এবার বামফ্রন্ট যদি না জেতে মন্ত্রীত্ব হারাবেন। এম.এল.এ. সিটটাও থাকবে না। থাকবে না আরো অনেক কিছুই।
গতবার জয় পেয়েছিলেন মাত্র গুটিকয়েক ভোটের ব্যবধানে। সেই ভোট কটা এবার বিপক্ষ বাক্সে সরে গেলে যা হবে ভাবলে গায়ে জ্বর আসে। তাই এবার ভাটের ঢাকে কাটি পড়ার সাথে শহরের বিলাস বৈভব বিসর্জন দিয়ে সদলবলে গিয়ে পড়ে আছেন সাপ, জোঁক, মশা, বাঘ, কুমির, নোনামাটির দেশে ওনার বিধানসভা এলাকায়।
আমার কথা যেদিন আনন্দ বাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তারিখটা ছিল ৩রা এপ্রিল ২০০৬। তখন নির্বাচনী প্রচার তুঙ্গে। এত বিপন্নতার মধ্যেও তার চোখ এড়ায়নি যে তারই স্কুলের রাধুনির ছবি কথা এক বিখ্যাত সংবাদপত্রের সিকি পাতা জুড়ে ছাপা হয়েছে। কিন্তু কোথাও এক লাইন তার কথা লেখা নেই। কেন নেই? এটা তো ঠিক নয়। বধির স্কুল কলকাতা শহর থেকে সামান্য দূরে। সকাল সাতটার মধ্যে এখানে পত্রিকা পৌঁছে যায়। সাতটা দশে আমি জেনে গেছি–খবর হয়ে গেছি। সাতটা চল্লিশে ফোন এল আমার কাছে।
অন্যদিন যদি কেউ আমাকে ফোন করে দারোয়ান বলে দেয়–সে কাজে আছে, ডাকা যাবে না। কিন্তু আজ তা বলতে পারল না ডেকে দিল আমাকে–বড় সাহেবের ফোন। এটা এক মন্ত্রীর আমার কাছে আসা জীবনের প্রথম ফোন। না, কোন অভিনন্দন-প্রশংসা-শুভবার্তা নয়। ফোনে ভেসে এল তার ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ রাগান্বিত গলা–তোর কথা পেপারে দেখলাম। এতে আমার কোনো কথা নেই কেন? কিছু বলিসনি?
বলেছি। সত্যি আমি বড় সাহেব সম্বন্ধে পঞ্চ পাণ্ডব সম্বন্ধে, অনেক কিছু বলেছিলাম। বড় সাহেব আমাকে দিয়ে কোনো কারণে ঘাস ছেঁড়ান, রায়দা কোন্ কারণে বলে, কুঁজোর চিৎ হয়ে শোবার চেষ্টা, কোন্ রাগে ওয়ার্ডেন আমার বিছানা থেকে আমার বউকে তুলে অন্যত্র সরিয়ে দেয়–সব বলেছিলাম আমি। দুরদর্শী সাংবাদিক ঋজু বসু বুঝেছিলেন, রাগের মাথায় আমি যা বলছি যদি তিনি হুবহু লিখে দেন, আমার বিপদ হবে। তাই যাতে আমার কোন ক্ষতি না হয়, স্কুলেরও কোন বদনাম না হয়, দু’কুল বাঁচিয়ে সংবাদটি পরিবেশন করেছিলেন তিনি।
এখন বড়সাহেবের জিজ্ঞাসার জবাবে কাঁদো কাঁদো গলায় অভিনেতার মতো বলি–আমি আপনার কথা বলেছিলাম। খুব ভালো ভালো কথা বলেছিলাম। বলেছিলাম যে আপনি চাকরি না দিলে না খেয়ে মরে যেতাম। তাহলে আর লেখক হওয়া যেত না। আমি আজ যা হয়েছি সব আপনার দয়ায়। ওরা সে সব না লিখলে আমি কী করব।
আমার প্রথম বই বৃক্সে শেষপর্ব বের হবার পর বইমেলায় এক সাহিত্যপ্রেমী পুলিশ অফিসারের সাথে পরিচয় হয়। আমি কেমন করে লেখক হলাম, তার এই প্রশ্নের জবাবে বলেছিলাম–আপনাদের দয়ায়। আপনারা ধরে মেরে জেল খানায় পাঠালেন বলেই তো দু লাইন লিখতে পারছি।
এই কথাটা সত্য, যে কোন খারাপই পুরোপুরি খারাপ হয় না। তার পিছনে কোনো না কোনো ভালো অবশ্যই থাকে। যেমন ভালোর পিছনে থাকে কোন না কোন খারাপ। মানুষ শুধু তাৎক্ষণিক ভালো বা মন্দটা দেখতে পায়। কিন্তু দেখতে পায়না বহুদুরের যে কোন ভালোর পিছনের মন্দ এবং মন্দের পিছনে লুকানো মঙ্গলটাকে।
আমি আজ যদি চুলচেরা বিচার বিশ্লেষণ করি তাহলে এই সিদ্ধান্ততে আসি যে, এই দেশ–এই সময় সমাজ মানুষ যে দমনপীড়ার অত্যাচার চালিয়েছে তা না চালালে আমি কোনদিন লেখক হতে পারতাম না। ঘোড়ার পিঠে চাবুক পড়ে বলেই সে ছোটে-ওদের কষাঘাত আমাকে এগিয়ে দিয়েছে লেখক হবার দিকে। যে ধরনের কঠিন পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে আমার জীবিকা নির্বাহ করতে হয়, কাজের শেষে ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসে শরীর বিশ্রাম চায়। তখন আমাকে লেখার টেবিলের কাছে টেনে নিয়ে যায় ওদের কাছ থেকে পাওয়া অপমান অত্যাচারের জ্বালা। সে বলে, লেখ–তোকে লিখতেই হবে। ওরা তোর কলম থামিয়ে দিতে চায়, তা করতে পারলে ওরা জিতে যাবে। ওদের জিততে দিস না। ওদের জয় মানে তোর পরাজয়। হেরে যাবি তুই? না হারিস না। আরো শক্ত হাতে কলমটা আঁকড়ে ধর। লেখ তুই লিখে যা। তোর হাতের ওই কলমটা ছাড়া আর যে কিছুই নেই।
এই বোধ, এই তীব্র অপমান অত্যাচার-অমানবিকতা আমার লেখনিতেশক্তি জোগায়-সমৃদ্ধ করে, আক্রমক করে। চোখা চোখা তীক্ষ্ম এবং নিডর বাক্য উঠে আসেআমার কলমের ডগায় যা হয়ে যায় আমার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। দেখবার চোখ হয় বাজপাখির মতো প্রখর, ভাষা হয় আগুন আর অশ্রুর সংমিশ্রণে দাহক এবং ধারালো। প্রচলিত যা কিছু মহান, যা কিছু শ্রদ্ধার আমি তাকে দেখি, আমার লেখনিতে তা হয়ে যায় কার্টুন–তির্যক আর ব্যাঙ্গের বিষয়।
এই সব কিছুই আমার হয়ে ওঠার পিছনের কার্যকারণ। এবং হয়ে ওঠার পরে আমি আজ অবশ্যই উচ্চারণ করতে পারি যে দরিদ্র, তুমি মোরে করেছে মহান, তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিস্টের সম্মান।
তাই আমি বড় সাহেবের কাছে কোন মিথ্যা বলিনি। যা হয়েছি সব ওনাদের জন্য। আমাদের এই স্কুলের কর্মচারি, সিপিএম পার্টি, বর্ণবাদী ধনবাদী ব্যবস্থা–সবাই আমার জীবন অতিষ্ট না করে তুললে আমি আজ যা হয়েছি হতে পারতাম না।
কিন্তু আমার সেই স্তোকে ঝানু রাজনীতিবিদের মন ভেজেনা। অনেকবার টিভিতে দেখিয়েছে ওনাকে হাজার বার নাম উঠেছে পেপারে, তাতে কী? এবার তো ওঠেনি। এটা কেন বাদ যাবে?
