যে তথ্য-বিকৃতি ভুল বা মিথ্যা কিছু থাকলে তবেই তার প্রতিবাদ করা যায়। সে চিঠি ওরা ছাপে। বাবুর নাম নেই কেন? সে চিঠি ওরা কেন ছাপবে?
বাবুযখন জিজ্ঞাসা করেছিলেন–আমার কথা নেই কেন?তখন আমার মুখে পাল্টা প্রশ্ন এসে গিয়েছিল কেন থাকবে? বলতে ইচ্ছা করেছিল এমন কী করেছেন আপনি আমার জন্য যে গদগদ হয়ে আপনার কথা বলব। তা বলতে পারিনি। ক্ষমতাবান লোক পাশবিক ক্ষমতা। এদের ক্ষতি করার অভিপ্সা বড় প্রবল যে। উনি আমাকে চাকরি দিয়েছেন, স্বীকার করেছি দিয়েছেন। কিন্তু কোনো উপকার করেননি। আমার দরকার ছিল একটা কাজ আর ওনার দরকার ছিল একটা কাজের লোক। চাকরি দিয়ে উনি যদি আমার উপকার করে থাকেন, কাজ করে আমি তো ওনার উপকার করেছি। বারোজনের কাজ করছি দুজনে।
একটা গরুকে লোকে ঘাস জল দেয়। উপকার করে? তার দুধটা তো দুইয়ে নেয়, গাড়ি টানায়, হালে জুড়ে দেয়। তবে? ওসব না করতে পারলে দেবে ঘাস জল? না, বেচবে কসাইয়ের কাছে? দয়ার
তাই এখানে আমরা কেউ কারো প্রতি কৃতজ্ঞ নই। যে যার স্বার্থের খুঁটিতে বাধা।
আমার দুটো সত্তা। একটা পেটের কারণে পরের গোলাম। অন্যটা স্বাধীন–তার মালিক সে নিজে। তাকে দাসানুদাস বানানো বড় কঠিন। সে নিজেরে ছাড়া করে না কাহারে কুর্নিশ।
“যদি ভাবো চিনছো আমায়–
ভুল করেছো
আমি নয়, আমার মুখোশ
চিনছো তুমি
যদি ভাবো, কিনছো আমায়
ভুল করেছো
আমি নয়, আমার আপোস
কিনছো তুমি!”
স্কুলে আমার শত্রুপক্ষ এরপর মুখর হতে শুরু করে দেয়। বুঝতে পারি, বেলা যত বাড়বে শিক্ষক শিক্ষিকা অফিসস্টাফরা আসবে, ঝড় তত তীব্র হবে। কী বেইমান দেখেছে। বড় সাহেবের অন্ন খায়, তবু একবার তার নাম নিলোনা। একদিন এই নিয়ে সেই খাস খবর হবার সময়ে আমার সাথে ঝগড়া শুরু করে দিয়েছিল বাবুর এক অনুগামী। সে এই স্কুলের পিওন। সারাদিনে যার কাজ একবার মাত্র পোস্টাপিস, ব্যাঙ্কে গিয়ে চিঠি-চেক ফেলে আসা। আর বাকি সময় আড্ডামারা। বলেছিলাম তখন ওই কথা–মনোরঞ্জন নামের যে রাঁধুনি সে এই স্কুলের প্রতি কিছু কিঞ্চিৎকৃতজ্ঞ হলেও হতে পারে। কিন্তু লেখক মনোরঞ্জন তা নয়। সে যা হয়েছে কারো দয়া দান অনুকম্পায় হয়নি। বড় কষ্ট করে সে যা অর্জন করেছে সেই সফলতার জন্য সে কেন কারো মিথ্যা তাবকতা করবে?
সেই স্টাফ চিৎকার করে বলেছিল, বড় সাহেব আপনাকে চাকরি দেয়নি?
আমি কী একবারও বলেছি যে দেয়নি? সেটা আমার উপকারের জন্য নয়। বোবা বাচ্চাগুলোর জন্য। ওদের রান্না করার জন্য কাউকে না কাউকে তো চাকরি দিতেইহতো। এটা তার বাধ্যবাধকতা কাল যদি আর রান্না করতে না পারি তখন কী উনি আমাকে রাখবেন? যদি রাখেন তখন বলব উপকার করলেন। এখন কোনো উপকারের গল্প নেই।
সেদিন একটু বেশি মাত্রায় বাঁচাল হয়ে গিয়ে বলেছিলাম আমি–যারা রাজনীতি করে–ভোটের রাজনীতি, তাদের কাছে কবি শিল্পী সাহিত্যিক এদের খুব একটা মূল্য নেই। মূল্য আছে তাদের যারা ভোটের বাকসো ভরাতে পারে। আমার সে ক্ষমতা নেই। তাই তোমাদের কাছে যেমন আমার দাম নেই, আমার কাছে তোমাদেরও কোনো দাম নেই।
বলেছিলাম, বড় সাহেব উপকার করেছে তোমাদের। আসছো যাচ্ছো মাইনে পাচ্ছ কোনো কাজ করতে হয় না। বলো না আমাকে এই রকম একটা কাজ দিতে! যে দারোয়ান রাতে এসে ঘুমিয়ে সকালে বাড়ি চলে যায় দেবে সেই কাজটা? তাহলে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।
এই ধরনের কথা তো রাজদ্রোহিতার নামান্তর। রাজার কানে গেলে বিপদ হয়, তবে সে কথা রাজার কানে দেবার আগেই রাজা তার চোখ অপারেশন করতে রুবি হাসপাতালে ভর্তি হন। অপারেশনের পরে চোখে ইনফেকশান হয়ে যায়। ফলে ওনাকে চেন্নাই যেতে হয়। দুমাসের মতো ভোগেন তিনি। একটা চোখ চিরকালের জন্য নষ্ট হয়ে যায়। যখন তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন, সে পুরানো কথা বলতে ভুলে গেছে।
এটা পুরানো নয়, টাটকা, আজকের ঘটনা। বড় সাহেব আমাকে ফোন করেছিলেন, কেন করেছিলেন বারোয়ান দাস জানে। ফলে তা বাতাসের বেগে সারা ইস্কুলে ছড়িয়ে যায়। রাজা যত বলে, পরিষদ দলে বলে তার শত গুণ। তাপদগ্ধ এপ্রিলের দুপুরে গনগন করে আগুন জ্বলে ওঠে। সে আগুন আমাকে বৃত্ত করে।
.
এবারের নির্বাচন চুকে গেল। ফলাফল হল দুপক্ষকেই চমকে দেবার মতো। যে দল হেরে যাবে বলে সবাই ধারণা করেছিল তারা আশাতীত ভালো ফল করল। ২৩৪। আর যে দল জিতবে ভেবেছিল, পেল মাত্র ৩৫সিট। জ্যোতিবাবু অবসর গ্রহণ করেছেন। খুব বদনাম হয়ে গিয়েছিল তার। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে সামনে রেখে এই সাফল্য এল। গঠিত হল সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার। হাটে বাজারে পথে বাসে ট্রেনে চা দোকানে ভোটের আগে দশজন একত্র হলে ছয়জন তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে কথা বলত। তারা ভোটও দিয়েছিল। তাদের সে ভোট কোন্ কৌশলে কোন্ বাকসে চলে গেল তা কে জানে।
তবে ভোট একটা যুদ্ধ। এখানে ছলে বলে কৌশলে যেভাবে হোক, প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করায় কোনো পাপ নেই। এটা মহাভারতের কাল থেকে স্বীকৃত। বড় সাহেবও জিতে গেলেন। স্বস্তির নিঃ শ্বাস পড়ল তার সমর্থকদের। আগামী পাঁচ বছরের জন্য আর কোনো চিন্তা নেই। আনন্দের জোয়ারে ভাসল সবাই। বস্তা বস্তা আবির উড়ল বাতাসে। এবার বড় সাহেব মন্ত্রী হলেন। কথায় বলে, গানেও আছে, কপালে সবার বুঝি সুখ সয়না। এত মহানন্দের মহাপ্লাবনের মধ্যে অল্প কয়েকদিন পরেই নেমে এল এক নিদারুণ শোকের ছায়া। তার স্ত্রী আত্মহত্যা করে বসলেন।
