সিপিএম সরকার প্রাথমিক স্কুল থেকে ইংরাজি তুলে দিয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থা ভিতর থেকে এমন অন্তঃসার শূন্য করে দিয়েছে যে আর কেউ ‘শিক্ষিত’ হতে পারবে না। হবে অশিক্ষিত দলদাস সুবিধাভোগী বুদ্ধি বিবেক বর্জিত মানব।
এককালে যারা রাজনীতি করত প্রচুর পড়াশোনা করতে হতো। তখন নিয়মিত পার্টির ক্লাস হতো। সে কাল আর নেই। ফলে সিপিএমের কর্মীরা আর বইপত্র খুব একটা ছোঁয় না। বই পড়ার প্রয়োজন কখন হয়? যখন কিছু জানা বোঝার দরকার হয়। যার জন্ম থেকেই সবকিছু জানা তার আর বই পত্রের কী দরকার?
একজন হিন্দু ঘরে জন্ম দেওয়া শিশু যেমন বাল্যবস্থায় জেনে যায় ভগবান আছেন–তিনি সর্ব শক্তিমান, একটি মুসলমান ঘরে ভূমিষ্ট হওয়া শিশু যেমন দুপায়ে দাঁড়িয়েই টের পায় আল্লা আছেন, আল্লা ছাড়া আর কোনো মাবুদ নাই। তেমনই সিপিএম জমানায় জন্ম দিয়ে যে কোনো শিশু বুঝে যায় সিপিএম পার্টি সর্বশক্তিমান। এই পার্টি না করলে রেহাই নাই। আর একটু গুছিয়ে করতে পারলে পোমাটারি ঠিকেদারি তোলাবাজি-বিবিধ সুযোগ।
তবে সেই সম্পাদক তেমন নন উনি পড়েন। কিন্তু কেন কে জানে আমার লেখাটায় চোখ বোলাতে পারেননি। অথবা বোলাননি। ভেবেছিলেন আমি যখন বড় সাহেবের স্কুলে কাজ করি যা-ই লিখি সিপিএম পার্টির বিরুদ্ধে কী আর কিছু লিখব। তাড়াহুড়ো করে উনি হয়ত এই বিশ্বাসেই লেখাটা প্রেসে পাঠিয়ে দেন। কম্পোজিটার কম্পোজ করে প্রুফ রিডার প্রুফ দেখে প্রকাশক লেখাটির প্রকাশ করে দেয় ওই একই ভরসায়–দাদা যখন দিয়েছেন, পড়ে, জেনে বুঝে তবেই তো দিয়েছেন। আমরা আর কী দেখব।
মরিচঝাঁপির ঘটনায় যে মানুষগুলোর ঘর পুড়েছিল, আহত, নিহত, ধর্ষিত হয়েছিল তাদের একটা বড় অংশ নমঃশূদ্র। উত্তর এবং দক্ষিণ দুই চব্বিশ পরগণা জুড়ে ছড়িয়ে আছে এই সম্প্রদায়ের বহু মানুষ। এদের আবার অনেকে মতুয়া ধর্মে বিশ্বাসী। এরা তাদের ভোটদান ক্ষমতার বলে বহু বিধানসভা লোকসভার সিটে হারানো জেতানোর ক্ষমতা রাখে।
সিপিএমের চালাক রাজনেতা বিশেষ করে রাজনীতির চাণক্য অনিল বিশ্বাস সেটা অনুধাবন করেছিলেন, যে, এক দেশ, স্বজাতির মানুষ হবার কারণে মরিচঝাঁপির মানুষের হত্যালীলায়, তাদের বুকে একটা ক্ষত থাকা অতি স্বাভাবিক। এই ক্ষতে মলম না লাগালে সিপিএম পার্টির বিপদ আছে।
তাই, দলিত আন্দোলনের নেতারা যাকে বলেন চামচা, সিপিএম পার্টি নমঃশুদ্র শ্রেণির মধ্যে সেই চামচা খোঁজার কাজ শুরু করে দেয়। এই রকম কিছু লোককে পেয়েও যায়। যারা পরবর্তীকালে প্রমাণ করতে সক্ষম হয় যে তারা চামচা নয়–বেলচা বেলচাবৃত্তি দিয়ে সিপিএম পার্টির কাছে থেকে অর্জন করে সেই বিশ্বাস-উনি আমাদেরই লোক।
তাই ২০০৪ সালের বইমেলায় যখন সেই পত্রিকাখানি প্রকাশিত হয় ত্রিপুরার সিপিএম সরকারের আর একজন ‘আমাদের লোক’ পাইয়ে দেন ‘অদ্বৈত মল্লবর্মন পুরষ্কার’। পত্রিকার লেখকসূচিতে উপদেষ্টামণ্ডলীতে একঝাক সিপিএম নেতার নাম আছে, একটা পত্রিকার পুরষ্কার পাবার জন্য আর কী যোগ্যতা দরকার?
তারপরে কোন এক সময়ে সম্পাদকের চোখে পড়ে কোন এক ভুলের ফাঁক ফোকর গলে পত্রিকার ঐক্য বিঘ্নকারি একটা লেখা স্থান পেয়ে গেছে। তখন তিনি আর পোস্টাপিসের উপর আস্থা না রেখে লোক মারফত একখানা পত্রিকা বধির স্কুলে পাঠিয়ে দেন। দেখুন কী মাল আমাদের মধ্যে ঢুকে বসে আছে।
আর বাকি সব পত্রিকার বাঁধাই খুলে আমার লেখাটিকে বাদ দিয়ে নতুনভাবে বাঁধাই করে তবে সেই পত্রিকা গ্রাহকদের দেওয়া হয়। পাঠানো হয় বুকস্টল এবং পত্রিকা বিক্রেতাদের কাছে।
ফুল ফুটলে নাকি তার গন্ধে সবাই টের পায় ফুল ফুটেছে। তবে মজা হচ্ছে ফুলের গন্ধে যদি কারো মন মোহিত না ও বা হয় ইঁদুর পচা গন্ধে বিরক্তি অবশ্যই আসবে তা সে চাক বা না চাক, গন্ধ ধাওয়া করে গিয়ে জানিয়ে দেবে–এই যে আমি।
আমি লিখি সে গন্ধ যাদের নাকে যায়নি, আমার পচনটা গেল। শালা এতদিন সিপিএমের অন্নজল খেয়ে সিপিএমের লোকজনের সাথে মিশে সিপিএম সমর্থক কাগজে সিপিএমের বিরুদ্ধে এইসব লিখেছে? ডাক বাঞ্চোদকে।
দত্তদার একটা ফোন এল–এক্ষুনি একবার আয়।
আমি যাবার পর টেবিল থেকে একখানা পত্রিকা তুলে সজোরে আমার গায়ে ছুঁড়ে মারলেন–কী লিখেছিস এতে। তোর এত সাহস কী করে হয়?
বলি–আমি তো সত্যি কথাই লিখেছি।
খেপে উঠলেন দত্ত–তুই তো বালের এক লেখক তোর মতো কত গা মায়ের ভোগে চলে গেছে। বালস্য বাল তুমি এসেছো সত্যি কথা মারাতে। সত্যি? ছাই হয়ে যাবি তা জানিস?
উত্তেজনায় সারা শরীর কাঁপছে তার, কপালে বিনবিনে ঘাম। বলেন তিনি এর আগে এক বাঞ্চোৎকে বড় সাহেবের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম। সে দুখানা মাল নিয়ে পালিয়ে গিয়ে সেই মাল দিয়ে ডাকাতি করে ধরা পড়ে। গাঁঢ়ে বাঁশ চলে যায় আমার। ভেবেছিলাম তুই আমার সেই দোষ খানিকটা ঢেকে দিতে পারবি। এখন তো দেখছি তুই যা করেছিস আর একটা বাঁশ যাবে আমার গাঁঢ়ে। আর আমি কোন্ মুখে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াব।
বউদি এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করে–চা খাবে? চিৎকার করে ওঠে দত্তদানা, চা দেবে না ওকে। জলও দেবেনা। শালা উঁচ হয়ে ঢুকে এখন ফাল হয়ে বের হচ্ছে। তারপর আগুন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলেন–একদিন তোকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলাম। বেঁচে গেছিস। জানিনা এতদিন পরে আবার তোকে গুলি করতে হবে কিনা। আমি পার্টির সদস্য। পার্টি আমাকে যা বলবে করতেই হবে, আমি পার্টির আদেশ অমান্য করতে পারব না। আমার কাছে পার্টি ছাড়া আর কেউ আপন নয়। একটু যেন আক্ষেপ শোনা যায় দত্তের গলায় পার্টি ছাড়া আর কী আছে আমার? সারা জীবন পার্টির আশ্রয়ে আছি। ভুল হোক ঠিক হোক আমাকে এই ছাতার তলায় থাকতে হবে। এই বয়েসে আর কোথায় যাব আবি। যদি কোনদিন তোর বুকে গুলি চালাই-যেন দুঃখ করিসনা। সুযোগ দিয়েছিলাম, তা কাজে লাগালি না। বলেছিলাম বড় সাহেবের জীবনী লেখ। লিখলি না।
