বলে সে জায়গা নেবে, সে ভালো কথা। মরার কথা আসছে কেন?
বলি, মানুষের জীবনের কী কোনো ঠিক আছে। আজ আছে কাল নেই। রোজ পেপারে দেখি গ্যাস সিলিন্ডার ফেটে কেউ না কেউ মরে গেছে। আমিও তো দুটো বড় ওভেন দুটো ছোট ওভেনের সামনে গ্যাস নিয়ে কাজ করি। কখন কী হবে, কিছু কী বলা যায়। কিছু হয়ে গেলে তোমরা তো পথে ভাসবে।
তুমি থামবে। আমাকে ধমক দেয় অনু।
তবে কদিন পরে সত্যিই আমি দুকাঠা জায়গা কিনে ফেলি সাতাশ হাজার টাকা দিয়ে ক্ষুদেরাবাদে। কিনি অনুরই নামে। ব্যাঙ্কের টাকা নিতে এলে একজন গ্যারেন্টর লাগে। আমার চাকরি আমার গ্যারেন্টার। চাকরি যদি থাকে টাকা পাবে। চাকরি না থাকলে আমি উধাও। জায়গা অনুর নামে, কী করে নেবে টাকা।
সবাই বলে, সরকারি চাকরি পাওয়া যত কঠিন যাওয়া আরো কঠিন। আমি কেন এই স্কুলের সবাই জানে, যে চাকরি আমরা পেয়েছি তা সরকারের কম, সিপিএমের বেশি। তাদের ইচ্ছা হলে চাকরি থাকবে, ইচ্ছা না হলে থাকবেনা।রাত দশটায় আমার কানে রিভালভার ঠেকিয়ে রেজিগনেশন। লেটারে সই করিয়ে নিলে আমি কী করতে পারব! যদি গেটে পাঁচটা ছেলে দাঁড়িয়ে থাকে আর আমাকে স্কুলে ঢুকতেইনা দেয়–যদিবা ঢুকি টিচার ইনচার্জ হাজিরা খাতায় সই না করতে দেয় যদি ছয় মাস অনুপস্থিত দেখিয়ে বরখাস্ত করে দেয়, তখন বা আমার কী করবার থাকবে? থানায় যাবো; থানা কোনো ডায়েরি নেবে না, তখন কী উপায়?
সিপিএম পার্টি সর্বশক্তিমান পার্টি। ওরা না পারে এমন কোনো কাজ নেই। ওদের ভয় না পায় এমন কোনো লোক নেই।
বাড়ি হয়ে যাবার পরে অনুকে বলি, আমি যা রোজগার করি সে তো আছে। যদি তুমি কোনো একটা কাজ করো–দুটো পয়সা জমে। অনু কদিন পরে রুবি হাসপাতালের কাছে এক বিখ্যাত জুতো কারখানায় একটা কাজ খুঁজে নেয়। ফুরনের কাজ, যাতে মাসে দেড় দুহাজার হয়ে যায়।
বুক থেকে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ে আমার। এবার রণক্ষেত্রে ঘটোৎকচের মতো বুক চিতিয়ে দাঁড়াই। এসো হুঙ্কার, এসো ধমক, বিপদ, একাঘী বান আমি এখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
দত্তের ফোন এল কদিন পরে–আমার বাড়ি আয়, কথা আছে।
আমি জানতাম ডাক আসবে। প্রস্তুত ছিলাম।
আমি যাবার পরে বলেন তিনি–মঙ্গলবার তোর ছুটির দিন তো? ওইদিন তোকে আমার সাথে একটু যেতে হবে।
কোথায়?
সিঙ্গেশ্বর।
আমি আগে একবার ওখানে দত্তের সাথে গেছি তাই জায়গাটা আমার চেনা। যাদবপুর থেকে ট্রেনে ঘন্টা খানেক লাগে তালদিতে যেতে। তালদি থেকে ভ্যান রিক্সায় যেতে হবে আরো ঘন্টাখানেক। তারপর পায়ে হেঁটে আর আধঘন্টা। তবে যাওয়া যাবে সিঙ্গেশ্বর। ধুধু মাঠের মাঝখানে এই ছোট্ট গ্রাম। তিরিশ চল্লিশ ঘর দরিদ্র মুসলমান পরিবারের বসবাস এই গ্রামে।
দত্ত জীবনে কোনোদিন চাকরি ব্যবসা কিছু করেননি। পার্টি করেছেন। পার্টির ক্ষমতায় যাদবপুর এবং বহু জায়গায় তার পুকুর নেওয়া আছে। যাতে মাছ চাষ হয়। সিঙ্গেশ্বরে আছে বিরাট মাছের ঘেরী। যে ঘেরীর এপাড় থেকে ও পাড় ধুধু দেখায়। তবে উনি একা নন, স্থানীয় আরো কুড়ি পঁচিশ জন সিপিএম নেতা কর্মীরও অংশ আছে এতে।
সবাই না হলেও বহু লোক জানে–ঘেরী পত্তনের কাল থেকে আজ পর্যন্ত এই ঘেরীর দখল রাখা নিয়ে কত রক্তের নদী বয়ে গেছে। মানুষের দাম এখানে মাছের চেয়েও কম। যারা এইসব ঘেরীতে পাহারা দেয় সব কুখ্যাত খুনি ডাকাত। মানুষ মারা যাদের কাছে জলভাত। যারা, মাছ চুরি করতে এসে ধরা পড়া চোরকে কেটে কুচি কুচি করে মাছকে খাইয়ে দেয়।
আগে যখন ওখানে গিয়েছিলাম তখন বুক কাঁপেনি। এখন বুক কেঁপে গেল। পার্টির একনিষ্ঠ কর্মী দত্ত। পার্টির নির্দেশের চেয়ে তার কাছে আর বড় কিছু নেই। কোন প্রশ্ন নয়–তার কাজ অক্ষরে অক্ষরে নির্দেশ পালন করা। কী নির্দেশ এসেছে দত্তের কাছে তা কে বলতে পারে। চারদিকে লাশ পড়ছে। খবরের কাগজের পাতা মানুষের রক্তে লাল। মৃত্যু আর কোনো বেদনাদায়ক ঘটনা নয়, এখন একটা খবর মাত্র। রুটিন কার্যক্রম।
কে বলতে পারে উপর মহল থেকে আমাকে টপকে দেবার আদেশ এসেছে কিনা। মালটা আমাদের অনেক গোপন খবর জেনে ফেলেছে। চাকরি থেকে বের করে দিলে পথে পথে চেঁচাব। লিখবে কাগজে কাগজে। তার চেয়ে হাপিশ করে দেওয়ায় ঝামেলা কম।
এদের যা ক্ষমতা, চাইলে রাতে, যখন আমি সাইকেল চালিয়ে ক্ষুদেরাবাদে ফিরি, সুনসান রাস্তায় অন্ধকারে আমার কাম তামাম করে দিতে পারে। তবে এখন চারদিকে জনবসতি গড়ে উঠেছে, তাই লাশ লুকাতে পারবে না।
মনে সন্দেহ জাগে আমার–এর সম্ভবত কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না। কেন তা নেবে? যখন ইচ্ছা করলে শিকারকে পছন্দমতো জায়গায় নিয়ে যেতে বাধা নেই। তারপর সারারাত ধরে ছোট ছোট কুঁচি করে পুকুরে ফেলে দিতে অসুবিধাও নেই। হাইব্রিড মাগুর এক রাক্ষুসে মাছ। জলে নামিয়ে দিলে জ্যান্ত মানুষকে খেয়ে নেয়। আর আমি তোমরা। এক রাতে কোথায় হাপিস হয়ে যাব কোনো হদিশ থাকবে না।
আমি সব বুঝতে পারছি। তবু না বলার উপায় নেই। তাই বাড়ি ফিরে বিধ্বস্ত মন নিয়ে প্রতিক্ষায় থাকি আগামী মঙ্গলবারের। যে মঙ্গল আমার জীবনে এক চরম অমঙ্গল নিয়ে আসছে।
এতদিন অনু একটু একটু করে আমার মুখে শুনে শুনে আমার প্রতি সিপিএম দলের মনোভাব সব জেনে ফেলেছে। তাই আশঙ্কা আতঙ্কে নীল হয়ে গিয়ে বলে সে, তুমি যাবে না। সবাই জানে দত্তদা তোমাকে দণ্ডকারণ্য থেকে ফিরিয়ে এনেছে। চাকরি দিয়েছে। সে তোমার পরম উপকারি। তুমি নিজেও কত জায়গায় লিখেছ এই সব কথা। এখন সে তোমাকে মেরে দিলে কেউ তাকে সন্দেহ করতে পারবে না। তোমার লেখাই ওকে বাঁচিয়ে দেবে। ওর পক্ষে তোমাকে মেরে ফেলা সব চেয়ে সহজ। তুমি একদম যাবে না।
