একটা গল্পের নাম–রীবাজ, এ এমন এক অরাজক অন্ধকার প্রদেশের গল্প, সেখানে উচ্চবর্ণ দ্বারা নিম্নবর্ণের মানুষকে নিপীড়নের হাজার রকম পন্থা চলে আসছে অনেক বছর ধরে। যার একটা-যদি কোন নিম্নবর্ণ বিয়ে করে বউ নিয়ে আসে, বউকে প্রথম তিনরাত উচ্চবর্ণের গৃহে পাঠিয়ে শুদ্ধ করে আনতে হবে।
একবার জঙ্গল থেকে কাঠ নিয়ে শহরে যাওয়া এক ট্রাকে সওয়ার হয়ে বসেছিল একটা ছেলে। কয়েক বছর সেখানে কাটিয়ে সে বুঝে যায় যে শুদ্ধিকরণ আসলে একটা ভাঁওতা দিয়ে নিম্নবর্ণের বউদের ভোগ করা।
সে গ্রামে ফিরে এই প্রথার বিরোধ করে। নিজের বউকে কিছুতেই পাঠাতে রাজি হয়না ব্রাহ্মণ পূজারির কাছে। সে একা ছিল এবং দুর্বল। বুঝতে পারে তার পক্ষে এই অন্যায় বন্ধ করা অসম্ভব। তাই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায় বউ নিয়ে। যাবার আগে খুন করে যায় বাওন দেওতাকে।
আর একটা গল্পের নাম–মানুষের মুখ। একজন তোক শহরে পঁচিশ বছর ধরে রিকশা চালিয়েছে। তখন কতো মানুষকে সে রিকশায় চাপিয়েছে কতো বাচ্চাকে নিয়মিত পৌঁছে দিয়েছে স্কুলে। যাদের কেউ কেউ ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার উকিল অফিসার কত কি হয়ে গেছে। সেই নিয়ে তার গর্ব–অহঙ্কার।
একদিন এক দুর্ঘটনায় একটা পা ভেঙে গেল তার। পঙ্গু হয়ে গেল সে চিরদিনের মতো। সেদিন সে চারিদিকে তাকিয়ে দেখল–কেউ তার খোঁজ নিচ্ছে না, কেউ মনে রাখেনি তাকে। সে এতকাল এক মিথ্যে অহঙ্কারের হাওয়া ভরা বেলুনে ভেসে যাচ্ছিল। প্রয়োজন ফুরিয়ে যেতেই স্বার্থপর দুনিয়া তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে।
একটি গল্পের নাম কলমকার। এই গল্পের নায়ক একজন ঝাড়ুদারসে স্কুল ম্যাগাজিনে একটা গল্প ছাপতে দেয়। যখন দেখা যায় তার লেখাটা স্কুলের সব শিক্ষক বা অফিসস্টাফের চাইতে ভালো লেখা হয়ে গেছে, সবাই মিলে পিছনে লাগতে থাকে তার শত্রুতা করা শুরু করে দেয়। তাদের একটাই রাগ-ঝাড়ুদার মাস্টারদের চেয়ে এত ভালো কেন লিখবে, যাতে তাদের অপমান হয়।
একটা আছে যুদ্ধ বিরোধী গল্প, যার নাম–নিছক মোরগ লড়াই। মানুষ দুটো নিরীহ মোরগকে নানারকম ট্রেনিং দিয়ে হিংস্র করে তোলে। আর তার পায়ে ধারালো চাকু বেঁধে নামিয়ে দেয় লড়াইয়ের ময়দানে। তখন সে তারইমতো আর একটা মোরগকে মারে যার সাথে তার কোনকালে কোন শত্রুতা ছিল না। এই মরা আর মারার খেলায় তাদের কারো কোন লাভ নেই।
এই রকম গল্প ঘিরে সাজানো থাকে একশো নব্বই পাতার বই–জিজীবিষার গল্প। এই সময় একদিন পথেই পরিচয় হয়ে গেল একজন অসাধারণ–বাউলমন, লেখক মানিক মণ্ডলের সাথে। সে এমন এক মানুষ যে দিনের পর দিন চান করে না, খায় না ঘুমায় না। পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। মাথার চুল-দাড়ির চেহারা দেখলে পাগল বলে মনে হয়। তবে মানুষটা বড়ই গুণী। রাজা থেকে ফকির সবার সাথে তার চেনা।
যেদিন তার সাথে তার বাসায় গেছি, আমার সব কথা শুনে বলে সে, দাঁড়াও তোমার একটা টি.ভি.র প্রোগ্রাম করিয়ে দিই। আর তখনই কাকে যেন ফোন করে। এর আধঘন্টা পরে এসে গেল তার এক বন্ধু যার নাম অমিত ঘোষ। কথা বলল আমার সাথে। এরই দিন কয়েক পরে একটা পুরো ইউনিট লাইট ক্যামেরা নিয়ে চলে এল আমার বাড়ি। তিন চারদিন ধরে চলল শুটিং। কিছু কথা আমাকে দিয়ে বলানো হল, কিছু কথা আমার চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেতা বলল। প্রায় দশবারো জন অভিনয় করে নানা চরিত্রে। তৈরি হয়ে গেল একটা তথ্যচিত্র যার নাম সাধারণ-অসাধারণ।
আধ ঘন্টার এই প্রোগ্রাম এরপর আকাশ বাংলা চ্যানেলে পরপর তিনবার দেখানো হল কিছুদিন পরে। এরপর তো বলতে গেলে আমার বাড়ির দরজায় টিভি সাংবাদিকদের ভিড় লেগে গেল। অনন্যা নামের এক সাংবাদিকের দ্বারা তারা নিউজ চ্যানেল থেকে “তারার নজর” নামে আধ ঘন্টার আবার একটা প্রোগ্রাম হল। এল আকাশ বার্তার অধীর নামে এক সাংবাদিক, দিশারী কেবল চ্যানেল থেকে এলদীপান্বিতা নামের এক মহিলা সাংবাদিক।ই.টি.ভি থেকে মনিরুল নামে আর এক সাংবাদিক।
আর কিছুদিন পরে আবার এলেন–নিজে এলেন না, লোক পাঠালেন সেই দিব্যজ্যোতি বসু। তখন তিনি আকাশ বাংলা চ্যানেলে নতুন একটা প্রোগ্রাম করছেন যার নাম খোঁজ খবর। এই সময়–যত আমাকে নিয়ে মানুষের মধ্যে উন্মাদনা–কৌতূহল বাড়ছিল, ততই আমার স্কুলের সহকর্মী–প্রভাবশালী লোকদের গাত্রদাহ বেড়ে যাচ্ছিল। তখন আমার মনে হতো যারা আমার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে–নরমাংস ভোজী চিতা হায়নার পাল। সুযোগ পেলেই যারা আমাকে ছিঁড়ে খেয়ে নেবে। এত নাম কেন হবে আমার। কেন বার বার আমাকে টিভিতে দেখাবে। এতেই তাদের ক্রোধ বাড়ে।
এই রকম একদিন সাহিত্য আকাদেমি থেকে আঞ্চলিক সচিব রাম কুমার মুখোপাধ্যায়ের সাক্ষর সম্বলিত একখানা চিঠি এসে পৌঁছালো আমার নামে–বিদ্যালয়ের ঠিকানায়। যাতে লেখা—’সাহিত্য আকদেমি’ জীবনতারা ভবনের নিজস্ব সভাঘরে একটি অস্মিতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এই অনুষ্ঠানে আপনি ছোট গল্প/কবিতা পাঠ করলে আমরা বাধিত হবো।
নানা প্রতিকুলতার মধ্যেও যারা সাহিত্য চর্চা করছেন এবং যাদের রচনার মধ্যে নিজস্বতার ছাপ আছে তাদের রচনা শোনার জন্যই আমাদের অস্মিতা অনুষ্ঠানের আয়োজন।
আমরা আশা করবো আপনি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সম্মত হবেন।…আপনার সম্মতি পত্রযোগে বা দূরভাষে জানিয়ে ধন্য করবেন।”
