এমন অনুষ্ঠানে যাবে না তা কী করে হয়? কিন্তু সম্মতি জানাব কী করে। সে চিঠি হাতে পাবো–পড়ব তবে তো। সে চিঠিস্কুলের ঠিকানায় কুরিয়ার মারফত পৌঁছাবার পর স্কুলের দায়িত্ববান অধিকারী শুধু সাহিত্য আকাদেমি নাম দেখেই যা বোঝার তা বুঝে ফেলেছে। তাই একটা সই করে স্ট্যাম্প মেরে চিঠি রাখতে অস্বীকার করে। আমি তখন দুপুর বেলায় বাড়ি চলে গিয়েছিলাম, ফলে চিঠি ফেরত চলে যায়।
সাহিত্য আকাদেমি চিঠি আসবে একটা তুচ্ছ রাধুনির নামে। কেন? আর কী কোন লোক ছিল না? এটা কী শিক্ষিত মানুষদের পরোক্ষে একটা অপমান নয়?
সি.এস.সি অফিসের এক কর্মচারি যাকে আমি দাদা বলে ডাকি, সেই অমরদার সাথে রামকুমার বাবুর ঘনিষ্ট সম্পর্ক আছে। অমরদার মাধ্যমে আমার ঠিকানা পান তিনি। তখন অমরদার কাছে জানতে পারি আমার নামে যে চিঠি এসেছিল ফেরত গেছে।
অমরদার কাছ থেকে রামকুমার বাবুর ফোন নাম্বার নিয়ে ওনাকে ফোনে জানাই, কেন চিঠি পাইনি। জানাই আমি যাবো। অবশ্যই যাবো। আনন্দবাজার পত্রিকার মাধ্যমে জানালাম ওখানে কবি বিনোদ বেরা গদ্যকার আব্দুল জব্বার গল্পকার আনসারুদ্দিন থাকবে। আমি থাকব কিনা কেউ জানল না। আমার সম্মতির আগে পত্রিকার সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পৌঁছে গিয়েছিল।
পরের দিনই অনুষ্ঠান। দুপুরে ফোন করে স্কুলকে জানাই, আমার জ্বর যেতে পারছি না কাজে। তারপর বের হয়ে পড়ি তারাতলার জীবনতারা ভবনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু প্রতিকূলতা বলে কাকে। বাসস্ট্যান্ডে এসে শুনি বাস ভাড়া বৃদ্ধির দাবিতে আজ বাস মালিক ইউনিয়ন ধর্মঘট করে বসে আছে। ট্যাক্সি অবশ্য চলছে, কিন্তু আমার কাছে এত টাকা নেই।
হঠাৎ আমার সামনে এসে দাঁড়াল একটা মোটর সাইকেল। ছেলেটাকে আমি তেমন একটা চিনি না। তবে সে আমাকে চেনে। এদের টিভির দোকান আছে। ফলে অনেকবার ছবি দেখেছে আমার।
আমি এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছি কোথায় যেতে চাই জানবার পর সে আমাকে পিছনে বসিয়ে নিল। চালিয়ে দিল মোটর সাইকেল তারাতলার দিকে। যখন জীবন তারা ভবনে পৌঁছালাম অনুষ্ঠান শুরুর মুখে। উদ্বিগ্ন অমরদা তাকিয়ে আছে আমার পথের দিকে। আমি পৌঁছাতে স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল তার।
‘অস্মিতা’ সাহিত্য আকাদেমি অনুষ্ঠানটির এই নাম রেখেছেন। যাতে আমন্ত্রিত লেখকরা কত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে সাহিত্য কর্মে ব্যাপৃত আছেন তারই কিছু উদাহরণ তুলে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন সঞ্চালক রামকুমার মুখোপাধ্যায় খানিকটা ক্ষোভের সঙ্গে বললেন আমার বিষয়ে।কতখানি অসুবিধার মধ্যে আমাকে লিখতে হয়। আর কেন আমি অনুষ্ঠানের চিঠি পাইনি।
আমার সঠিক বয়স কত আমি তা জানি না। পঞ্চাশ বা তারও বেশি যা-ই হোক মনের বয়স, কিন্তু বাড়তে দিইনি। সেটা আটকে আছে সকাল সাড়ে আটটা নটায়। যে বয়সে বুকে দাপায় সাহস আর প্রতিবাদ। যে বয়স কোন অন্যায় মেনে নিতে পারে না। সেই যে একজন দাড়িঅলা বুড়ো বলেছিল–অপরাধ যে করে আর অপরাধ যে সহে তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে। এই কথা যে বয়সকে খোঁচায়-খেপায়।
আর যে এমন করে খুব স্বাভাবিক নিয়মে অন্যায়কারী দুর্বৃত্তরা তার উপর সংঘবদ্ধ আক্রমণ শানাবেই। এটা শুধু যে পশ্চিমবঙ্গে হয় তা নয়–রাম রাজত্বেও হয়।
জায়গা বদল তো কম হল না জীবনে। জীবন আমাকে নিয়ে গেছে শতেক জায়গায় শত রকম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। হাজার লোকের সঙ্গে পরিচয়, হাজার রকম ঘটনায় জীবন পেয়েছে এমন অনেক অমূল্য রতন, যা না পেলে জীবন একটা অজ্ঞতার অন্ধকুপ হয়ে রয়ে যায়। এই পাওয়াটা যার যত তীব্র-গভীর তার ঝুলি ততোখানি পূর্ণ।
কে যেন একজন বলেছেন–এই পৃথিবী-এর পাহাড় নদী অরণ্য মরুভূমি এর জনপদ নগর বন্দর, এর জীব জগত সব কিছুকে মনে করো একটা আগাছা বোঝাই চারণ ক্ষেত্র। যে লেখক হতে উৎসুক, সে এই আগাছার মধ্যে গরুর মতো চড়ে বেড়াবে। চিনে চিনে–বেছে বেছে কচি ঘাসটি খাবে। হজম করবে, তারপর যা বর্জ গোবর বানিয়ে ফেলে দেবে। যেটি মূল পদার্থ সেটি রেখে দেবে নিজের সঞ্চয়ে। তারপর তা পবিনত হবে দুধে। দান করবে মানুষের কল্যাণে।
লেখক আর কিছু নয়–একটা গরু। সে নিজে খাবে যা সবচেয়ে নিকৃষ্ট সেই ঘাস, আর দেবে যা সবচেয়ে উৎকৃষ্ট সেই দুধ।
আমার মনে হয়–আমি যেখানে চড়ছি–সেটা মাঠ, ক্ষেত, বনভূমি নয়, সেখানে ঘাসের মধ্যে একটা দুটো চিনে জোঁক একটা দুটো সাপ বিছে থাকে। এটা একটা বাঘ ভাল্লুকমুন্ড শিকারীদের বিচরণভূমি।
জীবন এক বিচ্ছিরি অভিজ্ঞতার নাম। জীবন এক যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে হতে পথ চলার নাম। যে জীবন আমি যাপন করেছি, করে চলেছি, মনে হয় যেন জীবন্ত চিতার আগুনে পোড়ানো হচ্ছে আমাকে। কোথাও কোন আলো নেই, পথের দিশা নেই। কেউ এমন নেই যার হাত ধরে দুপা হাঁটতে পারি। পড়ে গেলে যে আমাকে ঠেলে তুলবে। এগিয়ে দেবে একটু সামনে।
এটা সেই সময় যখন কালীঘাটের এক সাধারণ ঘরের অতি সাধারণ মেয়ের দৌরাত্মে পাকা মাথার ঝানু রাজনীতিবিদদের রাতের ঘুম দিনের খাওয়া উড়ে গেছে। ছয় ছয়বার চোখ বুজে নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়া বামফ্রন্ট সাতবারের বেলা বুঝি ডুবেই যায়। বাসে ট্রামে ট্রেনে, হাটে বাজারে চৌরাস্তায় সবার মুখে গেল গেল রব। আর বোধহয় জেতা যাবে না। রেডিও টেলিভিশন পত্র পত্রিকা সবাই বলছে–এবার বদলে যাবে সরকার। আর পলিটব্যুরো থেকে পঞ্চায়েত স্তর পর্যন্ত ছোট বড় মাঝারি সব নেতার বুককাঁপছে–মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মানুষকে বোঝাচ্ছেন–চুপচাপ ফুলে ছাপ।
১২. বামফ্রন্ট নির্বাচনী কার্যক্রম
বামফ্রন্ট এবার নির্বাচনী কার্যক্রম সমাধা করতে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। নির্বাচন কমিশনের তৎপরতায় হাজার হাজার ভুয়ো ভোটারের নাম কাটা যাচ্ছে। বড়সাহেব প্রায় চল্লিশ বছর ধরে রাজনীতি করেন। মাত্র একবার ষষ্ঠ বামফ্রন্ট সরকারের ক্ষমতায় ফেরার কালে বহু কষ্টে তিনি জয় পেয়ে মন্ত্রী হন। সারা পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের দাপট। মুখের ব্রনের মতো দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার কিছু সিটে বিরোধী দল জেতে। এটা সহ্য হয়নি সিপিএম নেতাদের। তাই যাদবপুর থেকে খুন জখম মারপিটে সিদ্ধ হস্ত বড় সাহেবকে দায়িত্ব দেওয়া হয় ওই এলাকায়। বেশ কয়েক বছর পুলিশ আর দলীয় কর্মীদের সহায়তায় কী নির্মম হত্যালীলা চালিয়ে উনি যে ওই সব এলাকায় বিরোধী শক্তি হ্রাস করেঝিল্পসংহারের শ্যা দেখে নিরুপণ করা যায়।
