কথা দেই না ইলিনা সেনকে, আবার একেবারে নাও বলি না। ফিরে এসে অপেক্ষায় থাকি, কখন দে বাবুর সেই মারণাস্ত্রটা আমার দিকে ছুঁড়ে মারেন। এদিকে চাকরি যাবে ওদিকে আমার ফোন যাবে–আমি আসছি দিদি।
মাস খানেক বা তার চেয়ে দু’চারদিন পরে ভেসে এল একটা দুঃসংবাদ। সে সংবাদের জন্য আমি কেন–কেউই প্রস্তুত ছিল না। দে বাবু মারা গেছেন। প্রতিবন্ধী অফিস থেকে সে খবর বধির বিদ্যালয়ে এসে পৌঁছাতে নিজের কানকে ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারলাম না। এও কী সম্ভব। এ কী করে সম্ভব?
দে বাবু মারা গেছেন!–গেছেন?
দিব্যি সুস্থ সবল তরতাজা মানুষ। বলতে গেলে কাল কালকেও উনি প্রতিবন্ধী অফিসে গিয়ে বসেছেন। সবার সাথে হেসে হেসে কথা বলেছেন। লাল চা খেয়েছেন, খইনি খেয়েছেন। কারো পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়েছেন, কাউকে ধমক দিয়েছেন। রোজকার দিন চর্যায় কোথাও কোনো ঘাটতি ছিল না। হঠাৎ ইন্দ্র পতন।
কাল রাত প্রায় দুটোর সময় হঠাৎ তার মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়। দে বাবুর ছেলেও ডাক্তার। ভালো ডাক্তার। সে তার সাধ্যমতো বাবার যন্ত্রণা কমাবার চেষ্টা করে। যন্ত্রণা কমে না, বেড়ে চলে উত্তরোত্তর। তখন তাকে ভর্তি করা হয় শহর কলকাতার সবচেয়ে ব্যয়বহুল এক বেসরকারি হাসপাতালে। কিন্তু পাঁচজন ডাক্তারের প্যানেল পাঁচ ঘন্টা ধরে অবিরাম চেষ্টার পরেও সামান্য মাথার যন্ত্রণার উপশম দিতে পারে না।
একে কী বলব! ভাগ্য?নাকি বড় লোকের বড় রোগ? যে মাথার যন্ত্রণা গরিব লোকের একটা ডিসপ্রিনে পালাবার পথ পায় না, তাই একজন বিত্তবানকে পেড়ে ফেলেছে বিছানায়। পাঁচজন আর এক ছয়জন ডাক্তার দাঁড়িয়ে আছে অসহায় হয়ে। উন্নত চিকিৎ জ্ঞানের সব নিদান ব্যর্থ চলে গেছে!
আজ বেলা দশটায় প্রিয়জনকে চোখের জলে ভাসিয়ে চির বিল্টুদায় নিয়ে সাধনোচিত ধামের দিকে যাত্রা করে গেছেন তিনি। খবরটা পেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল আমার বুক থেকে। তবে সেটা স্বস্তির না বেদনার তা আমি কখনো কোনোদিন ভেবে দেখেনি।
আমরা ভারতীয়। ভারতীয় সাংস্কৃতিতে কোনো মৃত মানুষের নামে মন্দ কথা বলার অনুমোদন নেই। সেটাকে অনুচিত এবং মৃতের আত্মার প্রতি অবজ্ঞা বলে মনে করা হয়। মৃত মানুষ মানে সব সমালোচনার উর্ধ্বে। তাই একদা যে দে বাবু আমার পশ্চাৎদেশে ঢোকাবার জন্য একখানি উত্তম বাঁশের সন্ধানে ব্যাপৃত ছিলেন তারই মৃত্যুতে শোকাহত মুহ্যমান হয়ে পড়ি আমি।
এখন আর এই স্কুলে কারো জানতে বাকি নেই যে আমি আসলে এক লেখক। এখন শোকাচ্ছন্ন স্কুলের পক্ষ থেকে শোকে মুহ্যমান আমার কাছে একটা অনুরোধ আসে দাদার ডেডবডিতে মাল্যদান এবং শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য আমাদের এখানেও আনা হবে।নানান জায়গায় অনুষ্ঠান চলবে তো। এখানে বডি পৌঁছাতে রাত আটটা ন’টা বেজে যাবে। এর মধ্যে তুমি দাদার জন্য একখানা কবিতা লিখে ফেলো। বেশ জম্পেশ করে লিখবে, যেন লোকের চোখে জল এসে যায়।
কবিতা দিয়ে চোখে জল। সামনে শায়িত মৃতদেহখানি দেখেও যে চোখে জল আসে না, কবিতার খোঁচা দিয়ে সেই চোখ থেকে জল ঝরাবো, কবিতা কী লঙ্কার গুঁড়ো না, পেঁয়াজের ঝাঁঝ। নাকি খাঁটি সরষের তেল? যা কবিরও চোখ থেকে জল ঝরায়। ঘরে এসে আমি তখন আঁতিপাঁতি করে পুরাতন ডায়েরি, খাতাপত্র সব খুঁজি। যদি কোথাও কোনো এমন মাল পড়ে থাকে যাকে একটু ঘসে মেজে দিলে যুগপোযোগী সময়োপযোগী হয়ে যায়। কোথায় যেন শুনেছিলাম কে এক কৃষ্ণভক্ত দায়ে পড়ে খ্রিস্টান হয়েছিল। তারপর আগে যে ভজন গাইত ভজ কৃষ্ট কহ কৃষ্ট লহ কৃষ্ট নাম হে, যে জনা কৃষ্ট ভজে সে হয় আমার প্রাণ রে। সেই গানকে ক–এর জায়গায় খ বসিয়ে দিয়েছিল। সেই রকম আর কী! শোকে দুঃখে আবেগ আতিথ্যে কত সময় তো কত কিছু লিখেছি। তার একটাও কী পড়ে নেই যে আজকের সমস্যা থেকে মুক্তি দেবে?
আছে, বেশি খুঁজতে হয়নি। গত বছরের ডায়েরির পাতায় পেয়ে যাই একখানা খাপে খাপ রেডিমেড মাল। কবিতাটার নাম ‘বৃক্ষ জীবন’।
আমার বউয়ের এক বান্ধবীর নাম পলি দাস। সে আগে মিস্তিরি পাড়ায় থাকত, এখন থাকে নয়াবাদের ভগত সিং কলোনিতে। সে দেবী শেঠি হাসপাতালে আয়ার কাজ করে। সেই পলি দাস একদিন আমাকে ধরেছিল, আমাদের সুরারভাইজার ম্যাডাম চাকরি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। বিয়ে হচ্ছে কীনা। বর বাইরে চাকরি করে। খুবই ভালো লোক ছিলেন তিনি। আমাদের সব মেয়েকে নিজের বোনের মতো ভালো বাসতেন সবার বিপদে আপদে পাশে থাকতেন। ওনাকে আমরা একটা বিল্টুদায় সংবর্ধনা দেব। তুমি আমাদের জন্য একটা কবিতা লিখে দেবে? আমরা আর্টিস্ট দিয়ে একটা সুন্দর ছবি আঁকিয়ে, পাশে তোমার কবিতাটা লিখে ফ্রেমে বাঁধিয়ে ম্যাডামকে দেব।
পরিবর্তন অনেক এসেছে, চুলের একটা দুটোয় রূপালি রঙ। তবু সে আজো কিশোরীদের মত উজ্জ্বল-দুর্বার। তার অনুরোধ আমার পক্ষে আজো এড়ানো কঠিন। তাই কাগজ কলম নিয়ে বসে যাই, সাইকেল চালক হয়ে মোটর সাইকেল চালাতে। আমি কঠিন কঠোর গদ্য জগতের লোক, ওটা পারি। পদ্য পারি না! শুরু হয় ভীষণ যুদ্ধ। লিখে ফেলি বৃক্ষ জীবন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা পলির কাজে লাগে না। বলে সে, মেয়েরা বলছে কবিতা দিয়ে দরকার নেই। সেই টাকায় আমরা অন্য একটা কিছু ভালো দেখে কিনে দেব। এই কানের দুলটুল আর কী!
