সব বলবে। পারবে সব বলতে?
বাংলা সাহিত্যে প্রচুর জীবনী লেখা হয়েছে। জীবন নির্ভর সেই সব আখ্যানে পথ নির্দেশ, অনুপ্রেরণা, সাহিত্য রস, সব কিছু পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান। তাই তা শুধু মাত্র একজনের জীবন কাহিনি না হয়ে হয়ে গেছে সময়ের দলিল। ইতিহাসের অঙ্গ।
সাধারণতঃ যার জীবনী লেখা হয়ে থাকে, যে তা লেখে, তার থাকে সামাজিক দায়বদ্ধতার সাথে উক্ত ব্যক্তির প্রতি এক ধরনের গভীর শ্রদ্ধাবোধ। সেই শ্রদ্ধা ভক্তি ভালোবাসার প্রকাশ ভঙ্গি পরিমিতি বোধের সীমা অতিক্রম করে গেলে হয়ে দাঁড়ায় ব্যক্তি পূজা, নির্লজ্জ চটুকারিতা। ওটা যেমন অতি মাত্রায় থাকাটা খুব খারাপ, একেবারে না থাকা আরো খারাপ। যার নেই সে লিখতে পারবে না। জোর করে যদি লেখে দায়সারা সে কর্মে কোনো প্রাণ থাকবে না।
অক্ষরের, শব্দের, বাক্যের, এমনকী দাড়ি, কমা তারও প্রাণ হয়। অনেক বলা কথার মধ্যে লুকানো থাকে অনেক না বলা কথা। অনেক না বলা কথার মধ্যে প্রকাশ করা যায় বহু বার বলা সংলাপ। এই কলায় সবাই নয়, কেউ কেউ সিদ্ধহস্ত।
এখন আমি মনের মধ্যে ডুবুরি নামিয়ে আঁতিপাঁতি অনুসন্ধান করি সেই শ্রদ্ধা ভক্তি ভালোবাসা। সন্ধান মেলে না, যা দিয়ে নিষ্প্রাণ বর্ণমালাকে জীবন্ত করা যায়। বরং উল্টে মনের মধ্যে চাপা বিবমিষা জাগে এমন একটা, যা শ্রদ্ধা ভক্তি ভালোবাসার বিপ্রতীপ মেরুর।
ওই লোকটার মধ্যে একজন কৌশলী আগ্রাসক, আক্রমণ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছাড়া আর কোনো মানবিক গুণ চোখে পড়ে না। এই লোকটা যে একদিন তোর বাবার মৃতদেহ দাহ করে কালীঘাট শ্মশান থেকে হেঁটে বাড়ি এসেছিল, বাস ভাড়া ছিল না বলে। সে আজ হাতে লাল ঝাণ্ডা নিয়ে মুখে শ্রমিক কৃষকের কথা বলে চল্লিশ পঞ্চাশ বছরে কত হাজার কোটি টাকার সম্পদ জমা করে ফেলেছে, সেটা একটা বিস্ময়।
তবু না বলতে পারি না। চটাতে চাইনা দত্তকে। ইদানিং স্কুলে আমাকে চটিয়ে দেবার একটা চক্রান্ত চলছে। একদিন কানমলে দিয়েছে আমার ওয়ার্ডেন। কী! না, ইয়ার্কি! একদিন গেটে দাঁড় করিয়ে ব্যাগ পকেট চেক করেছে আমার। এটাও ইয়ার্কি। এই সব ইয়ার্কি দিয়ে সে আমার ধৈৰ্য্যচুতি ঘটাতে চায়। যাতে রেগে গিয়ে আমি এমন একটা কিছু করে বসি, যা শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে সাজার যোগ্য। টিচার ইনচার্জ তো কাগজ কলম নিয়ে বসে আছে সুযোগ পেলেই চিঠি ধরাবে। শোকজ।
এই অবস্থায় আবার যদি দত্ত রেগে যায়, আমি যাব কোন চুলোয়।
লোকে বলে পৃথিবীটা নাকি স্বার্থপরে ছেয়ে গেছে। তাহলে এই যে দত্ত এখন বড় সাহেবের জীবনী লেখাবার জন্য এত উদগ্রীব এর পিছনে তার কী স্বার্থ? তার স্বার্থ একেবারে নির্মল এবং পবিত্র। যা সেই রামচন্দ্রের সেতু বন্ধনে কাঠ বেড়ালির মত তুচ্ছ, নগণ্য। কিন্তু সেটা অনেক বড় বড় ব্যাপারের চেয়েও মহিমাময়। দত্ত আমাকে দিয়ে লেখাবেন সেই পলাতক পর্বের কথা। পুলিশের তাড়া খেয়ে বনে বন্দরে পালাতে পালাতে দত্ত বড় সাহেবের জন্য কত কষ্ট করেছেন। দু টাকার ছাতু কিনে ভাগ করেছেন দুজনে। বড় সাহেব এখন এত উচ্চে উঠে গেছেন যেখান থেকে মানুষ তো ছাড় শহিদমিনারকেও গরু বাধার খোটার মতো ছোট দেখায়। এই সময় তাকে মনে করিয়ে দেবেন~ দেশ শুদ্ধ মানুষকে জানিয়ে দেবেন–”যখন তোমার কেউ ছিল না, তখন ছিলাম আমি। এখন তোমার সব হয়েছে পর হয়েছি আমি।” না পর হয়েছি লেখাটা খারাপ, লিখবে হবে পর কোরো না। সেই পুরাতন দিনের কথা মনে রেখো। তোমার একফেঁটা স্নেহ যদি আমার উপর ঝরে পড়ে, যা পড়া উচিতও, সাত পুরুষ পায়ের উপর পা দিয়ে জীবন চলে যাবে।
একদিন গেলাম বড় সাহেবের বাড়ি। এ বড় কঠিন সময়, এই সময় সিপিএম পার্টির সব বড় বড় নেতাকে দেশের মাথা গরম গরিব-গুরবো মানুষের ভয়ে পুলিশের আশ্রয়ে থাকতে হচ্ছে। বড় সাহেবের বাড়ির সামনে পুলিশ ক্যাম্প। বন্দুকধারী পুলিশ আমাকে আটকাল। অনেক রকম প্রশ্নের পর যখন তারা বুঝল আমার কোনো খুনোখুনি করার মতলব নেই, তখন তারা বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি দিল।
বেশ বড় বেশ সুন্দর বহু অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই বাড়ি। যা যা না থাকলে জীবন অপূর্ণ মনে হয়, সব কিছু আছে এই বাড়িতে। আমি গিয়ে বসা মাত্র এককাপ চা এসে গেল। চা খেলে মুখটা কেমন টক হয়ে যায় আমার। তখন একটু খইনি লাগে। নিজের অভিজ্ঞতায় জানি, যারা খইনিখোর চায়ের পরে সবার মুখ টক হয়। বড় সাহেবও খইনিখোর। বধির স্কুলে গেলে চায়ের পর অনেকদিন আমার কাছ থেকে খইনি চেয়ে খেয়েছেন। উনি নিজে চাননি, কাউকে পাঠিয়ে আনিয়েছেন।
এখন উনিও চা খেয়েছেন। ধরে নিই ওনার মুখও টক হয়েছে। তাই দুজনার মতো খইনি ডলা শুরু করে দেই। সামনেই ডলি ওনার। আমার মনেই হয় না এতে ওনার সম্মানহানি হচ্ছে। সেই সত্তর দশক থেকে বামপন্থী নেতা-কর্মীদের সাথে মিশি। তারা আমাদের কাছ থেকে বিড়ি চেয়ে নিতেন। আমরা তাদের সামনেই বিড়ি খেতাম। এত তুচ্ছ কারণে তাদের সম্মান যেত না।
একবার মহাশ্বেতা দেবীর সাথে পুরুলিয়ায় লোথা উৎসবে যাচ্ছিলাম। ট্রেনে ওনার সামনে ওনার ছেলে বাপ্পাদাও সিগারেট টানছিল, আমিও বিড়ি ফুঁকছিলাম। যারা আমার শঙ্কর গুহ নিয়োগী বিষয়ক লেখাটা প্রতিক্ষণে পড়েছেন, সবাই জানেন, প্রথম সাক্ষাতে আমি ওনাকে বিড়ি দিয়েছিলাম, উনি দিয়েছিলেন দেশলাই। আর যেদিন নাগপুর থেকে রায়পুর পর্যন্ত স্বামী অগ্নিবেশজির সাথে মোটরকারে যাত্রা করেছিলাম, সেদিনও সারা পথে বিড়ি ফুঁকেছিলাম সম্মানে বড় সাহেব এনাদের চেয়ে কোনোভাবে বড় নন। তবে খইনি ডলতে বাধা কোথায়? বাধা আছে, কারণ সময় যে বদলে গেছে। এখন আর বড় সাহেব সেই আগের মানুষ নেই, জীবনে প্রথমবার এম.এল.এ. ভোটে জিতে মন্ত্রী হয়ে গেছেন। তাই আমার খইনি ডলায় বিরক্ত হচ্ছিলেন তিনি। রাগে ফুঁসছিলেন। একটা কিছু বলবার সুযোগ খুঁজছিলেন।
