হাটেবাজারে পত্রিকার লেখাটি প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালের শারদ সংখ্যায়। আমার ভবিষ্যত্বাণী যে কত সঠিক ছিল সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম নেতাই-এর পরে আর নিশ্চয়ই তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যদি সেদিন মানুষ সচেতন হতো, সংগঠিতভাবে প্রতিবাদ জানাতো তাহলে অনেকগুলো প্রাণ রক্ষা পেয়ে যেত অকাল মৃত্যু থেকে।
যে রাতে ধনঞ্জয়ের ফাসী হয় সারা রাত ঘুমোতে পারি নি। আমার বন্ধুরা মোমবাতি মিছিল করেছিল, আর আমি রাতভর লিখেছিলাম খাতার পাতায় নিজেকে এই হতভাগ্যের জায়গায় রেখে একটা খসড়া। পরে সেটাই উপন্যাসের রূপ নিই।
এর পরের বছর প্রকাশ হয় সংলাপ নির্ভর উপন্যাস ‘জনযুদ্ধ’। তখনও সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলন শুরু হয়নি। আমি আমার মতো করে এই ব্যাপক জনসাধারণকে উচ্ছেদ আর ব্যাঙের ছাতার মতো দিকে দিকে গজিয়ে ওঠা নানাবিধ শিল্পদ্যোগ এবং জনজীবনে তার দুষ্প্রভাব-সেই নিয়ে লিখেছিলাম সংলাপ-নির্ভর এই উপন্যাস। জনযুদ্ধ’-জনবিরোধী শিল্পায়নের বিরুদ্ধে মানুষের যুদ্ধযাত্রার কাহিনী।
এরপর প্রকাশিত হয় আমার উপন্যাস ‘বিবর্ণ শব্দেরা। দণ্ডকারণ্যে বসবাসকারী একদল মানুষ, যাদের দেখে করুণার চাইতে বেশি হয় হাসির উদ্রেক, তাদের নিয়ে এটি লেখা।
এরপর আবার পর পর দু’ বছরে প্রকাশিত হয় চণ্ডাল জীবন।
হাটেবাজারে পত্রিকার বাৎসরিক উপন্যাস ছাড়াও প্রণবদার আটুল বাঁটুল পত্রিকায় প্রায় প্রতিমাসে আমার ছোটগল্প ছাপা হচ্ছিল। যে কারণে কলকাতার চেয়ে বর্ধমানে আমার পাঠকসংখ্যা বেশি হয়েছে। লিখে যাচ্ছিলাম কলকাতার আরও অনেক কটা কাগজে। যেমন বর্তিকা, ভাষাবন্ধন, অদল বদল, চতুর্থ দুনিয়া, জলাভূমি, দ্বীপবাংলা ইত্যাদি।
এর মাঝে আটুল বাঁটুল পত্রিকার উদ্যোগে আয়োজিত উমাপদ দত্তরায় ও নীহারবালা দেবী স্মৃতি গল্প প্রতিযোগিতায় ২০০৩ সালে পেয়ে গিয়েছিলাম প্রথম পুরস্কার হিসেবে মানপত্র ও কিছু নগদ অর্থ। এর আগে অদল বদল পত্রিকার একটি প্রতিযোগিতায় পেয়েছিলাম দ্বিতীয় পুরস্কার। পুরস্কার দ্বিতীয় হলেও প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ বড়-ই ছিল। লেখার জন্য এর আগে টাকা পেয়েছি মাত্র দু’বার। একবার দিয়েছিল মনোরম পত্রিকা-সাড়ে চারশো আর প্রতিক্ষণ পত্রিকা দেড়শো টাকা।
একটি লেখা সংগ্রহের প্রয়োজনে প্রতিক্ষণ অফিসে গিয়ে দেখলাম, ওরা আট বছর ধরে লেখকের পারিশ্রমিক বাবদ প্রাপ্য দেড়শো টাকা যক্ষের ধনের মতো আগলে বসে আছেন। সে যাই
হোক, এরপর প্রণবদা ২০০০ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত আমার গল্পগুলো নিয়ে প্রকাশ করলেন আমার দ্বিতীয় গল্প সংকলন ‘জিজীবিষার গল্প’। এতে স্থান পেল বাইশটা গল্প, পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৮৮।
এরপর থেকে প্রতি বছর শারদ সংখ্যার জন্যে আমার একটা উপন্যাসের স্থান পাকা হয়ে যায় হাটেবাজারে পত্রিকায়। ১৪১১ থেকে ১৪১৯ দশখানা উপন্যাস প্রকাশিত হয় এই পত্রিকায়।
‘চণ্ডাল জীবন’ উপন্যাসটি প্রথমে যখন হাটেবাজারে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, পাঠক সাধারণের প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখে আমি অভিভূত হয়ে পড়ি। তার ফলে এটাকে পুস্তকাকারে মুদ্রিত করার একটা বাসনা মনের মধ্যে তুমুল তোলপাড় তোলে। কিছু টাকা পয়সা ধারদেনা করে অবশেষে সেটা সম্ভব হয়। ২০০৯ সালে কলকাতা বইমেলায় বইটির প্রকাশ হয়।
.
এই সময় আর একজন মানুষের সঙ্গে আমার পরিচয় হল। ইনি প্রিয়শিল্প পত্রিকা ও প্রিয়শিল্প প্রকাশন সংস্থার কর্ণধার মনোজ বন্দ্যোপাধ্যায়। ওনার সহধর্মিনী কবি নন্দিতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় কবিমন পত্রিকা।
আমি কবিতা লিখি না। ব্যাপারটা এমন নয়। আসলে আমি কবিতা লিখতে পারি না। এই রকমই একনা লিখতে পারা কবিতা স্থান পেয়ে গিয়েছিল ‘কবিমন’-এর পাতায়। সেই সূত্রে আলাপ পরিচয়।তখন আমি মনোজদাকে বলেছিলাম–ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়–আমি পদ্যের লোক নই। আগাপস্তলা গদ্যের লেখক। তাকে একখানা পাণ্ডুলিপি পড়তে দিয়েছিলাম। এটা আমার ছত্তিশগড় বাসকালে দেখা এক জনজাতির ক্ষুদ্র গোষ্ঠির জীবন সমাজ সংস্কার নিয়ে লেখা একটি উপন্যাস। কিন্তু আমার হাতে লেখা দেখে মনোজদা সে পাণ্ডুলিপি পড়বার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। তাই মাস ছয়েক পড়ে থাকে পাণ্ডুলিপি স্পর্শরহিত হয়ে। ধুলো জমে যায় পাতার উপর। আমার মনে এ বিশ্বাস দৃঢ় ছিল যে যদি একবার পড়ে ফেলে, না ছেপে ফেরত দিতে পারবেনা। কিন্তু তাকে দিয়ে পড়াব কি করে। একমাস দুমাস পরে পরে যাই, জানতে চাই–পড়েছেন? জবাব পাই এখনও পড়ে উঠতে পারিনি। ভীষণ কাজের চাপ।
শেষে একদিন ক্ষুব্ধ হয়ে বললাম-ওটা দিয়ে দিন নিয়ে যাই। এখানে পড়ে থেকে তো কোন লাভ নেই, আমি অন্য চেষ্টা করে দেখি। মনোজদা পাণ্ডুলিপি ফেরত দিয়ে দিলেন। খেদ প্রকাশ করলেন–না পড়তে পাবার জন্য।একবারও বললেন না–মশাই এইহাতের লেখা কী পড়া যায়? বললেন–চা আনাই, একটু চা খান।
চা খেতে খেতে বলি–যদি একটু সময় দ্যান তো দুটো পাতা আমি একটু পড়ে শোনাই। ভদ্রলোক মুখের উপর না বলতে পারলেন না। সম্মতি দিলেন–পড়ুন। আমি পড়া শুরু করলাম। বলেছিলাম দু পাতা পড়ব-ভদ্রলোক তো নই, শর্ত না মেনে দশ পাতা পড়ে গেলাম। তারপর থামলাম। আমি থেমে যেতেই উনি তাড়া দিলেন–থামলেন কেন। আর কিছুটা পড়ুন। পড়লাম এবার আরও দশবারো পাতা।তারপর পাণ্ডুলিপিমুড়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলাম। বললাম চলি, মনোজদার মুখ চোখের ভাষা তখন বদলে গেছে, এক ভালোলাগার ছবি যেন। বলেন তিনি-মনোরঞ্জনদা, যদি কিছু মনে না করেন পাণ্ডুলিপিটা আপনি রেখে যান। আমি কথা দিচ্ছি–আগামী বইমেলায় আপনার বই বের করব।
