আমি আগে মনোজ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর কথা বলেছি। বলা হয়নি যে আমাকে মনোজদার কাছে নিয়ে গিয়েছিল সেই নরেন ভট্টাচার্যের কথা।
আমার প্রথম লেখাটি ছাপা হয়েছিল বর্তিকা পত্রিকায় একাশি সালে। সমীক্ষা লিখে আমার মন ভর ছিল না। চাইছিলাম গল্প লিখব। লেখক হবো। সেই আশায় চার পাঁচটা ছোট গল্প লিখেও ফেলি। কিন্তু বর্তিকা তখন পর্যন্ত গল্প কবিতা এসব ছাপাত না।
ভাবি–এগুলো অন্য কোন কাগজে পাঠাব। এও ভাবি–যারা পত্র পত্রিকার সাথে যুক্ত তারা প্রায় সবাই জানে যে এক রিকশাঅলা লেখে–যার নাম মদন দত্ত। যাকে মহাশ্বেতা দেবী স্নেহ করেন। তারা হয়ত মাত্র মহাশ্বেতা দেবীকে সন্তুষ্ট করার জন্য লেখাগুলো ছেপে দেবে। আর তাহলে–আমি যে লিখতে পারি তার কোন পরীক্ষা তো হবে না। কীভাবে হবে পরীক্ষা?
তখন জিজীবিষা–এই ছদ্মনামে চারটে কাগজে চারটে গল্প পাঠিয়ে দিই। রানার, হাতিয়ার, সিসৃক্ষা, লোক বিজ্ঞান, পরে আর একটা পাঠাই বঙ্গবার্তা কাগজে। সব কটা লেখাই ছাপা হয়ে যায়। পরীক্ষায় পাশ করি আমি। আমিও পারি, আমিও পারব। মনোবল বেড়ে যায় আমার।
আমরা আগে যেখানে থাকতাম সেই শ্যামা কলোনীতে থাকত নরেন ভট্টাচার্য। ও তখন খুবই ছোট। তবে সাহিত্য সংস্কৃতির দিকে দারুণ ঝোঁক ছিল ওর। ওই বয়েসেই নরেন একটা পত্রিকা বের করেছিল–নাম উদাহরণ। সেই পত্রিকায় এরপরে আমি “রানারের নূপুর”নামে একটা গল্প লিখি। পরের সংখ্যার জন্য একটা কবিতা দিই। তবে সেকবিতা আর প্রকাশ হয়নি। পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। নরেন চলে যায় অভিনয় জগতে। একটা নিজস্ব নাটকের দল গড়ে তোলে, তার নামও দেয় উদাহরণ।
যে কবিতাটা নরেনকে দিয়েছিলাম আমার কাছে তার কোন কপি রাখা ছিল না। লেখা যে কপি রেখে দিতে হয় আমি তা জানতাম না। এই বোধ এল অনেক পরে–যখন আমার প্রায় তিনশো পাতার–পথ হারা পথিক’ নামের একটা উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি হারিয়ে ফেলে ছিল ‘দিবারাত্রির কাব্য’ পত্রিকার সম্পাদক আফিফ ফুয়াদ। সাতষট্টি সালে একবার বাড়ি থেকে পালিয়ে ফারাক্কা নিউ জলপাইগুড়ি দার্জিলিং গৌহাটি হয়ে–লক্ষ্মেী পর্যন্ত গিয়েছিলাম সম্পূর্ণ বিনা খরচায়। একটা নয়া পয়সা কাছে ছিল না। সেই বিচিত্র ভ্রমণ কাহিনি দিয়ে সাজিয়ে ছিলাম ওই উপন্যাসের অঙ্গ। স্মৃতি থেকে উদ্ধার করে সেই ভ্রমণ কাহিনীর অল্প কিছু আমার অনেক পরে লেখা চণ্ডাল জীবন’ উপন্যাসে রেখেছি।
প্রায় কুড়ি বছর পরে একদিন দেখা হল নরেনের সাথে আমি ওকে চিনতে পারিনি, নরেনই চিনল আমাকে। নরেন আমাকে খাস খবরে দেখেছে। জেনেছে সেই কবেকার হাতে তুলে নেওয়া কলমটা, বহু ঝড় ঝাঁপটার পরেও–আজো আমি ছাড়িনি–ধরে রেখেছি।
তখন সে উদাহরণ পত্রিকার কথা বলে! জানতে চায় সেই কবিতাটা আমি পরে অন্য কোন কাগজে দিয়েছি কিনা। আমার সে কবিতার কথা কিছু মনে নেই। কিন্তু দেখি সেইনা ছাপা কবিতার একটা লাইন আজো মনে করে রেখে দিয়েছে নরেন–তুমি হাসতে পারলে, আমি পারতাম আত্মহত্যা করতে।
এরপর নরেনের সাথে যাদবপুর কফি হাউসে গিয়ে দেখি সেখানে আড্ডা মারা তরুণ লেখক কবি অভিনেতা সবাই এই না ছাপা কবিতার কবির নাম জানে জানে তার অদ্ভুত জীবনের বহু বিচিত্র–বর্ণময় কথা ও কাহিনি। বলেছে-নরেনই। বুঝতে পারি শারীরিক ভাবে আমি এখানে না থাকলেও উদাহরণ উপকথার কেন্দ্রে অবশ্যই ছিলাম।
এই নরেনই একদিন বিজয়গড়ের নিরঞ্জন সদনে–উদাহরণ নাট্য গোষ্ঠিরনাট্য উৎসবে ২০০৭ সালে সম্বর্ধনা-মানপত্র দেয়।
পরে রানাভুতিয়া–কাটিপোতা নামে এক গ্রামের আর একজন যুবকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়–তার নাম উত্তম পাঁজা। তাদের পাড়ায় প্রতি বছর খুব ধুমধাম করে জগদ্ধাত্রী পূজা হয়। পূজা উপলক্ষে মেলা–কুড়িদিন ধরে নাট্য প্রতিযোগিতা হয়। জলাভূমি নামে একটা পত্রিকাও প্রকাশ করে তারা। উত্তম পাঁজা প্রতি বছরই আমাকে ধরে নিয়ে মঞ্চে বসিয়ে মালা মানপত্র স্মারক দেয়।
কবি পবিত্র মুখোপাধ্যায়, অজিত পাণ্ডে, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, নবারুণ ভট্টাচার্য, অর্ধেন্দু চক্রবর্তী, নবনীতা দেবসেন এদের মতো স্বক্ষেত্রে মহান মানুষদের পাশে বসার সৌভাগ্য হয় এই মঞ্চে।
আমার প্রথম বই বৃত্তের শেষ পর্ব’ বের হয়েছিল ২০০০ সালের বই মেলায়। তার ছয় বছরের মাথায়–এবারের বই মেলায় এক সাথে বের হল দুটো বই। ‘জিজীবিষার গল্প’ আর ‘অন্য ভুবন’।
অন্য ভুবন উপন্যাস কী ভাবে প্রকাশিত হয় সে আমি আগে বলে দিয়েছি। একটু জিজীবিষার গল্পের কথা বলি। এতেও বাইশটা গল্প আছে। এই সংকলনের একটা গল্পের নাম ফোটোজনিক। যার মুখ্য চরিত্র এক ভিখারিনী মা। ঠিক জানা যায়না যে সেই অল্প বয়েসী মায়ের মাতৃত্ব সামাজিক বিচারের বৈধ না অবৈধ। তবে তার কোলে যে হাড়গিলে শিশুটি, তাকে দেখতে মানুষের বাচ্চার মতোই। যার পেট আছে, সে পেটে খিদে আছে। বাচ্চাটা খিদের জ্বালায় কাঁদলে মা তার মুখে গুঁজে দেয় উদোম একটা স্তন। যে স্তন কামুক পুরুষকে বড় পীড়া দেয়, উত্তেজিত করে।
ঠিক সেই সময় সেখানে উপস্থিত এক ফোটোগ্রাফার অতীব পেশাদারি দক্ষতায় সেই দুর্লভ ছবিখানি ক্যামেরা বন্দী করে নেয়। যে ভিখারিনীকে কেউ একটাকা দেবে না, তারই ছবি একদিন বিক্রি হয়ে যায় অনেক দামে। যেদিন ফোটোগ্রাফার অনেক টাকা পুরস্কার নিয়ে বাড়ি যাচ্ছে, সেইদিনই না খেয়ে পথে পড়ে মরে যায় ভিখারিনী মা।
