এদের জ্বালায় আমি রাতে ঘুমাতে পারি না, দিনে ঠিকমতো কাজকর্ম করতে পারি না। যখন তখন ফোনে এরা বিরক্ত করে। যে কারণে খুবই মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে আছি। আমি এমন একটা কাজের সাথে যুক্ত যার কারণে পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন মানুষ আমার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রাখে। ফলে হুট করে যে নাম্বার বদলে ফেল্লব সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। আপনি উদ্যোগ নিলে সমস্যার অবশ্যই সমাধান সম্ভব।
তারা ফোন করা তত বন্ধ করেছিল বন্ধ করেনি অন্য উৎপাত যা আমি আগে লিখেছি। বাধ্য হয়ে টিচার ইনচার্জের কাছে একটা লিখিত অভিযোগ জমা দিই।
.
বৃত্তের শেষ পর্ব বইখানা ছাপাবার পিছনে যে ইতিহাস দেবাবু আর বিশ্বাস বাবুর যে অমানবিক দোহন, আমাকে নিংড়ে ছিবড়ে বানিয়ে দেওয়া, সেসব চুপচাপ মনের মধ্যে মেরে ফেলতে পারিনি। মনের ক্ষোভ জ্বালা মিশিয়ে বলে ফেলেছিলাম কখনো কখনো কাউকে কাউকে। সেটাই কেউ তুলে দেয় ওনার কানে। এতে নিদারুণ ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন তিনি। দে বাবু প্রতিবন্ধী সংগঠনের সচিব। আঠারোটা জেলার ছড়িয়ে আছে এই সংগঠনের কর্মকাণ্ড! বিশাল দায়িত্ব ওনার বিশাল ক্ষমতা সম্মান অর্থ প্রভাব প্রতিপত্তি। উনি যা করবেন সবাইকে নত মস্তকে তা মেনে নিতে হবে এটাই তো এক অলিখিত নিয়ম। মুখ বুজে সয়ে যেতে হবে সব কিছু।
আর আমি কী না তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ ক্রোধ উন্মা প্রকাশ করছি। লোকের কাছে যা তা বলে সম্মানহানি ঘটাচ্ছি তার। এ কী সহ্য হয়? কোনো ক্ষমতাবান কী দুর্বলের দাপাদাপি সহ্য করে?
তাই একদিন উনি এলেন বধির বিদ্যালয়ে। ডাকলেন আমাকে তারপর বললেন তুই এসব লোকের কাছে কী বলে বেড়াচ্ছিস রে? তোকে আমরা পাঁঠার মতো কেটেছি? আখের মতো ছিবড়ে করেছি?
আমি মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকি। কী বলব কোনো কথা খুঁজে পাই না।
হঠাৎ একেবারে শান্ত হয়ে গেল ওনার গলা। তারপর যেন কোনো বিজ্ঞ কোনো অবোধ বাচ্চাকে বোঝাচ্ছেন এমন ভাবে বলেন–বড় দোকানে চা খেয়েছিস কোনো সময়? একশো টাকা এক কাপ। একটু রাস্তাটা পার হয়ে সামনে চলে যা, দুটাকা কাপ। তাহলে কী লোককে তারা ঠকাচ্ছে? মোটেই না। যার যা রেট। বুঝলি কিছু?
মাথা নাড়ি আমি–বুঝলাম।
দাঁড়িয়ে আছিস কেন, বস।
আমি বসলাম।
দে, একটু খইনি দে।
খইনি দিলাম।
খইনি মুখে দিয়ে বলেন তিনি, আমি খবর পেলাম তুই নাকি জেলে ছিলি! কী ছিলি?
ছিলাম।
আগে বলিস নি তো! কোন্ জেলে ছিলি? কী কেস? সব কিছু খুলে বল। পুলিশ দিয়ে ভেরিফিকেশন করাতে হবে। দেখবে হবে জেলখাটা আসামি সরকারি চাকরিতে কী ভাবে ঢুকে গেল।
এবার আমি সত্যি সত্যি একটু ভয় পাচ্ছি। টের পাই কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের আভাস। এই সময়টা বড় বিপদজনক সময়। চারদিক মাওবাদীদের নামেই কাঁপুনি শুরু হয়ে যাচ্ছে। কটা বাচ্চা ছেলে নন্দনে লিফলেট ছড়াচ্ছিল তাদের ধরে পুলিশ মাওবাদী বলে চালান করে দিয়েছে। আমার আগেকার রেকর্ড ভালো নয়। ইচ্ছা করলে তাকে খুঁচিয়ে তিলকে তাল বানিয়ে দিলে আমি কী করব।
কবে দিবি?
কী।
তোর পুরো বায়োডাটা। কটা খুন করেছিস, তার মধ্যে পুলিশ কটা, সিপিএম কটা, সব লিখবি। কেসগুলোর কী হয়েছে না হয়েছে, সব-সব।
আরো অনেক কথা সেদিন বলেছিলেন দে বাবু। কান-মাথা ঝা ঝা করছিল বলে সে সব কথা কানে গেল বটে তবে মাথায় রইল না। বুঝতে পারলাম আজ থেকে আমার চাকরির ঘড়ির কাটা উল্টোদিকে ঘোরা শুরু হয়ে গেল। এবার যেতে হবে। দে বাবু আমার চাকরির মৃত্যুঘন্টা বাজিয়ে দেবেন।
সেদিন কাজ থেকে বাসায় ফিরলাম। কিন্তু মনে কোনো শান্তি নেই। না পারলাম ভালো করে খেতে না পারলাম রাতে ঘুমাতে। চৌকির উপর আমার ছেলে মেয়ে ঘুমাচ্ছে চৌকির নীচে আমার স্ত্রী অনু। বড় নিরুদ্বেগ ঘুমে তলিয়ে আছে সবাই! কারো মুখে কোন চিন্তা ভাবনার লেশ মাত্র চিহ্ন নেই! ওরা কেউ জানেনা কী ভীষণ বিপর্যয় নেমে আসছে আমাদের জীবন ঘিরে। চাকরি নামক ছোট এক খাঁচায় চার চারটে প্রাণির যে আশা স্বপ্ন বন্ধ করে রাখা আছে, কাল পরশু কিংবা তার পরের দিন সে খাঁচাটা থাকবে না। আবার আমাদের উড়ান দিতে হবে অজানা আকাশ পথে কোনো এক নিরুদ্দেশের দিকে।
এর মধ্যে একদিন যোগেনদার সাথে দেখা করাতে গেছি সোদপুরের ঠিকানায়। যোগেনদা আমাকে নিয়ে গেলেন সল্টলেকের ড. ইলিনা সেনের এক আস্তানায়। ইলিনা সে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ডাক্তার বিনায়ক সেনের সহধর্মিনী। এবং মহারাষ্ট্রের ওয়ার্ধায় মহাত্মা গান্ধি অন্তরাষ্ট্রীয় হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা।
এক সময় বিনায়ক সেন আর দল্লীর শ্রমিক নেতা শঙ্কর গুহ নিয়োগীর মধ্যে গভীর সংযোগ ছিল। এই দুজনার সম্মিলিত প্রয়াসে গড়ে উঠেছিল ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চার সেই ঐতিহাসিক জনস্বাস্থ্য চেতনার প্রথম প্রকল্প শহিদ হাসপাতাল।
চা খাওয়া এবং নানাবিধ কথপোকথনের মধ্য দিয়ে যখন ইলিনা সেন জানতে পারলেন আমি ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চারই লোক এবং ঠিক কি কী কারণে দণ্ডকারণ্য থেকে চলে এসে কলকাতার এক স্কুলে কী ভাবে একদল হিংস্র জন্তু জানোয়ারের খাঁচায় ঢুকে পড়েছি উনি তা শুনে তুরি মেরে হেসে উঠলেন। বললেন-“ওদের সামনে রাতদিন ভয়ে ভয়ে কখন কী হয় সেই আতঙ্ক নিয়ে কেন পড়ে আছেন। বের হয়ে আসুন। আপনার যেটা সঠিক জায়গা–মানুষের মাঝে মানুষের কাজে সেখানে পৌঁছে যান। যাবেন রায়পুর? রায়পুরে বিনায়ক কী ধরনের কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত আছেন সে তো আপনার জানা। চলে যান রায়পুরে।”
