এত কাজ পারা যায় না। একদিন বলি টিচার ইনচার্জকে খাবার লোক এত বেড়ে গেছে এবার এক দুজন কাজের লোক বাড়ান।
লোক কোথায়! লোক নেই। সরকার আর তোক দেবে না।
বলি–তাহলে যাদের সরকার দিয়েছে, কিন্তু কোনো কাজ নেই, বসে থাকে তাদের পাঠান না।
কে, কে বসে থাকে, নাম বলুন।
বসে তো অনেকেই থাকে। যেমন আদুরি গোঁসাই।
আদুরিদি বসে থাকে। কিছু করে না?
করে! ওই দুপুরে একটু চা, বিকালে বাচ্চাদের মেপে এক কৌটো মুড়ি। বাকি সময় ঘুম, টিভি।
সব নাম বাদ দিয়ে একা তার নাম কেন।
অন্যরা তো পুরুষ। তারা রান্নার কাজ পারবে কী পারবে না সেই ভেবে বলিনি। উনি তো মেয়েছেলে। দুটো রুটি বেলে দিলে দুটো আলু কেটে দিলে আমাদের চাপটা একটু কমে।
আচ্ছা যান, আমি দেখছি।
দেখলেন টিচার ইনচার্জ। স্কুল ছুটির পর বাড়ি যাবার আগে দারোয়ানের কাছে একটা চিঠি রেখে গেলেন আমার নামে। এবার থেকে বিকালের টিফিন সেটাও আমাদের দায়িত্ব। আদুরি গোঁসাই দেবে না।
যখন এ কাহিনি লিখছি, রুটিটা বন্ধ হয়েছে। আমাদের জব্দ করার বাসনায় বড়দির ইচ্ছার যুপকাষ্ঠে বোবা বাচ্চারা নিজেদের জব্দ করতে রাজি হয়নি, এক বছর পরে সব রুটি বয়কট করে অনাহারে থাকা শুরু করে দেয়। আর এখন পুনরায় বিকালের টিফিন আদুরির কাঁধে চেপেছে। শুধু দশ কাপ চা বানিয়ে চলে যাওয়া খারাপ দেখায়।
.
এই সময় আমার দ্বারা একটা খুব খারাপ কাজ হয়ে গেল। যে খারাপ কাজ সেই খাস খবরের বেলা হয়েছিল। কত কথা বলেছি, কিন্তু একবারও বড় সাহেব বা বোবা স্কুলের নাম সকৃতজ্ঞতার সাথে মুখে আনিনি।
একদিন স্থানীয় এক কেবল টিভি আমাকে নিয়ে একটা আধাঘন্টার প্রোগ্রাম করতে সদলবলে এসে পড়ল স্কুলে। তাদের দেখে তাদের বদ উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে টিচার ইনচার্জ গর্জালেন, একে নিয়ে যা করতে চান করুন, কিন্তু রান্না ঘরে ঢুকবেন না। কোনো ছবি টবি তুলবেন না। বড়দির মুখ চোখ ভাষা বর্ষণ সব দেখে টিভি চ্যানেলের লোকেরা বুঝে ফেলেছেন এরা আমার উপর অসন্তুষ্ট। বলেন টিভি চ্যানেলের দলপতি–দ্যাটস অল। চলুন আপনার বাসায় যাই।
ক্যামেরা চালু হতেই প্রথম প্রশ্ন, কেন লেখেন।
আমার জবাব না লিখে পারি না। যেমন শ্বাস না নিয়ে পারি না।
কী লেখেন? গল্প কবিতা উপন্যাস?
জীবন লিখি। আমার লেখার প্রতিপাদ্য হার-না-মানা মানুষ।
মানুষ ছাড়া আর কিছু নিয়ে লেখেন না? যেমন ফুল, পাখি, পাহাড়, নদী?
না, শুধু মানুষ। একমাত্র মানুষ। আমার প্রথম এবং শেষ প্রণামের কেন্দ্রে আছে মানুষ। প্রতিবাদী, প্রতিরোধী মানুষ।
সুকান্ত স্যাটেলাইট নামের সেই কেবল চ্যানেলের লাখখানেক উপভোক্তা আছে যাদবপুর অঞ্চলে। যেদিন এই প্রোগ্রাম টেলিকাস্ট হল, যারা যাদবপুরে থাকে তারাই তা দেখতে পেল। বড়দি, রায়দা এরা দেখেননি। ওয়ার্ডেন সহ এক দুজন তাই পরের দিন ছুটে গেল টিচার ইনচার্জের কাছে, দেখেছেন বড়দি কী বেইমান। আধঘন্টার মধ্যে একবারও বড় সাহেব, আপনি, স্কুলের নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করল না।
আমি বুঝতে পারি সমস্ত পরিবেশ আমার বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। স্কুলের কেউ আর আমার সাথে ভালোভাবে কথা বলে না। কিছু জানতে চাইলে বাঁকা উত্তর দেয়। টিটকারি মারে। তারা বুঝে গেছে এসব করলে বড়দি, সুপার, ওয়ার্ডেন এরা খুশি হয়। ক্ষমতাবানদের খুশি রাখলে পরে সুফল মেলে।
কিন্তু আমি যে অক্ষম। কী করতে পারি। আমি সেই কাক-কবে কতদিন আগে একটা কাক তার ডানায় খুঁজে নিয়েছিল একটা ময়ূর পালক। দিনে দিনে সে পালক প্রবেশ করে গেছে অস্থি মজ্জায়। আর মনে হয় না, পালকটা আমার নয়। লোকে হাসছে, লোকে রেগে যাচ্ছে। কিন্তু অস্থি মজ্জা ভেদ করে সে পালক এখন প্রবেশ করে গেছে হৃদয়ের গভীরে। তাকে কাটতে গেলে লাগে, ছিঁড়তে গেলে লাগে। রক্তপাত হয়।
জীবনের এক ব্যর্থ বঞ্চিত মানুষ আমি, যাকে ধরে বেড়ে ওঠা যায় হাতের কাছে তেমন কিছুই তো ছিল না। সময় আমার হাতে ধরিয়ে দিয়েছে অতি সস্তা কলম। তাকেই অকুল দরিয়ায় ছোট্ট ডিঙি নৌকার মতো, অন্ধকার রাতের প্রদীপের মতো, অন্ধ মানুষের ষষ্টির মতো আঁকড়ে ধরে রাখতে চাই। জিজীবিষা শব্দের সঠিক অর্থ অনুধাবন করতে চাই। হাতের কলমটা যদি না থাকে, আমার থাকা আর না থাকা সমান। যেদিন আর লিখতে পারব না যে ভীষণ মানসিক মৃত্যু হবে, তার আগে আত্মহত্যা করে নেব।
এই সময় এই প্রতিকূল সময় আমার হাত চেপে ধরেছে। আর লিখতে দেবে না। চারপাশে ষড়যন্ত্র দেওয়াল তুলেছে কলম কেড়ে নেবে। মহা ভারতের কালে একলব্যের আঙুল কেটে নেওয়া হয়েছিল। আধুনিককালে এভোয়ার (মহাশ্বেতা দেবীর গল্প) ওই দশা হয়েছে। আমি কী করব। কীভাবে বাঁচব?
কেউ যদি কারো নাক মুখ সমস্ত শক্তি দিয়ে চেপে ধরে, মেরে ফেলতে চায় তখন কে কী করে? চেপে ধরা হাতের ফাঁক থেকে প্রাণপণে শ্বাস টেনে বেঁচে থাকতে চায়। বাতাস কী আসে? আসে না। তবু সে সমস্ত ইচ্ছাশক্তি একত্র করে শ্বাস টানে। যদি আর এক দু-সেকেণ্ড বেঁচে থাকা যায়। অনন্তকালের কাছ থেকে কেড়ে নিতে চায় মাত্র এক দু সেকেণ্ড।
আমার এই লেখালেখি এতো কোনো সময় কাটানোর উপকরণ নয়। কোনদিনই তা ছিল না। এটা আমার কাছে বেঁচে থাকার অবলম্বন; জিজীবিষা। এটা আমার কাছে সমাজ বদলের হাতিয়ার, শোষণ বঞ্চনা অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে একটা দ্রোহ। কে যেন বলেছেন সত্যের জন্য সব কিছু ত্যাগ করা যায়। কিন্তু কোন কিছুর জন্য সত্যকে ত্যাগ করা যায় না। আমার কাছে লেখাটাই সত্য লেখাটাই শিব এবং সুন্দর। কোনো কিছুর জন্য একে ত্যাগ করা যাবে না।
