সুযোগ পেলেন তখন যখন আমি আমার খইনি সহ ডান হাতখানা ওনার দিকে এগিয়ে দিলাম–নিন। চরম বিরক্তিতে বলে উঠলেন তিনি, এইভাবে দেয় নাকি। আমি অবাক। বুঝতে পারি না কোথায় ভুল। বলি, কোনভাবে দেয়! উনি নিজের ডান হাতের কনুইয়ে বাঁ হাত ঠেকালেন।তর্পণের ভঙ্গিতে হাতটা সামনে এগিয়ে দেখালেন, এইভাবে সম্মানীয় মানুষকে দিতে হয়।
এইভাবে যে অনেকে দেয় সেটা জানি। আর এ-ও জানি যে এটা হচ্ছে পুরাতন ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতি। আভূমি প্রণত প্রণাম। প্রণাম করে পায়ের ধুলো মাথায় জিভে দেওয়া, পাদোদক পান এই সবই একদল বৰ্বর পুরোহিত শ্রেণী, অন্য এক শ্রেণির মানুষকে হেয় হীন নীচ বানাবার বদ উদ্দেশ্যে প্রচলন করেছিল। সে সব তো এখন এক অন্ধকার যুগের অতীত অধ্যায়। শিক্ষা দীক্ষায় মানুষ তো অনেক এগিয়ে গেছে। সচেতন মানুষের কাছে এই প্রথা অচল।
তাছাড়া যারা বামপন্থী সেই কবে কতকাল আগে তারা আমাকে বলেছিল–সব মানুষ সমান, সব মানুষ সমান সম্মানীয়। তাহলে আজ উল্টো কথা বলে কেন? আমার কাছে আজ যে সম্মান দাবি করছে, যেভাবে খইনি দিতে বলছে, উনি আমাকে কী সেই ভাবে দেবেন? কেন দেবেন না? উনি মন্ত্রী হলে আমিও তো লেখক। লেখা একটা শিল্প, লেখক একজন শিল্পী, লেখা একটা সৃষ্টি লেখক একজন স্রষ্টা।
হতে পারে উনি আমাকে একটা চাকরি দিয়েছেন, চাকরির আর একনাম সেবা। আমি জনগণের একজন। জনগণ ওনাকেও ভোট দিয়েছে। উনি জনগণকে সেবা করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সেবক।
এই সব ভাবনা তখন মুহূর্তের মধ্যে তরঙ্গের মতো মনের তটে আছড়ে পড়েছিল। তখন আমার মনে হয়েছিল, আমার সামনে যে বসে আছে, যে কমিউনিস্ট নয়, একজন কুলিন ব্রাহ্মণ। মার্কসবাদীও নয়, বিশাল পুঁজির মালিক, তাই মার্কসবাদ পুঁজির মালিককে যা বলেছে, উনি সেটাই।
আমি একজন দলিত, আমি একজন শ্রমিক। পুরোহিত তন্ত্র এবং পুঁজিবাদের পক্ষে মানুষদের সাথেই আমাদের লড়াই। এ লড়াই চলছে চলবে।
তখন বলে বসি আমি, আপনি তো কমিউনিস্ট পার্টি করেন, আমি ভেবে ছিলাম, হয়ত এই সংস্কৃতির পক্ষে নন।
আমার কথায় বড় সাহেব খুশি হননি। খসখসে গলায় বলেন তিনি, খইনিটা একটা কাগজে মুড়ে টেবিলে রেখে দাও।
একটু পরে জানতে চান তিনি, এখানে কেন এসেছ। কী দরকার?
বলি–দত্তদা পাঠিয়েছেন। উনি বললেন যে আপনার জীবনী লিখতে হবে। আমি তো আপনার জীবনের বিশেষ কিছু জানি না। যদি আপনি বলতে থাকেন, আমি লিখে নেব। উনি আমার কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। শেষে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি এখন এখানে বসে আছে, রান্না কে করছে? বাচ্চারা কী খাবে?
বলি–এখন তো পূজার ছুটি পড়ে গেছে। বাচ্চারা বাড়ি চলে গেছে।
অন্য যারা, তারা কী খায়?
তারা নিজেরা রান্না করে নেয়।
তাহলে তোমার আর রান্না করতে হচ্ছে না?
না।
কতদিন ছুটি?
আছে। এখনো দিন পনের আছে।
এবার মোড়ক খুলে খানিকটা খইনিমুখে দিয়ে চোখ বুজে কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন কাল থেকে ডিউটিতে আসবে। বাচ্চাদের খেলার মাঠটায় এই বর্ষায় প্রচুর দুব্বো ঘাস গজিয়ে গেছে। ওগুলো সব সাফ করবে। পনের দিনে মাঠ যেন পরিষ্কার হয়ে যায়।
হায় আমার কপাল। আমি বড় সাহেবের বাড়ি এসেছিলাম এক লেখকের অহং নিয়ে। ফিরে যাচ্ছি ঘাস ছেঁড়ার আদেশ পেয়ে। আমার মতো লেখকের এক ভোট ব্যবসায়ীর কাছে কানা কড়ি মূল্য নেই। ওনার কাছে মুল্যবান তারাই যারা ভোটের বাকসো ভরাতে জানে।
এখন সারা স্কুলের সবাই ছুটি ভোগ করবে। আর একা আমি দুব্বোঘাস ছিঁড়ব।
.
আমি বড় সাহেবের বাড়ি গিয়েছিলাম। কেন গিয়েছিলাম? কারো নামে কিছু চুকলি করতে? বাবুকে পটিয়ে কোনো কাজ বাগাতে? নানা রকম শঙ্কা দেখা দিয়েছে আমার ওই যাওয়া নিয়ে। বড় সাহেবের অনেকগুলো গাড়ি। এগুলো নানা জায়গায় ভাড়া খাটে। একটা দুটো বাবুকে বহন করে। গাড়ি অনেক কিন্তু গ্যারাজ তো অনেক নেই। সব রাখা হয় এই স্কুলে। এক ড্রাইভার আমাকে ওখানে দেখেছিল। সে এসে বলেছে এখানে। আর তাই জল্পনা সন্দেহ শঙ্কার ঝড়।
শুধু একা আমারই নয়, সারা স্কুলেরই এখন চলছে অবিশ্বাস সন্দেহ আর আক্রমণ। কারো সাথে কারো কোনো মিল মিশ নেই। সবারই ধারণা যে আমার সাথে সামনে হেসে কথা বলছে পিছনে সেই আমাকে মারবার জন্য চাকু শান দিচ্ছে। আর এটা এই সময় সিপিএম পার্টির মধ্যেও হচ্ছে। যেখানে সেখানে দশজন সিপিএম কর্মী একত্র হচ্ছে সেখানেই হচ্ছে।
যে যাদবপুর কেন্দ্রে এখন সাংসদ সুজন চক্রবর্তী, তাকে যারা জিতেয়েছে, এই যাদবপুরের সেই পার্টি কর্মীরা আগের ভোটে বড় সাহেবকে হারিয়ে দিয়েছে। যে ভীষণ হৃদয় বিল্টুদারক ঘটনার মুখোমুখি বড় সাহেব হয়েছিলেন, ২০১১তে সব সিপিএম নেতা হবেন। তাদের খেয়ে তাদের অতি বিশ্বস্ত লোকজন দলে দলে চুপচাপ জোড়া ফুলে ছাপ দিয়ে দেবে। মহাশক্তিশালী রোম সাম্রাজ্য যেভাবে তাদের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল বামফ্রন্টও মুখ থুবড়ে পড়বে।
এই সময় বধির স্কুলে একটা পরিবর্তন হয়ে গেল। চারতলা থেকে রান্না ঘর দক্ষিণ প্রান্তে এক নব নির্মিত ভবনের নীচের তলায় নেমে এল। এটা বেশ বড়সড় জায়গা। জায়গাও বেশ ভালো। এই ভবনের নির্মাণের ইট বালি রড সিমেন্ট দরজা জানলা চেয়ার টেবিল পাখা লাইট নানাবিধ দ্রব্যের কেনাকাটা নিয়ে স্কুলের প্রভাবশালী লোকেদের মধ্যে যে ক্ষোভ ক্রোধ তার কিছু কিছু আমার কানেও এল। বড় সাহেবের এক বিশেষ স্নেহধন্য যে আবার ‘ডানহাত’ ইট বালি-র ব্যাপারটা সে দেখা শোনা করে। চেয়ার টেবিল জানালা দরজা কেরানি রায়। হোস্টেলের চাল ডাল তেল নুন সুপার আর ওয়ার্ডেন। টিচার ইনচার্জ কিছু কেনা বেচা করেন না,শুধু চেকে সই করেন। সবাই এই পাঁচজনকে বলে পঞ্চ পাণ্ডব। অন্যদের কার কী হয়েছে তা জানিনা টিচার ইনচার্জ নতুন গাড়ি কিনেছেন। বেশ বড় গাড়ি।
