তাই করেছিলেন তিনি তবে সেবছরুনয়, তারপরের বছরসূ৬ সালের বই মেলায় বের হল আমার পুস্তকাকারে প্রথম উপন্যাস অন্যভুবন।
আমার দুজন প্রকাশকই আর্থির সঙ্গতিতে অনেকটা দুর্বল। এরা যে আমার উপর বেশ কিছু টাকা লগ্নি করেছেন তার পিছনে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যের চেয়েও বড় ছিল অনামী কিন্তু সম্ভাবনাময় এক লেখককে উৎসারিত করা। কিন্তু আমারও তো একটা দায়দায়িত্ব থেকে যায়। যদি এঁরা ব্যয়ের অংশ পুনরুদ্ধার করতে না পারে, পরে আর আমার বই ছাপাতে চাইবে না। এই ভাবনা থেকে দুপুর বেলা আমার কাজের শেষে ব্যাগে বই ভরে পৌঁছে যেতে লাগলাম বিভিন্ন স্কুল কলেজে। খাস খবর এবং অন্যান্য কারণে আমার একটা পরিচিতি তো ছিলই। যে কারণে দু চারটে বই বিক্রি হয়ে যেত। তবে তা শ্রমের তুলনায় বা পথ খরচের তুলনায় বিশেষ কিছু নয়। বৃত্তের শেষ পর্বের বেলায় দিব্যজ্যোতি বসুর সহায়তায় একটা জোয়ার পেয়েছিলাম–যাদবপুর ইউনির্ভাসিটিতে দুতিন ঘন্টায় তিরিশ পঁয়ত্রিশ খানা বই বিক্রি হয়েছিল, এবার পাঁচের উপর উঠল না। মাথার সেই পোকাটা নড়ে উঠল–জোয়ার আনতে হবে। বিজ্ঞাপন দেবার ক্ষমতা নেই। এমন একটা ঘটনা ঘটিয়ে দিতে হবে যে আপনা আপনি বিজ্ঞাপন হয়ে যায়।
আচ্ছা, একটা লোক হাওড়া ব্রিজের সবচেয়ে উঁচুতে উঠে বসেছিল, ব্যাপক প্রচার পেয়েছে, আমি যদি বই নিয়ে ওখানে চড়ে বসি? একটা লোক বাঘের গলায় মালা দিয়েছিল সে-ও খুব প্রচার পেয়েছে। তবে লোকটা মারা গেছে এই যা। আমি যদি মারা না যাই? এইসব ভাবতে ভাবতে নিজের বোকামিতে আমি নিজে হেসে ফেলি। আরে, বাঘের সামনে যাবার চেয়ে কঠিন আর সাহসের-হাওড়া ব্রিজের চেয়ে উঁচু আর একটা জায়গা তো আছে। যেখানে গেলে আর কোথাও যাবার প্রয়োজনই পড়বে না। সব প্রচার এসে হামাগুড়ি দেবে দরজার কাছে। তাই এক দুপুরে আমার ছেঁড়া ঢাকটা কাঁধে করে রওনা দিলাম আনন্দবাজার পত্রিকার অফিসের দিকে। বঙ্গভূমিতে ওই একটি মাত্র পত্রিকা যা পনের কুড়ি লাখ বিক্রি হয় আর এক দুকোটি লোক পড়ে। এ এমন এক পত্রিকা যা ভালোবাসলেও পড়তে হবে আর মন্দ ভালোবাসলেও অনেক রকম পত্রিকা আছে। সব পড়বার পরেও মনে হয়–দেখি তো ওরা কি লিখেছে।
পত্রিকা অফিসের রিশেপসনের এক সুন্দরী মহিলা বসেছিলেন। রত্নাকরের মত তার সামনে গিয়ে দাঁড়াই আমি। খরে গলায় জানতে চাই–আমি একটা খবর নিয়ে এসেছি। কার সঙ্গে দেখা করলে সেটা পত্রিকার পাতায় স্থান পাবে যদি একটু বলে দেন। ভদ্রমহিলা যথার্থইভদ্র এবং উপকারী। বলেন তিনি। রিপোর্টার ঋজু বসুর সঙ্গে কথা বলুন।
–কীভাবে বলব?
–ফোন করুন।
–নাম্বার দিন।
কোন রকম বিরক্তি না দেখিয়ে নাম্বার দিলেন তিনি। নাম্বার টিপে পেয়ে গেলাম শ্রদ্ধেয় জগন্নাথ বসুর সুযোগ্য পুত্র ঋজু বসুকে–হ্যালো, আমি আপনার সাথে দুমিনিট কথা বলতে চাই।
–কি বিষয়ে বলুন।
–আমি একজন লেখক। দুটো বই নিয়ে এসেছি। আপনাকে দেব।
–রিশেপসানে জমা দিয়ে যান। আমি পেয়ে যাব।
–রিশেপসানে জমা দিলে হবে না। এর একটা ইতিহাস আছে। সেটা আমি আপনাকে বলতে চাই।
আমার গলার স্বরে জেদ ছিল সাহস ছিল জোর ছিল প্রবল জিগীষা ছিল। যা তাকে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ থেকে বের করে নিয়ে এল বাইরে–দাঁড়ান আমি আসছি। এর কিছু সময় পরে উনি নিচে নেমে এলেন। উনি কয়ধাপ নেমেছিলেন, খুব বেশি হলে দশ বিশ। আর আমি? আমি উঠে গেলাম সপ্ত আকাশ ভেদকরে অনেক উপরে। যেখানে পৌঁছাবার চেষ্টায় আমার মত কত হতভাগ্য আজন্ম মাথা খুঁড়ে চলেছে। এক মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই সারা ভারতবর্ষে যেখানে বাংলাভাষী মানুষ রয়েছে সর্বত্র পৌঁছে গেল আমার নাম ও জীবন সংগ্রামের কাহিনি।
সেই দুপুরের তপ্তরোধে ঋজু বসু নিজে গিয়েছিলেন আমার ছোট্ট ঝুপড়িতে। সাথে ছিলেন ক্যামেরাম্যান রাজীব বসু। দুজনে দু ঘন্টা ছিলেন। দুঘন্টা ধরে অনবরত বকে গিয়েছিলাম আমি। এত বড় বিশাল মাপের ব্যক্তিত্বের সামনে একটুও সংকুচিত না হয়ে বললাম সেইবাল্যবেলা থেকে আজ পর্যন্ত সব। অবশেষে ২০০৬ সালের ৩ এপ্রিল আনন্দবাজার পত্রিকার প্রায় সিকি পাতা জুড়ে আমার ছবি সহ প্রকাশিত হল ঋজু বসুর প্রতিবেদন–মহীরুহনয়, লড়াকুবটের চারাইতার প্রেরণা।
“নাম সই করতে শেখার ঢের আগে পেটের জ্বালায় বোমাবাজি পাইপগান চালানোয় হাত পাকিয়েছিলেন তিনি।নীরস সিমেন্টে মাথা তোলাবটের চারার মত বেঁচে থাকার জেদ সেই জীবনটাই বদলে ছিল।
সত্তর দশকের গোড়ায় আলিপুর জেলের ধুলোয় কাঠি দিয়ে আকিবুকিতে হাতে খড়ি হয় মনোরঞ্জন ব্যাপারির। মারপিটের অভিযোগে ধরা পড়ে জেল খাটার হতাশায় ভেঙে পড়া সদ্য যুবককে সেদিন আলো দেখিয়ে ছিলেন আর এক অখ্যাত কয়েদি। জেল কুঠুরির জানালা থেকে জাতীয় গ্রন্থাগারের কার্নিশে লতপত করা চারাটা দেখিয়ে তিনি বলেছিলেন–ওই বটের চারার মতো হও। জীবনের যে কোন অবস্থা থেকে রস নিঙরে নিতে শেখ।
ওই কথাগুলো আজ পঞ্চাশ পেরিয়েও বহন করে চলেছেন তিনি। অবশ্য ঠিক তার বয়েস কত তা তিনি নিজেও জানেন না। উদ্বাস্তু ঘরের জনমজুরের ছেলে একদিনও স্কুলে না যাওয়া মনোরঞ্জন শেষ পর্যন্ত গল্পের বইয়ের লেখক হয়ে উঠেছেন। জেলে অক্ষর চেনার মধ্য দিয়ে বইয়ের যে আশ্চর্য জগত খুলে গিয়েছিল জীবন যুদ্ধের যাবতীয় টানা পোড়েনেও তাকে সযত্নে বাঁচিয়ে রেখেছেন বটের চারার মতোই। ছোট বড় পত্রিকায় আড়াই দশক ধরে মাঝে মধ্যেই ছাপা হয়েছে তার গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ। যাদবপুরের ফুটপাত বা দণ্ডকারণ্যের উদ্বাস্তু মহল্লায়, রিকশা চালক সাফাইকর্মী বা মধ্যপ্রদেশের শ্মশানে ডোমের ভূমিকায়, চোলাই মহুয়ার নেশায়, চারপাশে জীবনের অপচয়ের মধ্যেও ধরে রেখেছেন লেখালেখির অভ্যেস। আর তার দেখা জীবন, মাদকাসক্ত রিকশা চালকের ঘুরে দাঁড়ানো বা কারখানার কাজ করা আইবুড়ো মেয়ের চোরা পথের বাঁকে তলিয়ে যাবার গল্প ক্রমাগত ছাপার অক্ষরের রূপ নিয়ে চলেছে….!”
