বধির স্কুলের মাননীয় সভাপতি মনে মনে স্বীকার করেন অন্য যে কোন স্কুল থেকে তার প্রতিষ্ঠ করা এই স্কুলের বিরাট প্রভেদ আছে। এখানকার শিক্ষার মান-পরিবেশ এত উন্নত যে একজন তুচ্ছ রাধুনি সেও লেখক হয়ে যায়। যদি রাধুনি গল্প লেখে বুঝে দেখুন মাস্টাররা তাহলে কী?
আজকাল স্কুলে কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি এলে অবশ্যই একবার রান্নাঘর থেকে ডেকে তাদের সামনে আমাকে নিয়ে দাঁড় করান। রবীন দেব, মীরা ভট্টাচার্য, আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়, আজিজুল হক এমনি বহু জনের সামনে গিয়ে দাঁড়াই আমি। তাদের দেখান বড় সাহেব–এই যে। আমাদের এখানে রান্না করে। বই লেখে। কই রে তোর একটা বই দে ওনাকে। পড়ে দেখবেন কী লেখার হাত। জানেন ও আমার কাছে এল। বলল লেখে। কী করব দিলাম একটা কাজ। বললাম-লেখ, মানুষের কথা লেখ। লিখছে, মানুষের কথাই লিখছে।
মানুষ বড়লোক হয়ে গেলে তখন তাদের বিচিত্র সব শখ চাগাড় দেয়। কেউ দামি কুকুর পোশে, বাঘ পোষে, কেউ কেউ এ্যাকোরিয়ামে মাছ পোষে। বড় সাহেবের ধারণায় উনি ওনার খাঁচায় পুরে একটা আস্ত লেখক পুষছেন! সেই আনন্দ–যে আনন্দ নিয়ে বাবা মা বাচ্চাকে চিড়িয়াখানা দেখায়–উনি অতিথি অভ্যাগতদের একটা জ্যান্ত লেখক দেখান। দেখুন দেখুন কেমন পোষ মেনে গেছে।
প্রায় কুড়ি পঁচিশ জনকে এভাবে দর্শন এবং একটা করে দুই দান করে করে মনটা বিষিয়ে ওঠে আমার। এক একখান বই ছাপানোর খরচ পড়ে গেছে প্রায় চল্লিশ টাকা। এতে বড় সাহেবের লাভ হতে পারে কিন্তু আমার কী লাভ? মন্ত্রী এম.এল.এ জেলাশাসক স্কুল থেকে বেরিয়ে গিয়ে আর কেউ আমার কথা মনে রাখে না। বইটা হয়ত ফেলে দেয় বাজে কাগজের ঝুড়িতে। ফলে বই বিলোনোয় অনীহা আসে আমার। আগে মনে আশা জাগত হয়ত এরা আমার বই পড়ে, আমার বিষয়ে একটু ভাববে। তার ফলে জীবনে একটা পরিবর্তন আসবে। কষ্টকর কাজ থেকে মুক্তি পেয়ে একটু বেশি লেখার সুযোগ পাবো। কিন্তু কোথায় কী! যথা পূর্বং তথা পরং।
যে মেয়েকে বারবার পাত্রপক্ষের সামনে সেজে গুঁজে গিয়ে দাঁড়াতে হয়, কিন্তু বিয়ে হয় না, তার যেমন শেষ পর্যন্ত আর সাজার ইচ্ছা থাকে না, প্রশ্নের জবাবও হেলাফেলায় দেয়, আমি এখন তাই করি।
এই যে ও এখানে রান্না করে। কিন্তু বই লেখে। এই তোর একখানা বই নিয়ে আয় তো।
মাথা নেড়ে জানিয়ে দিই আমি, আর বই নেই।
বড় সাহেব বোকা নন। বোকা হলে এত লোককে হারিয়ে মাড়িয়ে ছাড়িয়ে এত উঁচুতে উঠতে পারতেন না। যে উচ্চতা থেকে হাত বাড়িয়ে আকাশ ছোঁয়া যায়।
উনি আমাকে দেখাচ্ছিলেন। একটা অহংবোধ তৃপ্ত হচ্ছিল। এই যে দেখো কোনো হোস্টেলে এমন রাধুনি পাবে না যে গল্প লেখে। কিন্তু এখন লোক দেখানোর মধ্যে সে আনন্দ নেই। প্রমাণ কই? লেখক বললেই তো লোকে বিশ্বাস করবে না। বই দেখাতে হবে। বই যে আর নেই।
তাই আমাকে দেখানোর উৎসাহটাই মরে গেল তার।
.
অনেকদিন দত্তদার সাথে আমার দেখা হয়নি তিনি খবর পাঠিয়েছেন খুব দরকার একবার আমার বাড়ি আয়, তাই গেলাম দেখা করতে। অজন্তা রোডে তার বাড়ি, আগেও বেশ কবার গেছি, আজ সে বাড়িতে গিয়ে যেন একটু বাড়তি আদর পেলাম। বউদি নারকেল নাড়ু আর ফ্রিজের জল এনে দিলেন। বলেন তোমাকে টিভিতে দেখেছি। তারপর পাশের ঘর থেকে মেয়েকে ডাকেন–আয় বৌ দেখে যা কে এসেছে।
মেয়ে এসে আমাকে দেখে আহ্লাদে গলে যায়-মদনকাকু। কখন এলে? আগে আমাদের বাড়ি কতো আসতে। টিভিতে দেখাবার পর মোটে আসো না। আমরা সব সময় তোমার কতো কথা বলি।
সেই কথাটা বল! মা তাগাদা দেয়।
কোন কথাটা।
আরে সেই টিভির কথা।
ওঃ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। একটু থেমে বলে মৌ–মদন কাকু, কতোক্ষণ ধরে টিভিতে কতো কথা বললে, একবার বাবুর নামটা বললে কী হতো। যদি বলতে বাবু তোমাকে চাকরি করে দিয়েছে, ওরা নিশ্চয় ফটোটটো নিয়ে যেত। কী ভালো হতো! কেন বললে না?
মুখ দেখে মনে হয় মৌ-এর মুখ থেকে দত্তদা-ই এসব কথা বলাচ্ছে। কিন্তু এখন এই কথার আমি কোনো জবাব দিতে পারি না।
কিছুক্ষণ পরে বলে দত্তদা–আমি একটা কাজের কথা ভাবছি। খুব বড় একটা কাজ। সেটা তুইই করতে পারবি, আর কেউ পারবে না। ওটা করলে বড় সাহেবের চোখে তোর গুরুত্ব বেড়ে যাবে, আমারও তাই হলেনিয়ার এর তাই হবে।
কী কাজ?
তোর জীবনী লিখতে হবে।
আমার জীবনী। জীবনই নেই আমার।
তোর না, তোর লিখতে হবে, বড় সাহেবের জীবনী।
উনি বলেছেন। মানে আমাকে দিয়ে ওনার জীবনী লেখাবেন, এই কথা কী উনি আপনাকে বলেছেন?
উনি বলেননি। আমি বলছি।
কী করে লিখব। আমি কী ওনার জীবনের কথা জানি নাকি?
কিছুটা আমি তোকে বলে দিতে পারব। সেই জরুরি অবস্থায় এলাকা ছেড়ে পালিয়ে ওনার সাথে অনেকদিন ছিলাম তো, তখন উনি বলেছেন। বাকিটা তোর জেনে নিতে হবে।
কার কাছ থেকে জানবো?
আর কারো কাছ থেকে নয়, সরাসরি বড় সাহেবের মুখ থেকে। তোকে তো চেনে। জানে তো তুই লিখিস। ওনার বাড়ি গিয়ে বুঝিয়ে বলবি যে, আমার এবং দত্তদার দুজনের খুব ইচ্ছা যে আপনার জীবনী লেখা হোক। পারবি তো বলতে? কী বলবি? দত্তদা এবং আমার ইচ্ছা আপনার জীবনী ছাপা হোক। কত আন্দোলন কত লড়াই করেছেন, তবেই আজ বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এসেছে। এখনকার মানুষ সে সব তো জানে না। সেই ইতিহাস মানুষকে জানানো দরকার। তাই আমার আর দত্তদার ইচ্ছা যেভাবে বলছি সে ভাবে বলবি–দত্তদা এবং আমার ইচ্ছা। তুই খালি কথাটা পেড়ে রেখে আয়, পরে আমি গিয়ে বাকি কথা বলে নেব। দেখবি তখন নিজের কথা নিজের মুখে সব বলবে।
