.
আমার এক বন্ধুর নাম রাজু দাস এয়ারপোর্টে চাকরি করে দমদমে থাকে। সে নাটক লেখে, অভিনয় করে, একটা নাটকের দল আছে তার। যাদের আগে চণ্ডাল বলা হতো, এখন নমঃশূদ্র বলা হয়, রাজু দাস সেই জাতির মানুষ এবং তার লেখা নাটকে ওই বর্ণবাদী ব্যবস্থার প্রতি আক্রোশ অবশ্যই থাকে।
সে এসে আমাকে বলে, তোমার একটা লেখা দিতে হবে।
কী লেখা?
তোমার জীবন সংগ্রামের কাহিনি। বলে সে অমুক বিশ্বাস নামটা কি শোনা আছে? সে একটা পত্রিকা বের করে। এবার যে সংখ্যাটা করতে চাইছে, তার ইচ্ছা ওই পত্রিকায় একজন দলিত লেখকের, নিজের লেখায় নিজের কথা রাখবে। আমার সাথে তার কথা হয়েছে, তোমাকে দিয়ে এর সূচনা হোক। এই সংখ্যায় তুমি লেখপরের সংখ্যায় আমি লিখব, তার পরের সংখ্যায় অন্য আর কেউ।
আমি কী দলিত লেখক? অদল বদল পত্রিকা সম্পাদক বিমল বিশ্বাস, যে ওই পত্রিকাখানা। একক প্রয়াসেকুড়ি বছর ধরে নিয়মিত প্রকাশ করছেন, তিনি বলেছেন-”দলিতদের দ্বারা, দলিতদের জন্য, দলিত বিষয়ক যে রচনা তাকে দলিত সাহিত্য বলে।”আমি যদিও জন্মসুত্রে দলিত কিন্তু বিমল বিশ্বাস কথিত দলিত সংজ্ঞায়, আমার লেখা তো দলিত সাহিত্যের পর্যায়ভূক্ত হবে না। রীবাজ, অতিথি সেবা, আর এখন ধারাবাহিক প্রকাশ হতে থাকা–জীবন চণ্ডাল, এই তিনটি লেখাকে বাদ দিয়ে এত বছর ধরে যা কিছু লিখেছি, সেইসব লেখায় সমাজের নীচের তলার মানুষের জীবনের ক্রোধ প্রেম প্রতিবাদতীব্রতার সাথে থাকলেও বর্ণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটা শব্দও নেই। তাই ওগুলোকে ‘দলিত সাহিত্য’ বলা যাবে না। কাজেই আমি দলিত লেখক নই।
বলে রাজু দাস-তুমি দলিত লেখক। অবশ্যই তুমি দলিত লেখক। তুমি যে নীচের তলার মানুষের জীবন যন্ত্রণা নিয়ে লিখেছো তারা কারা? বামপন্থীরা বলবে–শ্রমিক কৃষক খেটে খাওয়া মানুষ। আমি বলব কাওরা বাগদি নমঃশুদ্র। তথা কথিত ভদ্রলোকেদের ভাষায় ছোট লোক ছোট জাত। এই দেশে একমাত্র তারাই শ্রমজীবী, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পেটের ভাত জোগাড় করে, শোষিত বঞ্চিত অত্যাচারিত হয়, সব ওই কাওরা বাগদি নমো। তুমি তাদের কথাই লিখেছ। তাই তুমি দলিত লেখকই। কে কী বলছে ওসব ছেড়ে দাও। আমি বলছি তুমি একটা লেখা দেবে। প্রশ্নমালা তৈরি করাই আছে, তুমি খালি উত্তরগুলো লিখবে? এটা আমার দাবি বলো তো দাবি, অনুরোধ বলো তো অনুরোধ।
আমার বাবা লেখাপড়া জানতেন না, তবু প্রচুর জ্ঞান ছিল তার। তিনি একদিন আমাকে বলেছিলেন–“যদি কেউ তোকে আদর করে ডেকে পান্তাভাত খেতে দেয় পরমান্ন মনে করে খাবি। আর যদি অনাদরে ডেকে পরমান্নও খেতে দেয়, ফেলে চলে যাস। অনাদরের পরমান্নের চেয়ে আদরের পান্তা হাজার গুণে ভালো। অনাদরের অমৃতও পাকস্থলিতে গিয়ে বিষের ক্রিয়া করে।”
কী আমার ভাগ্য। আজ সেই অনাদরের অন্ন, অপমানের অন্ন রোজ খেতে হচ্ছে আমাকে। ছেড়ে ছুঁড়ে যে বেরিয়ে আসব, তা পারছি না ছেলে মেয়ের ভবিষ্যতের কারণে। রবি শ্রীবাস্তবের দেওয়া চাকরি ছেড়ে এসে যে বিপদে পড়েছিলাম সে অনুভূতিটাও ভুলতে পারিনি।
ওই পত্রিকার জন্য একটা লেখা দিতে হবে, লিখতে হবে নিজের কথা নিজের কলমে।
এটা আমার জীবনের সেই সময়–এই রকম এক একটা সময় হয়ত সব মানুষের জীবনেই আসে–যখন মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির উপর চেপে বসে পড়ে দুঃসহ অন্ধ ক্রোধ, যখন তার নিজের উপর আর নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তখন সে যা করে বসে সেটা আত্মহত্যারই নামান্তর।
আমি এখন যেখানে কাজ করি কর্মস্থলের অমানবিক পরিবেশ আমাকে এমন তিক্ত ক্ষিপ্ত উত্যক্ত করে তুলেছে যে মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে আমার। বলার সময় ঠিক করতে পারি না কতটুকু বলা উচিত আর কতটুকু অনুচিত।
আর লেখার বেলা? আমি আমার সরল অংকের হিসাবে দেখি, যারা আজ আমার জীবনটা যন্ত্রণায় ভরে দিচ্ছে তারা সব সিপিএম প্রশ্রয়পুষ্ট। এর একটাই অর্থ সিপিএম একটি বিষবৃক্ষ। যার ডালপালা ফুল ফল এই কারণে এমন বিষাক্ত।
এরা একদিন বলেছিল লাঙল যার জমি তার। আর ক্ষমতা হাতে পেয়ে এরাই সেই মানুষগুলোকে মেরে ফেলেছিল যারা জোতদারের জমি, গোলার ধানের দখল নিয়েছিল। সেই সময়ের কথা লিখতে গিয়ে আমি লিখে বসি “ সেটা সেই সময় যখন নকশালবাড়ি জ্বলছে। পল্লী কবি গান বাঁধছে–তরাই জ্বলছে রে, জ্বলছে আমার হিয়া, নকশাল বাড়ির মাঠ জ্বলে, সপ্তকন্যার লাইগা। এই সাতকন্যা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়েছিল তাদের রাইফেলে, যারা একদিন গলার শিরা ফুলিয়ে শ্রমিক কৃষকদের পক্ষে শ্লোগান দিতো। সিংহাসনের কি অপূর্ব মহিমা। যে বসে সেই নবরক্ত পিপাসু হয়ে যায়।”
আমার জীবনের একটা বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে দেশভাগ, রিফিউজি ক্যাম্প, দণ্ডকারণ্য মরিচঝাঁপি। রিফিউজি এবংকমিউনিস্ট আন্দোলন প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে আমি লিখে বসি–“সেই সময় কিছু লোক লাল পতাকা নিয়ে রিফিউজিদের পাশে দাঁড়িয়ে কিছু আন্দোলন আন্দোলন খেলা খেলেছিল। তবে সে খেলা যে নিছক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য, তা তখন বোঝা যায়নি। বোঝা গেল অনেক বছর পর, যখন তারা মসনদে আসীন হতে পেরেছেন। (তখন) যে নারকীয় তাণ্ডব তারা মরিচ ঝাপির দীন দুর্বল মানুষগুলোর উপর চালিয়েছে, তা নাৎসি বাহিনীর ইহুদি নিধনকেও হার মানিয়ে দেয়। ফ্যাসিস্ট আর কমিউনিস্ট এক্ষেত্রে এক কী করে হয় কে জানে।”
