বলি, উনিতো আমার কথার কোনো দামই দেননি। ঘাস ছিঁড়তে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
তা বলে তুই এইসব লিখবি? ভয় করেনি? এখন যদি পার্টির ছেলেরা ধরে তোকে তেলে দেয়, কী করবি? তোর মতো একটা লোক মারা আর রাস্তার একটা কুকুর মারা সমান তা জানিস?
আমি কী তখন আমাতে ছিলাম, নাকি সেই মৃত্যু বিলাসী পতঙ্গ হয়ে গিয়ে ছিলাম যে আগুন দেখলে মরবে বলে ঝপায়।
সেই পত্রিকাখানা হাতে তুলে নিয়ে বলি–দত্তদা এটা সোমেন চন্দ সংখ্যা। সোমেন চন্দ বহু বছর আগে ঢাকার রাজপথে ফ্যাসিবাদ বিরোধী এক মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। সেই তাপরাধে তাকে রাস্তায় ফেলে পিটিয়ে পিটিয়ে মেরেছিল। কারা, তা জানেন? কারা তার মৃতদেহের উপর দাঁড়িয়ে নেচেছিল, চোখ খুবলে নিয়েছিল? আর.এস.পি. আর ফরওয়ার্ড ব্লকের লোকেরা। সেদিন সে যে দলের মিছিল নিয়ে যাচ্ছিল আর যাকে তারা খুন করেছিল সব মিলে আজ বামফ্রন্ট।কমিউনিস্ট আর কমিউনিস্ট নিধনকারি–মিলে মিশে একাকার। দেখতে গেলে সোমেন চন্দের মৃত্যু ব্যর্থ হয়ে গেছে। কিন্তু যায়নি–কিছু মানুষের মননে চিন্তনে ইতিহাস চর্চায় সে বেঁচে আছে, অমর হয়ে আছে। আমি যদি ওইভাবে মরি–পত্রপত্রিকা টিভিতে ছেয়ে যাব। অমর হয়ে যাব। অমরত্ব কেনা চায়।
আমার দিকে কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে থেকে বলেন তিনি, আচ্ছা তুই এবার যা, কেটে পড়।
আমি তখন বুঝিনি এখন বুঝি যে মানুষ নয়, মানুষকে অমর আর মহান বানায় সময়। সময়ই এক অত্যাচারি ঘৃণিত নবাবকে দেশপ্রেমী বানিয়ে দিয়েছিল। স্বাধীনতাকামী মানুষের অন্তরে সিরাজ হয়ে উঠেছিল একটা প্রতীক। মদ্যপ চরিত্রহীন বেশ্যাগৃহগামী মঙ্গল পাণ্ডে হয়ে গিয়েছিল স্বাধীনতা যুদ্ধের এক মহান নায়ক। সবই সময়ের দয়া এবং দান।
সময়ই ইতিহাসের পাতায় চিহ্নিত করেছে মহামতি লেনিনকে এক মহানায়ক হিসাবে। সময়ই তার মূর্তি মিশিয়ে দিয়েছে ধুলোয়।
.
সারা বিকেলটা লোডশেডিং ছিল। অসহ্য গরমে প্রাণ আইঢাই করছিল সবার। এখন অবশ্য বিদ্যুৎ এসে গেছে, পাখা ঘুরছে। তবে পাখার সে বাতাসে গরম হলকা। আজ আমি ডিউটিতে যাইনি। এখন আমার হাতে সি.এল. নামক একটা ব্রহ্মাস্ত্র এসে গেছে। বছরে চৌদ্দ দিন ছুটি করতে পারি। তাই আজ বিকালের পরে বউকে নিয়ে একটু ঘুরতে বের হই। ইচ্ছা, আজ ওকে একটা মনের মতো জিনিস কিনে দেব। ছানার জিলাপি খেতে অনুখুব ভালোবাসে, ছানার জিলাপি খাওয়াব।
অনু আমাকে একজন রসকষহীন রাগী প্রকৃতির মানুষ বলে মনে করে। এত বছর পরে আজ আমার এমন রোমান্টিক মুড দেখে অবাক হয়ে বলে সে-কী ব্যাপার বলো তো! সূর্য আজ কোন্ দিকে উঠেছে যে মরুভূমিতে বন্যা হচ্ছে!
বলি–কিছু না, এমনি।
এমনি এমনি তো কিছু হয় না। একটা কার্য কারণ থাকে।
হেসে বলি–মনে হল একটু আধটু এসব করারও দরকার আছে।
যখন দরকার ছিল তখনই কিছু করোনি। এখন আর এসব করে কী বা হবে। সেই বয়স সেই আর কী ফিরে আসবে?
বলি আমি–একজন বিখ্যাত মানুষ বলেছেন–জব জাগা তবহি সাবেরা। ঘুম কখনই ভাঙবে সেটাই সকাল।
সূর্য মাথার উপর থাকলেও?
সূর্য ডুবে গেলেও।
এখন আমার মনে পড়ে যায় সেই গল্পটা–একজন লোক তার বউকে সাজাবে বলে জঙ্গলে ফুল তুলতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলে। তারপর ঘুরতে ঘুরতে পথ খুঁজে পেয়ে যেদিন যে বাড়ি ফিরতে পারে বিশ বছর পার হয়ে গেছে। বুড়ি হয়ে গেছে সুন্দরী বউ। এই গল্প মনে পড়ায় আমাকে সেই বিড়ম্বিত কথা নায়কের মতো মনে হয়, যার হাতের আঙুল গলে চলে গেছে সময়।
ঘুরতে ঘুরতে অনুকে নিয়ে চলে আসি যাদবপুর। সেই জায়গাটায় দাঁড়াই যেখানে অনুকে প্রথম দেখেছিলাম। সেই বাস রাস্তার দিকের পাঁচিলটা আর নেই। পাঁচিল ভেঙে রাস্তা চওড়া করা হয়েছে।
হকার মার্কেট থেকে অনুর জন্য কটা শাড়ি কিনি। ছেলে মেয়ের জন্য জামা প্যান্ট। অনু বলে-তোমার জন্য কিছু কেনো।
বলি–আমি এখন কিছু কিনব না। আমার আছে।
কোথায় আছে? একটা প্যান্ট একটা মাত্র শার্ট।
ওই এখন চলুক। পরে দেখা যাবে। মনে মনে বলি, বেঁচে থাকলে তো প্যান্ট শার্ট পরবো। না বাঁচলে ওসব কী কাজে লাগবে।
যখন কেনাকাটা শেষ করে ঘরের দিকে ফিরব বলে অনু, আমাকে একজোড়া শাঁখা কিনে দেবে? দেখো না, সেই কবে থেকে হাতটা খালি। এঁয়োতির হাত খালি থাকলে ভালো দেখায় না। সেই বিয়ের সময়কার শাঁখা, কতদিন টিকবে। আজ যখন এত কিছু কিনলে এক জোড়া শাখা কিনে দাও।
বলি ওকে, শাঁখা ফাঁকা পরা এসব এক কুসংস্কার। শাঁখা পরার দরকার নেই। একটা ঠুনকো জিনিস, একটু টোকা লাগল কি গেল। ফালতু কতগুলো টাকা নষ্ট। এর চেয়ে ওই টাকায় তুমি অন্য কিছু নাও না!
কী নেব?
ইয়ে–মশারি কিনি একখানা কী বল। বেশ ঘুমানো যাবে।
এরপর একখানা মশারি আর অনুর জন্য দুটো সাদা চুড়ি কিনে বাসায় আসি। সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত জাগি আমি আর অনু। রাত যখন খুব গভীর তখন বলি-আমাদের স্কুলে ব্যাঙ্কের এক কর্মচারি এসেছিল বেশ কিছুদিন আগে। তারা লোন দেয়। তা স্কুলের সবাই তার মারফত ব্যাঙ্ক লোনের দরখাস্ত দেয়। আমিও দিয়েছিলাম পঁয়ষট্টি হাজার টাকা পাওয়া গেছে। এই টাকা পাঁচ বছরে শোধ করতে হবে। এখনো তুলিনি, তবে কাল পরশু তুলে নেব। আমি ভাবছি ওই টাকায় ক্ষুদেরাবাদ, গোপালনগর এসব দিকে কোথাও দুই কাঠা জায়গা নেব। বহু লোক নিচ্ছে। খাস জমি সিপিএমের লোকেরা বেচছে। পনের কুড়ি হাজার টাকা কাঠা। যদি ওখানে একটা ছোট ঘর বানিয়ে নিই মাসে মাসে ঘর ভাড়াটা বেঁচে যাবে। যদি আমি মরে ফরে যাই, বাচ্চাদুটো নিয়ে থাকতে পারবে।
