গল্পে আছে একজন লোক ভোর বেলায় ঘুম থেকে উঠতে দেরি করার ফলে ট্রেন ফেল করেছে। এতে তার প্রচুর লোকসান হয়ে যাবার জন্য মনভার। কিন্তু যখন আধ ঘন্টা পরে খবর পেল সেই ট্রেনখানা দুর্ঘটনায় পড়েছে তখন আর তার ট্রেন ফেল হবার জন্য মন খারাপ রইল না। তখন ওই ট্রেনে না উঠতে পাবার জন্য নিজেকে নিজে ধন্যবাদ জানাল।
কদিন পরে একরাতে গনগনে আগুনের শিখায় পুবাকাশ লাল হয়ে গেল। শোনা গেল শতশত কণ্ঠের সম্মিলিত আর্তনাদ। নৈশ নিস্তব্ধতা ভেদ করে মুহুর্মুহু গুলির আওয়াজ। সারা রাতে এ শব্দের বিরাম ছিল না।সকাল হতেই দেখতে পেলাম, যে পথে কাল মানুষ পায়ে হেঁটে গিয়েছিল, এখন সেই পথেই ফিরে আসছে বাঁশের মাচায়, ঠেলাগাড়ি ভ্যান রিকশায়। সবার শরীর থেকেই পথের ধুলায় ঝরে ঝরে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত। মানুষের রক্তে লাল হয়ে যাচ্ছে পথের ধুলো। সারারাত ধরে পুলিশ আর জমিদারদের পোষাগুণ্ডা বাহিনী যে নৃশংস তাণ্ডব চালিয়েছে এ সব তারই নিদর্শন। একসঙ্গে এত রক্তাক্ত আহত নিহত মানুষ দেখে সেদিন সেই কিশোর মন কাতর হয়েছিল আমার। সেদিন পৃথিবীটাকে আমার সভ্য মানুষের বাসভূমি বলে মনে হয়নি। মনে হয়েছিল একদল হত্যাভিলাষী ঘাতকদের উল্লাস ভূমি। এই বধ্যভূমিই আমার দেশ। এই হত্যাকারির উল্লাস মঞ্চই আমার দেশ।
আমার বাবাকে একদিন বিনা অপরাধে পুলিশেরা মেরে রক্তাক্ত করে দিয়েছিল। সেইদিন থেকে পুলিশ নামটার প্রতি আমার জন্মে আছে ঘৃণা ভয় আক্রোশ। এবার সেই সাথে যুক্ত হল আর একটা নাম সেটা হচ্ছে জমিদার। পুলিশ গুণ্ডা আর জমিদার এরা মানুষের শত্রু। এদের মাত্র একটাই কাজ মানুষকে অত্যাচার করা। ডাক্তারের বাড়ির অমানবিক ব্যবহারে বর্ণ প্রভুদের প্রতি ক্ষোভ রাগ সেও যাবার নয়। এই রাগ ক্ষোভ ঘৃণায় ত্রিবেণী সঙ্গমের ঘোলা স্রোতে ভেসে চলল আমার ছোট্ট জীবন তরীখানা। মনের মধ্যে জমা হতে রইল বিস্ফোরণউন্মুখ বারুদ।
জীবন এক যাত্রা, জীবন এক যুদ্ধ, জীবন এক অভিজ্ঞতার নাম। আমি কি তখন জানি যে জীবন আমাকে কোথাও থিতু হতে দেবে না। ক্রমাগত তাড়িয়ে নিয়ে যাবে এক বিভৎসতা থেকে আর এক বিভৎস অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে। রক্ত ধ্বংস চোখের জলের বহু পথ পার হতে হবে এই ছোট পায়ে। এই পথই আমার জন্য পূর্ব নির্ধারিত। কেউ আমাকে টানছে, কেউ আমাকে ঠেলছে সেই দিকে চালিত করার জন্য। আমি এক ক্ষুদ্র মানুষ, আমার সাধ্য কোথায় সেই অমোঘ নির্দেশ উপেক্ষা করবার।
যাদবপুর ত্রিকোণ পার্কের সেই দোকনে থেকে কাজ ছেড়ে দিয়ে এবার কাজ খুঁজে নিয়েছিলাম পার্ক সার্কাসের এক চায়ের দোকানে। আগের মালিক মাইনে দিচ্ছিল মাসে দশ টাকা, এ মালিক দেবে তার দেড়গুণ বেশি। মাসে পঁচিশ টাকা।
এই দোকানদার বৃদ্ধ। রোজ সন্ধ্যেবেলায় তার দোকানে তারই মত জনাকয়েক বুড়ো লোক আড্ডা দিতে আসে। একদিন এদের আলোচনায় জানা গেল মুসলমানদের কোন এক মসজিদ থেকে নাকি পবিত্র “হজরত বাল” চুরি গেছে। এদের সন্দেহ ওসব চুরি ফুরির গল্প স্রেফ বানানো। ওই বস্তু নিয়ে কার কী লাভ। এই সব বলে মুসলমান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আবেগে সুড়সুড়ি দিয়ে কিছু বদমাশ লোক একটা দাঙ্গা বাধাতে চাইছে। এবং একদিন সত্যি সত্যি সারা দেশ জুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরুই হয়ে গেল। কারণ মুসলমানদের মধ্যে কিছুলোক বিশ্বাসই করে বসল যে এটা হিন্দুদেরই কাজ। দেশের পরিস্থিতি তো অনেক আগে থেকেই পারস্পরিক ঘৃণা ভয় সন্দেহ বিদ্বেষে অগ্নিগর্ভ হয়েছিল। দরকার ছিল মাত্র একটা ছুতোর। সে ছুতো পাওয়া মাত্র পাগলা কুকুরের মতো এক সম্প্রদায় ঝাঁপিয়ে পড়ল আর এক সম্প্রদায়ের টুটি লক্ষ্য করে, দাঁতে কামড়ে ছিঁড়ে নেবে বলে।
পার্ক সার্কাস অঞ্চলে মুসলমানদের সংখ্যা বেশি। উস্কানি যথেষ্ট আছে, তবে এখন পর্যন্ত এ অঞ্চলে দাঙ্গা হয়নি। পথেঘাটে হাটেবাজারে তারই ইঙ্গিত আভাষ বড় প্রকট। রাত নামলে সবার চোখে মুখে ঘনিয়ে ওঠে ভয়ের কালো ছায়া। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পথচলা মানুষ ঘরে ফিরে দরজা এটে বন্ধ করে নেয়। শুনশান হয়ে যায় সব অলিগলি। এখন বড় ভয়ানক দিন। এসব দিনে সন্ধ্যা নামলে কোন মা কোন বাবা তার সন্তানকে ঘরের বাইরে যেতে দেয় না। যদি ঘরের বাইরে থাকে সে ফিরে না আসা পর্যন্ত দুশ্চিন্তায় মা বাবার বুক কাপে।
আমি এক অভাগা মানুষ। আমার এই বিপন্ন “বিদেশে” কোন আপনজন নেই, যে, আমি হারিয়ে গেলে খুঁজবে, মরে গেলে কাঁদবে। আমি কাজের লোক। আদেশ পালন করা যার কাজ। “পারব না” বলা যার মুখে মানায় না। সেটা গর্হিত অপরাধ। কর্মচারিদের প্রতি মালিক শ্রেণির কোন মায়া মমতা থাকেনা। সেটা তাদের মানসিক দুর্বলতার লক্ষন। চিত্ত দুর্বল মালিক–মালিক শ্রেনির–উপহাসের পাত্র। কষাই পাঠা ছাগলের প্রতি মমত্ব দেখালে তার ব্যবসা ফেল মেরে যাবে।
ত্রিকোণ পার্কের দোকান থেকে সরাসরি পার্কসার্কাসে আসিনি। এর আগে দিন কয়েক পালবাজারে এক দোকানে কাজ করেছিলাম। সে দোকানের মালিক রোজ রাত সাড়ে নটার সময়ে আমাকে তার বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসতে পাঠাত। তার বাড়িটা ছিল কালিকাপুর মাঠ পার হয়ে মাইলখানেক আগে। পালবাজার থেকে সে বাড়ির পথ চারপাঁচ মাইলের বেশি নয়। তবে গরফা স্কুল পার হবার পর পুরো পথটাই ছিল এবরো খেবরো–অন্ধকার আর বনজঙ্গলে পূর্ণ। তখনও এ অঞ্চলে এত ব্যাপক জন সমাগম ঘটেনি। সেইসব বনজঙ্গলে বাস করত সাপ শেয়াল অজস্র পোকামাকড়। অত রাতে এ পথে কোন লোকজন থাকত না। একা যেতে খুবই ভয় করত আমার। গরফা স্কুল পার হয়ে অন্ধকার পথে নেমে ভয়ের তাড়সে জোরে জোরে গান গাইতাম আমি। গান মাত্র এক কলি–ভজ শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ, হরে কৃষ্ণ হরে রাম শ্রীরাধা গোবিন্দ। অন্যসব নাম তো ফালতু ফালতু নেওয়া–আসল নাম হচ্ছে রাম। সবাই যা জানে আমিও তা জানি, রাম নামে ভূত পালায়। এখানে যা জঙ্গল ভূতপ্রেত না থাকার কোন কারণ নেই। তাই খুব দ্রুত উচ্চারণে ভজ থেকে রামে পৌঁছে যেতাম।
