বলি–যেতে তো আমাকে হবেই। না গিয়ে যে কোনো উপায় নেই। যদি ওরা সত্যি সত্যি মেরে ফেলবে বলে স্থির করে থাকে এই পরিকল্পনা সফল না হলে অন্য পথ নেবে। ছাড়বে না ওরা। ক্ষতি করতে পারে এমন কাউকেই ওরা ছাড়ে না।
কী করে মারবে তুমি না গেলে?
পাঠাবে ওরা। পাঠাবেই। আমি ওদের কর্মচারী তো–। ওরা যা বলবে আমাকে করতে হবে। বলো হবে কিনা? তা ধরো, ওদের একটা প্রেস আছে। যদি সেই প্রেস থেকে কিছু পোস্টার টোস্টার ছাপিয়ে আমাকে দিয়ে বলে–এগুলো সব বড় সাহেবের বিধানসভা কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে দিয়ে এসো। আমাকে তো যেতেই হবে। আমি যাচ্ছি–পথে কোন ফাঁকা জায়গায় কেউ আমাকে গুলি করে পালিয়ে গেল। তখন ওরা আমার মৃতদেহ নিয়ে মিছিল করবে। বলবে–এই দেখো পোস্টার, এ হচ্ছে আমাদের লোক, বধির স্কুলে কাজ করে। একে তৃণমূল এবং এস.ইউ.সি. মেরে ফেলেছে। মরি তাতে দুঃখ নেই, কিন্তু আমার মৃতদেহ নিয়ে সিপিএম ফয়দা তুলবে সেটায় আমার খুব কষ্ট হবে।
.
আজ সোমবার। রাত পোহালেই মঙ্গল। আমাদের দুজনার কারো চোখে ঘুম নেই। সকাল বেলায় যেতে হবে দত্তের বাড়ি। সেখান থেকে সিঙ্গেশ্বর। এই দুশ্চিন্তা চেপে বসে আছে আমাদের মনে–কী হবে। কী যে হবে!
মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত বন্দীর যেমন মনে হয় ঘড়ির কাটা বনবন করে ঘুরছে। আমাদেরও মনে হয় রাত বড় বেশি দ্রুত ফুরাচ্ছে। তখনই আমার শঙ্কর গুহ নিয়োগীর কথা মনে পড়ে যায়। তাকে যে খুন করা হবে, কারা কারা আর কেন তাকে খুন করা হবে সব সবিস্তারে একটা ডায়েরির পাতায় লিখে রেখে দেন, নিজের গলায় ক্যাসেটও করেন সব বক্তব্য। ফলে তার মৃত্যুর পর সব সত্য দেশবাসীর সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ে।
আমাকেও তাই করতে হবে। অতএব কাগজ কলম নিয়ে বসে পড়ি। কোথায় যাচ্ছি, কেনিয়ে যাচ্ছে, কেন নিয়ে যাচ্ছে, মারা হলে তা কেন? সব কিছু লিখে অনুর কাছে দিয়ে বলি–আমি যদি কালকের মধ্যে না ফিরে আসি জেরক্স করে এই চিঠির একটা করে কপি সব দৈনিক পত্রিকায় পাঠাবে। ডায়েরিতে ঠিকানা লেখা আছে, একটা পাঠাবে মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্রের ঠিকানায়। মহাশ্বেতা দেবীকে অবশ্যই একটা দেবে।
সারারাত ধরে এইসব করে, সকালবেলায় অনুকে কাদিয়ে বাচ্চা দুটোর গালে চুমুটুমু দিয়ে আমার ভাঙা সাইকেল নিয়ে রওনা দিলাম দত্তের বাড়ির দিকে। যা আছে ভাগ্যে হয়ে যাক।
অজন্তা রোডে সেই তিনতলা বাড়িতে ঢুকে আশ্চর্য হয়ে দেখি দত্ত একটা চৌকিতে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। চোখ বোজা, ডান হাতখানা কপালের উপর আড়াআড়ি রাখা। ঘুম নয়, চোখ বুজে কাতরাচ্ছেন তিনি।
কী ব্যাপার দাদা?
উহঃ আহঃ করে বলে দত্ত–কাল বিকালে পা পিছলে বাথরুমে পড়ে গেছি, কোমরে চোট পেয়েছি। হাঁটতে পারছি না বসতে পারছি না। ডাক্তার বলেছে চুপচাপ শুয়ে থাকতে। কবে সারবে, সারবে কী না সারবে তা কে জানে।
দারুণ সুখবর। আমি এখন নেচে উঠব কিনা, বুঝে উঠতে পারি না। তিরের মতো সাইকেল চালিয়ে বাড়ি এসে, অনুকে খবরটা দিয়ে প্রাণ খুলে দুজনে খুব হেসে নিই এক চোট।
দিন দুতিন পরে আর একটা সুখবর পাই, বড় সাহেবের বিধানসভা এলাকার এক সিপিএম নেতা খুন হয়ে গেছে। সেই নেতা অঞ্চলের বড় সাহেবের বিরোধী গোষ্ঠীর লোক হিসাবে পরিচিত। যে কারণে তার খুন হওয়াটা কিছু লোকের ধারণায় সিপিএম-এর অন্তর্কলহের পরিণতি। কেউ কেউ তো এমনও সন্দেহ করছে এতে বড় সাহেবের পরোক্ষ মদত আছে। সে কারণে তিনি খানিকটা বেকায়দায় পড়ে গেছেন।
ফলে, আমার ব্যাপারে যদি তার মনে কোনো রাগ দ্বেষ থেকেও থাকে আর সেদিকে তাকাবার ফুরসত রইল না। ওই ঝামেলা কীভাবে মেটাবেন সেই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
সময়, সর্বশক্তিমান সময়। সময়ের ঘাত প্রতিঘাতে সেই পত্রিকার লেখার উপর পলি পড়ে গেল তখনকার মতো।
তারপর? তারপর অনুকে নিয়ে গেলাম শাখার দোকানে। আশি টাকা দিয়ে এক জোড়া শাখা কিনে দিলাম। শাঁখা যদি ভেঙে যায়, সেটা অপচয় কখনো নয়। অপচয়, অসময়ে ভেঙে ফেলতে হলে। এখন সে সম্ভাবনা কিছু দুরে গেছে বলে মনে হল। হোক কুসংস্কার, তবু অনু শাঁখা পরুক। ওটাই আমার বেঁচে থাকার প্রমাণ।
.
রামকৃষ্ণ উপনিবেশের প্রণব চক্রবর্তী যাকে আমি আগে ছেলেধরা বলে উল্লেখ করেছিলাম, উনি এখন বর্ধমানের বাসিন্দা। চাকরি নিয়ে চলে গিয়ে পাকাপাকিভাবে ওখানেই বসবাস করছেন। বিশেষ একটা কলকাতার দিকে আসেন না। এখন আর তার আরএসপি পার্টির সাথে কোনও সম্পর্ক নেই। সেদিন মায়ের শরীর খারাপ শুনে দেখা করতে রামকৃষ্ণ উপনিবেশে এসেছিলেন। খবর পেয়ে আমি গিয়েছিলাম। কথায় কথায় উনি জানালেন যে, বামপন্থা থেকে বিচ্যুত হয়ে যে দল পুঁজিবাদীদের সেবাদাস হয়ে গেছে, আরএসপি নেতারা শুধু ক্ষমতার লোভে সেই দলের লেজুড়বৃত্তি করে চলেছে। সেই কারণে উনি দলত্যাগ করেছেন। বর্তমানে তিনি হাটেবাজারে পত্রিকা ও আটুল বাঁটুল নামে দুটি পত্রিকা চালান। সেই নিয়ে আছেন এবং থাকতে চান।
ওনার হাটেবাজারে পত্রিকা সাপ্তাহিক। চারপাতার বছরভর চলা এই পত্রিকার পুজো সংখ্যাটা হয় চোখে পড়ার মতো, যা অনেক নামী-দামী পত্রিকার ভীড়েও জ্বলজ্বল করে ওঠে–হারিয়ে যায় না।
ওনার সাথে দেখা হওয়ার পরে আমি আমার ঝুলি থেকে একখানা বৃত্তের শেষ পর্ব’ ওনাকে দিলাম। আমি যে লেখাপড়া শিখে গেছি এবং লিখেটিখে লেখার জগতে একটু নামটাম করে ফেলেছি, তা উনি প্রথম জানলেন। জানবেনই বা কি করে? উনি যাকে চেনেন, সে তো নিরক্ষর মদন’। মনোরঞ্জন আর মদন যে একই ব্যক্তি, এখনও বহু লোক তা জানে না। সেই নিরক্ষর মদন সাক্ষর হয়ে একটা গোটা বই লিখে ফেলবে কোনোদিন সে তার ধারণায় আসবে কি করে?
