এখন আমি কবিতার কী করি? এ এমন এক লেখা যা কেউ মারা গেলে, চির বিদায় নিয়ে চলে গেলে তবেই তাকে উৎসর্গ করা যাবে। কোনো জীবিতের কাজে লাগবে না। আজ বিপদতারণ হয়ে আমার হাতে উঠে এল সেই বৃক্ষ জীবন।
বৃক্ষ জীবন
সমাগত হয়ে এল বিল্টুদায়ের বেলা।
চলে যায় সেই মহাবৃক্ষ। যার মাথা ছুঁয়েছে আকাশ।
শেকড় চারিয়ে গেছে মাটির গভীরে।
যার ছায়ায় দাঁড়ানো যায় রৌদ্রদগ্ধ শ্রান্ত দুপুরে।
চলে যায়, হায় সবকিছু চলে যায় কাল স্রোতে
রয়ে যায় সময়ের শরীর জুড়ে
স্মৃতি মেদুর যন্ত্রণার দাগ
যদি বলা যেত যেওনা গো। দাঁড়াও
একবার পিছনে তাকাও, দেখো–
তোমার বিচ্ছেদের বেদনায় নীল
শোকাহত ম্লান মুখ, মানুষ, মিছিল
যেওনা গো, ফেরো, ফিরে এসো।
–বলা গেলে বড় ভালো হতো।
হে বৃক্ষ হে মহান মহীরুহ
যাবে বললেই কী যেতে পারা যায়?
মাটির গভীরে ছড়ানো যার অজস্র শেকড়
আদিগন্ত আকাশে অসংখ্য প্রশাখা
নিঃশ্বাস, বিশ্বাস, আনন্দিত আত্মার স্পন্দন
সব কিছু মুছে যাওয়া এত কী সহজ
এত অনায়াস!
নদী যেমন যায় সাগরের দিকে–
শুরুকেও সব বন্ধন ছিঁড়ে ছুঁড়ে
চলে তো যেতেই হয় মহান এক সমাপ্তির কাছে।
আকাশ কালো করে মেঘ হবে না
আমরা ঝর ঝর নামবো না
শ্রাবণের অঝোর ধারায়
বিদায়ের বিষাদক্ষণে
ডাকব না পিছু ফেরার ডাক
সাময়িক শোকাহত স্তব্ধতার পরে
ফের আমরা খুঁজে দেব
মাটি চাপা মনের কন্দরে
আয়ুর্বেদ সঞ্জীবন শেকড়ের ঘ্রাণ
তোমার অমৃত বাণী–
স্নেহের সেই দান।
হে বৃক্ষ, হে প্রাচীন মহাবোধী, মহীরুহ
যাবার আগে–একবার বলে যাও
সেই মন্ত্র সেই ত্যাগ এবং তপস্যা
যা দিয়ে মানুষ–
একমাত্র মানুষই হয়ে যেতে পারে
এক মহা বৃক্ষ।
রাত তখন আটটা বেজে গেছে। দাদার মরদেহ তখনো এসে পৌঁছায়নি। আকাশে মেঘ জমেছে। আর কিছু সময় পরে যে মুষলধারে নামবে তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে কড় কড় বাজ আর বিদ্যুতের ঝলকানিতে। বাতাসের দাপটে আশে পাশের গাছ গাছালি দুলছে। খসে খসে পড়ছে গাছের শুকনো পাতা।
এতরাত অবধি শিক্ষক শিক্ষিকাদের পক্ষে এখানে থাকা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তাদের আবার কালকে ছাত্র পড়াতে আসতে হবে। ছাত্র পড়ানো ঠাণ্ডা মাথার কাজ। মাথা ঠাণ্ডা রাখার জন্য ঘুম অতি জরুরি জিনিস। বিকেল চারটেয় ছুটি হয়ে যায়। তবু বাড়ি গিয়ে ঘুমাতে ঘুমাতে এত রাত হয়ে যায় যে পরের দিন সময় মতো ঘুম ভাঙে না। ফলে প্রায় দিনই স্কুলে আসতে লেট। এখন অধিক রাত করে বাড়ি গেলে কাল আর আসা যাবে কী না বলা বড় শক্ত। যিনি গেছেন তিনি গেছেন। যারা যায়নি তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে। একটা দিন পড়া কামাই হলে তাদের কত ক্ষতি।
তবে একজন মাস্টার আছে। যে মাস্টার হিসাবে যত না সফল তার চেয়ে অনেক বেশি সফল এক ফটোগ্রাফার হিসাবে। টিচার ইনচার্জ তাকে এই বিশেষ গুণটার জন্য খুবই নেক নজরে দেখে থাকেন। সে জানে কোন এ্যাঙ্গেল থেকে ক্যামেরা ক্লিক করলে ছবি ভালো আসে। যখন স্কুলে রাজ্যপাল-মুখ্যমন্ত্রী এসেছিল এমনভাবে ছবি তুলেছে যেন সব ছবিতে বড়দিকে পাওয়া যায়।
এই মাস্টারের আর একটা গুণ সে কবিতা লেখে। তাকে এখন আমার লেখাটা দেখাই। দেখুন তো কেমন হয়েছে। কবিতায় পড়ে বলেন তিনি, কী বলব বলুন দেখি। কলম দিয়ে নয়, এ একেবারে হৃদয় দিয়ে লেখা। শোকে একেবারে ওকে কী বলে অভিভূত হয়ে না গেলে এই মাল বের হতো না। আমি হলফ করে বলতে পারি দাদার প্রতি এমন ইয়ে মানে আকুলতা আর কারো বুকে নেই। মাস্টার যা বলেছে তার বাইরে রয়ে গেল অনেক না বলা কথা। কারণ সে দাদাকে খুব ভালো চেনে।
আমি খানিকটা পরের কথা তাকে বলে ফেলেছি।
লোকে বলে যার একবার নাম ফেটে যায়, পরে তার অনেক কিছু ফাটে। সে ফাটা মোটই সুখকর নয়–কষ্টদায়ক। খাস খবরের কারণে আমার নাম তো খানিকটা ফেটেছে এবার আমার পেছন ফাটার পালা। স্কুলে যারা আমার উপর আগুন হয়ে ছিল তখন তারা যেন আগ্নেয়গিরি হয়ে উঠেছে। দেখো কাণ্ডখানা, এসেছে রান্না করতে, এখন বই লেখা ধরেছে। কী দরকার তোর এসব করার? আরে চেঁকি স্বর্গে গেলেও লাথি খায় আর ধান ভানে। কী ভাবছিস তুই, টিভিতে মুখ দেখালেই সে কেউকেটা হয়ে যায়?
এরা সব সিপিএম পার্টির নেতা মন্ত্রী, এল. সি. এম.-এর ভাইপো, ভাগনে। কর্মস্থলই নয়–সারা পশ্চিমবঙ্গে এদের অসীম ক্ষমতা। তার উপর এখানে আছে ঢাল হিসাবে প্রতিবন্ধী বাচ্চা। দরদী সমাজের সব সহানুভূতি যাদের দিকে। এই বাচ্চাদের শিখণ্ডি করে পেছন থেকে তির মারার মস্ত সুবিধা। ওয়ার্ডেন একদিন বলে, এই যে শোনেন মনোরঞ্জনদা, গল্প লিখছেন, লেখক হচ্ছেন, ভালো কথা, কিন্তু যে কাজটার জন্য মাইনে নিচ্ছেন সেটা ঠিকমতো করবেন তো। রোজ বাচ্চারা কমপ্লেন করছে ভাতে কাকর। একটু চাল ডালগুলো বেছে নেবেন। ছাদে একটা কিছু বিছিয়ে বেছে নিতে কতক্ষণ লাগে? এই রকম নানা অজুহাতে তারা কাজের চাপ বাড়িয়ে চলে। লেখ এবার, দেখি কেমন লিখতে পারিস।
হঠাৎ একদিন হুকুম হল আর ভাত নয়। এবার থেকে রোজ রাতে বাচ্চারা রুটি খাবে।
যখন আমরা প্রথমে কাজে আসি তখন বলা হয়েছিল দুজনের পঞ্চাশটা বাচ্চার রান্না করতে হবে। বেড়ে বেড়ে সে সংখ্যা বর্তমানে প্রায় দেড়শো। এখন লেডিস হোস্টেলও চালু হয়ে গেছে। এত লোকের দুবেলা বাসন মাজা তরকারী কাটা রান্না করা পরিবেশন করা, এতেই দম বেরিয়ে যায় দুজনের। এখন আবার রুটি। কতো সময় লাগে এত লোকের রুটির আটা মাখতে বেলতে ভাজতে? আবার সেই রুটির আটা, সেও গম থেকে ভাঙিয়ে আটা বানিয়ে আনতে আমাকেই যেতে হবে। রেশন দোকান থেকে গম–সেও গিয়ে আমাকেই আনতে হবে।
