বই দিয়ে ওনাকে বললাম একটু পড়ে দেখবেন। আপনার মতামত পেলে আমার খুব উপকার
উনি বই নিয়ে বর্ধমানে চলে গেলেন।
মাঝখানে বেশ কয়েকমাস কোনও সংবাদ নেই। হঠাৎ একদিন আমার কর্মস্থলে ফোন বেজে উঠল। ওপারে প্রণবদার গলা–হাটেবাজারে পত্রিকার জন্য একটা লেখা পাঠা।
প্রথমে ওই পত্রিকায় আমার অনুপ্রবেশ ঘটে একটি ছোট গল্প দিয়ে। সাপ্তাহিক হাটেবাজারে পত্রিকা দেখেছি, দেখা হয়নি শারদ সংখ্যা। জানতাম না তার আকার-আয়তন কেমন। সেটা জানবার পরই স্থির করি, পরের সংখ্যায় আমি উপন্যাস দেব।
বাংলাভাষায় যাঁরা লেখেন, তুলনামূলকভাবে কবিতার লেখক খুব বেশি। লেখাও যায় অল্প আয়াসে।সকালে-দুপুরে-সন্ধ্যায়-রাতে অভিধান দেখে গুটিকয়েক দুর্বোধ্য জটিল শব্দবসিয়ে চারখানা মাল নামিয়ে ফেলা কোনও ব্যাপার নয়। পত্রিকার সম্পাদকরাও কবিদের প্রতি একটু বেশি সদয়। একপাতায় চারজনকে ধরিয়ে দিতে পারে যে। তাই ফটাফট ছেপে দেয়। কবিতাটা কবিতা হলো কি না, কি হলে কথারা কবিতা পদবাচ্য হয়–কে বা ওসব নিয়ে মাথা ঘামায়।
কবিতার পরে ছোট গল্প। গল্প যদি ছোট হয় এবং গল্প হয়, তাহলেও কোনো পত্রিকার পাতায় একটুখানি স্থান পেতে পারে। বহু পত্রিকাই একটা ‘ভাল লেখার’ জন্য হা-হুতাশ করে মরে। তবে উপন্যাসের বেলায় ব্যাপারটা হয় উল্টো। যদি কোনও ভাল লেখাও হয়, বহু পত্রিকার সেটা ছাপার সাধ থাকলেও সাধ্যে কুলোয় না। যাঁদের সাধ্য আছে, সেইসব বড় পত্রিকা তো কোনও অনামা-অখ্যাত লেখকের লেখা পড়েও দেখে না। অত সময় কোথায় তাদের?
হাটেবাজারে পত্রিকা এখন আমার কাছে সাত রাজার ধন এক মানিক। আমার উপন্যাসসমুহ এখানেই ছাপা হয়। এই পত্রিকা আমার পত্রিকা। আমিই প্রকাশক প্রণব চক্রবর্তী (সম্পাদক মিতা চক্রবর্তী)। প্রকাশক ‘আমি’ লেখক আমার উপর কঠোর শর্ত আরোপ করি, লেখা তোমার যত বড় হোক আপত্তি নেই, তবে সেটা যেন উৎকর্ষতায় উৎরোয়। তা না হলে সেটা হাওড়া ব্রীজ থেকে গঙ্গায় ফেলে দিও। ট্রেনে চাপিয়ে বর্ধমানে আর পাঠিও না। না হলে আমাকে আবার ফেলতে যেতে হবে দামোদর নদে।
পরের বছরের জন্য সারা বছর ধরে একপাতা একপাতা করে দুটো উপন্যাস লিখি। ছন্নছাড়া ও বাতাসে বারুদের গন্ধ’ ছন্নছাড়া’ একদল অনিকেত দরিদ্র-দুর্বল স্টেশন আবাসিক মানুষের জীবন সংগ্রামের উপরে লিখিত। ‘ছন্নছাড়া’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র নব’, যার অতীত বলে কিছু নেই, ভবিষ্যত বলে কিছু নেই। আছে শুধু অস্তিত্বের সংকটে দীর্ণ, বিকট হাঁ-মুখ মেলা বর্তমান। এই উপন্যাসে সেইসব মানুরের কথা বলা হয়েছে, যারা রেল ষ্টেশনে জন্ম নেয়, রেল ষ্টেশনে বাঁচে আর মরে। এইসব প্রান্তিক মানুষের আশা-স্বপ্ন-ভালোবাসা-প্রেম-প্রতিহিংসার আলেখ্য–ছন্নছাড়া। আর বাতাসে বারুদের গন্ধ। একদল জেল বন্দী–যাদের মধ্যে নকশাল বন্দীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি–তাদের মতাদর্শ কেন্দ্রীক সংগ্রাম, নির্ভিকতা, আত্মত্যাগ–এই উপন্যাসের উপজীব্য। এর কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছে একজন চোর। যে স্বেচ্ছায় নকশাল বন্দীদের জেল পলায়ন কর্মসুচীর অংশীদার হয়ে শুধু এই আশায় মৃত্যুবরণ করে নেয়, যেন আর কেউ কোনদিন তার ছেলেকে চোরের ছেলে বলতে না পারে, বলবে এক বিপ্লবীর ছেলে।
আমি প্রথম লেখাটাই পছন্দ করি হাটেবাজারে পত্রিকার জন্য। সেটা পড়ে প্রণবদার পছন্দ হয়ে যায়। তিনি কম্পোজ করে ফেলেন। তখন একদিন তাকে আমি আমার দ্বিতীয় লেখাটির কথা বলি। বলি যে, কোথায় যে এটা পাঠাবো, কে যে ছাপবে!
বলেন তিনি–পাঠিয়ে দে।
কোথায়?
আমার কাছে।
আপনি কি করবেন?
বর্ধমানে কত কাগজ, দেব কাউকে। তুই পাঠিয়ে দে।
অগত্যা সেটাও প্রণবদার ঠিকানায় পাঠিয়ে দিই। আর মাঝে মাঝে ফোন করে জানতে চাই, কি হলো লেখাটার ভবিষ্যৎ?
বলেন প্রণবদা-ছাপা হচ্ছে।
কোন পত্রিকায়?
পরে দেখিস।
দেখলাম পরে। ১৪১১ উৎসব সংখ্যায় হাটেবাজারে পত্রিকায় সেই দুটো লেখাই প্রকাশিত হয়েছে। ‘ছন্নছাড়া’, লেখক মনোরঞ্জন ব্যাপারী। ‘বাতাসে বারুদের গন্ধ’–লেখক মদন দত্ত। দেখে বিস্ময়ে আর আনন্দে নেচে উঠলাম আমি। এটা কেন? বলেন প্রণবদা, ‘বাতাসে বারুদের গন্ধ’ আগে পেলে ওটাই ছাপতাম। ছন্নছাড়া কম্পোজ হয়ে গিয়েছিল তাই সেটা বাদ দেওয়া গেল না। আর ‘বাতাসে বারুদের গন্ধ’-এর মতো একটা লেখা নিজে হাতে করে অন্য পত্রিকায় দিতে মন সায় দিল না। বাধ্য হয়ে দুটোকেই রাখতে হল।
প্রণবদা যে এমন একটা কাণ্ড করবেন, আগেভাগে তার কিছুই বলেননি। সেই থেকে প্রণবদার সাথে আবার নতুন করে যোগসূত্র স্থাপিত হল আমার, নতুনভাবে। উনি সম্পাদক, আর আমি তার পত্রিকার নিয়মিত লেখক।
পরের বছর এই কাগজে প্রকাশিত হল আমার আর একটা উপন্যাস ‘অমানুষিক’। প্রচলিত অন্ধ বিচার ব্যবস্থার অন্যায় বিচারে এক নিরপরাধ বন্দীকে কিভাবে ফঁসী দিয়ে মেরে ফেলা হয়। কেন মেরে ফেলা হয়, এই মৃত্যুতে কার কি স্বর্থ জড়িত-এটা তারই কাহিনী। এই প্রথম আমি আমার ব্যক্তিগত ক্রোধকে পরিণত করি সামাজিক ক্রোধে। স্কুলের গুটিকয়েক সিপিএম-এর অত্যাচারে ক্ষিপ্ত ক্ষুব্ধ এক লেখক আঘাত করে গোটা শাসন ব্যবস্থাটার গোড়ায়। ড্রেন থেকে যেমন ডেঙ্গুবাহি মশা ছড়ালে ড্রেনে ওষুধ স্প্রে করতে হয়, আমি আমার আক্রমণের বর্শামুখ ধাবিত করি আলিমুদ্দিন ভায়া রাইটার্সের দিকে। একজন দুঃস্থ হতভাগা মানুষের প্রাণ কেড়ে নেবার জন্য কীভাবে তারা সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, হত্যাকে পরিণত করেছিল একটা মহোৎসবে, যা দেখে রাগে-ঘৃণায় দেহমন পুড়ে গিয়েছিল আমার। ভীষণ আক্ষেপ হচ্ছিল–এরা কারা আমাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে বসে গেছে। সেই যে একজন দাঁড়িওয়ালা বুড়ো বলেছিল, ‘দণ্ডদাতা কাঁদে যবে দণ্ডিতের সাথে, সে বিচার সর্বশ্রেষ্ঠ বিচার’। আমরা তো এতদিন এদের তাই ভেবে বসেছিলাম। এ তো দেখছি যাত্রা মঞ্চে যোগী সাজা জাদ। এই উপন্যাসে তখনই আমি লিখেছিলাম একটা নির্মম রাষ্ট্রীয় হত্যা হয়ে গেল। কিন্তু সমাজের সচেতন অংশ–কবি শিল্পী সাহিত্যিক কেউ কিছু করলেন না। কোনই প্রতিবাদ হল না। আমাদের এই প্রতিবাদহীনতা রাষ্ট্র পরিচালকদের আগামীদিনে আরও বড় কোন হত্যা মহোৎসব করতে যে উৎসাহিত করবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? তারা বুঝে গেছে, মানুষ এক মেরুদণ্ডহীন সরীসৃপ প্রাণীতে পরিণত হয়ে গেছে। আর মানুষ রুখে দাঁড়াতে পারবে না। এটাই দেশের পক্ষে আগামী দিনে অশুভ হয়ে দেখা দেবে।’
