এক নিশুতিরাতে এভাবেই গান গেয়ে–দুরুদুরু বুকে কাঁপা কাঁপা পায়ে পথ হেঁটে যাচ্ছি। হঠাৎ কালিকাপুর খালের এপাড়ের ঘন জঙ্গল থেকে বের হয়ে এল আটদশটা ক্ষুধার্ত শেয়াল। যেভাবে ওরা ছাগল ছানাকে চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে শিকার করে সেভাবে ঘিরে ফেলল আমাকে। আমার পালাবার কোন পথ নেই।
আমার কাছে তখন আত্মরক্ষা করার মতো কোনকিছুই নেই। এক হাতে টিফিন ক্যারিয়ার অন্যহাতে দু-ব্যাটারি একটা ছোট টর্চ। টর্চের আলোয় দেখতে পাচ্ছি শেয়ালগুলোর নরমাংস লোভী চোখগুলো চক্ করছে। এখানে কোন ঘরবাড়ি নেই যে চিৎকার করলে কেউ এসে আমাকে বাঁচাবে। বেশ কিছু দূরে পাতলা পাতলা কটা পাকা বাড়ি দেখা যাচ্ছে বটে সে সব বাড়ির আলো নেভানো দোর দরজা আঁটা। এতে কোন লোকজন আছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না।
আমার অবস্থা এখন চক্রব্যুহে পড়া অস্ত্রহীন অভিমুন্যের মত। এক অসহায় বালককে খাবে বলে বৃত্ত করে থাকা শেয়ালগুলো ক্রমে বৃত্ত ছোট করে আনছে। আর আমি অসহায়ভাবে মাঝখানে দাঁড়িয়ে–কোন দিক থেকে আক্রমণ আসবে সেই ভয়ে ঘুরপাক খাচ্ছি। সেই গ্রাম বাংলার দাড়িয়াবান্ধা খেলার মত নানা দিক থেকে শেয়ালগুলো ‘ঝোল’ মারছে।
আমার পরিধানে কোমরের কাছ বরাবর রবার লাগানো কালো ছাতার কাপড়ের একটা প্যান্ট। গায়ে–এককালে যার রঙ সাদাই ছিল, এখন মেটে মেটে সেই স্যান্ডোগেঞ্জি। প্যান্টের উপর কষে বাঁধা একখানা গামছা। গ্রামবাংলার চাষির ছেলে, গামছা আমার সদাসঙ্গী। গামছা আমার কাছে শুধু চান করবার এক টুকরো বস্ত্র নয়, ঘাম মোছার রুমাল, মাথায় বাঁধার পাগড়ি, গায়ে দেবার চাদর, বিছিয়ে শোবার বিছানা, কোমরের বেল্ট।
আজ এখন মনে হল এটা একটা যুদ্ধের অস্ত্রও হতে পারে। যা আমাকে আত্মরক্ষায় সাহায্য করতে পারে। তাই চট করে পাথের পাশে পড়ে থাকা এক খানা ইটের টুকরো কুড়িয়ে বেঁধে নিলাম গামছার এককোণে। তারপর গামছার অন্যপ্রান্ত ধরে বনবন করে চক্রাকারে ঘোরাতে শুরু করে দিলাম। শেয়ালগুলো বুদ্ধিমান এবং যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ। তারা বুঝে গেল দূর থেকে যতই পায়তাড়া দেখাক আমার কাছে আর এগিয়ে আসতে পারবে না। তাই রণেভঙ্গ দিয়ে জঙ্গলের মধ্যে পালিয়ে গেল।
সামান্য একটা ইঁটের টুকরো যে আমার প্রাণ বাঁচাতে পারে তা আগে জানা ছিল না। আসলে জীবন তো এই। পথে পথে ঠোক্কর হোঁচট খেতে খেতে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠা। এই সমৃদ্ধি যার যত বেশি সে তত অকুতোভয় সাহসী নির্ভীক বেপরোয়া।
পার্ক সার্কাসের বুড়ো দোকান মালিকের একটা বিশেষ শখ, রেল লাইনের পাশে যে ছোট গুমটি মতো বিড়ির দোকান সেই দোকানের মাথা চ্যাপ্টা লাল সুতোর নেপানি আর গুজরাটি তামাকের মিশ্রণে দাড়িআলা বুড়োর হাতে বানানো বিড়িতে। সে এমন বিড়ি যা ভূভারতে আর কোথাও মিলবে না। সে বিড়ির ধোঁয়ায় কলজে মন প্রাণ সব শীতল হয়ে যায়। রোজ রাত সাড়ে নটার সময়ে–চা দোকান বন্ধের ঠিক আধ ঘণ্টা আগে আমাকে পাঠানো হয় সেই বিড়ি আনতে।
আগে এখানকার পরিবেশ পরিস্থিতি অন্যরকম ছিল, এখন অন্যরকম। আজ এই অন্ধকার রাতে–যখন ছুরি হাতে নিয়ে কষাইয়েরা ওত পেতে আছে, মানুষের গলার নলি কাটবে বলে, তখন মালিক রোজকার মত হুকুম দিল–যা, বিড়িটা গিয়ে নিয়ে আয়। আমি নিশ্চিন্ত জানি, সেদিনের সেই রক্তস্নাত শহর কলকাতায় যদি কারও উপর কারও সামান্য দরদ থাকে, জীবনের মূল্য কানাকড়িও মনে হয়, তাকে রাত সাড়ে নটায় পাঠাতে পারবে না ওই রকম এক এলাকায়। যেখানে ‘দাঙ্গা’ শুরুর আগেই দু-দলে দাঙ্গা চলে রাতদিন। চাকু চলে বোমা পড়ে মানুষ মরে।
আমি মালিকের বেতনভুক ভৃত্য। তার মুখের উপর না বলার কোন অধিকার নেই। তাহলে কাজ চলে যাবে পঁচিশটাকা মাস মাইনের। পঁচিশটাকা অনেকটাকা। সাড়ে বারো কিলো চাল হয়। তাই নিরপায় এক বালক নির্জন অন্ধকারে হাঁটা দিল জীবনের এক রক্তাক্ত বিভৎস অধ্যায়ের দিকে।
সে সময় পার্ক সার্কাস রেল স্টেশনটা তৈরি হয়নি। চারদিকের ঝোঁপঝাড় গাছপালায় এলাকার পরিবেশটা ছিল কেমন বন্যবন্য। যেন বাঘ সিংহ বুনো শূকর বুনো মোঘ অবাধে ঘুরে বেড়ায়।
যাবার সময়ে ঠিকঠাক গেছি, পথে কোন অসুবিধাই হয়নি। বিড়ি কিনেছি এক বাণ্ডিল। ঠিক মাঝখান থেকে একটা বিড়ি বের করে দোকানের পাশে ঝোলানো দড়ির আগুনে ধরিয়ে নিয়ে সুখটান দিতে দিতে ফিরে চলি চায়ের দোকানের দিকে। হঠাৎ এক মোড়ে অন্ধকার ফুড়ে আমার পথরোধ করে দাঁড়াল তিন চারজন ছেলে। দেখলেই বোঝা যায় এরা কোন ভদ্র সভ্য নয়–রেল বস্তির বখাটে বাচ্চা। তারা বয়সে উচ্চতায় ছোট হলেও একজনার হাতে ধরে থাকা চাকুখানা মোর্টেই ছোট নয়, বেশ বড়। একে কানপুরি বলে। ছেলেটার গলার গর্জনও বেশ বড়দের মতো। সে সেই চাকুখানা আমার সামনে বাগিয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করে, “আবে এই, তোর কী জাত রে?” ছেলেগুলো কথা বলছে বাংলায়। তবে এ আমার পরিচিত বাংলা ভাষা নয়, হিন্দির মিশেলে বিকৃত বাংলা বা বাংলা ভাষার “এই সি কী তেইসি”।
এখন চারিদিকে দাঙ্গা। রাজাবাজার খিদিরপুর জ্বলছে, মানুষ মরছে। এই অকটবিকট সময়ে এরা অন্যকোন জাত নয়, স্রেফ আমি হিন্দু না মুসলমান সেটাই জানতে উৎসুক। যদি ওদের স্বজাতির হই গলাগলি করবে। যদি অন্য জাতির হই গলার নলিতে চাকু চালিয়ে দেবে। এই হনন অভিলষিত সময়ে এর বাইরে আর কোন ব্যাসকূট নেই। “বলনা রে কী জাত তোর”। তাড়া দেয় তারা–“জলদি বল”। কিন্তু তখন যে ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে বৈশাখের মাঠ। গলা দিয়ে কোন স্বর সরে না। বুঝেও উঠতে পারি না কোন জাত বলব। কোন জাতের কথা বললে এরা আমাকে না মেরে ছেড়ে দেবে। ওদের মুখে দাড়ি নেই, মাথায় টিকি নেই, পরিধানে লুঙ্গি নেই, কপালে ফোঁটা নেই। কারও শরীরে এমন কোন চিহ্ন নেই যা দেখে চিনতে পারি ওরা কী জাত। তবে তো বলতে পারি–আমি ভাই তোমাদেরই জাত। আমার জবাব দিতে দেরি হওয়ায় ওদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটছে। বারবার তাগাদা দিচ্ছে “বলনা রে কোন জাত”। আমাদের সমাজের লোকেরা বলে থাকে, বোবার শত্রু নেই। এখন মুখ বন্ধ করে রাখাটাই যে বিপদ ডেকে আনছে। বুঝতে পারি একটা কিছু বলতেই হবে। না হলে এরা আমার পথ ছাড়বে না।
