.
আমার বিরুদ্ধে একটা চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে আমার কর্মস্থলে, সেই যেমন হয়েছিল সন্দীপ মাস্টারের বেলায়। তাকে আমি দেখিনি। তবে নিলয় নামের লোকটাকে আমি দেখেছি। নিলয় এখানে চাকরি করতে এসেছিল। তবে তার সব চেয়ে যেটা বড় গুণ, ভালো দাবা খেলত। সে ভারতবর্ষের বহু প্রদেশ থেকে পুরস্কার জিতে এনেছিল। বিদেশেও গেছে কয়েকবার দাবা খেলতে। পেয়েছে ইন্টার ন্যাশনাল রেটেড প্লেয়ারের সম্মান। প্রথম হয়েছে ইংল্যান্ডে ক্রিসমাস মর্নিং চ্যাম্পিয়নশিপে। ব্লিটস চেজ টুর্ণামেন্টে তৃতীয় স্থান পেয়েছে। তার এই খ্যাতি শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়াল কর্মক্ষেত্রে। এখানকার দুষ্ট চক্র তাকে দেখলেই দল বেঁধে এমন ব্যঙ্গ বিদ্রূপ শুরু করে দিত যে শেষে সে আর মানসিক ভারসাম্য রাখতে পারছিল না। দাবা তো ধীর স্থির মস্তিষ্কের কাজ। তাই বাধ্য হয়ে চাকরি ছেড়ে চলে গেল সে।
দাবা একটা খেলা। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা হলেও আসলে তো খেলাই। এই খেলায় যতই হাতি ঘোড়া মারা হোক-প্রকৃতপক্ষে কারও অহিত তো হয় না। কিন্তু লেখা তো তা নয়। কলম সে তো কখনও কখনও তরবারির চেয়ে ধারালো হয়ে ওঠে। আমার কলমের ধার মুখে জমে আছে জীবনের যন্ত্রণার তীব্র গরল। পুঁজিবাদ ব্রাহ্মণ্যবাদ আমার প্রতিপক্ষ। যাদের কাটছে তারা আমাকে ছাড়বে কেন। তারা চায় আমি যেন লিখতে না পারি। সেই যে যারা একদিন গান গাইত–শিল্পী সংগ্রামী পল রবনসন আমরা তোমারই গান গাই–ওরা চায় না। আজ তারাই চায় না, এক জন শ্রমজীবি মানুষ সত্যকথা বলুক।
রোজ সকাল সাড়ে ছটা সাতটায় আমার ডিউটির শুরু। বাসন মাজা তরকারি কাটা ধোয়া, মাছ ধোয়া, মশলা করা, রান্না করা, পরিবেশন, রান্না ঘর খাবার জায়গার সাফ সাফাই। আর একবার এই সব কাজ করতে হবে রাতে। তখন আবার গোডাউন থেকে পরের দিনের জন্য চাল, ডাল, তেল, মশলা মেপে মেপে বের করে নিতে হবে। এই সব সম্পন্ন করতে হবে আমাকে একজন অথর্ব মহিলাকে সাথে নিয়ে। সকালের খাবার পরিবেশন করতে হবে সাড়ে নয়টার সময়ে। ভাত ডাল আলু ভাজা মাছ বা ডিম থাকবে মেনুতে। রবিবার সকালের টিফিনে লুচি আলুর তরকারি যুক্ত হবে। মাছের ডিমের বদলে হবে মাংস। রাতে দুরকমের তরকারি ডাল আর ভাত। খাবার সময় সাড়ে আটটা। যদি ঝড় জল বন্যা হয়ে যায় যদি আমার সহকারি নাও আসে যা সে প্রায়ই করে–ওই নিয়মের কোনো অন্যথা হবে না। হলেই ভাগ্যে জুটবে অকথ্য খিচুনি। ধমকি–‘শোকজ করে দেব’।
এই সব কিছুর পিছনে কাঁকড়া বাঙালিদের রয়েছে একটা উদ্দেশ্য আমাকে চাপে রাখা। যেন আমি লেখার সময় না পাই। কথা ছিল আমাদের পঞ্চাশজন লোকের রান্না করার। এখন যা বেড়ে বেড়ে প্রায় দেড়শত। খাবার লোক বেড়েছে কাজের লোক বাড়ানো হচ্ছে না। দুজন লোকে দেড়শো গরুর ঘাস দিতে পারে না। আর এরা তো মানুষ। কী করে দুজনে খাওয়াবো? কাজে কিছু না কিছু ত্রুটি থেকে যায়, বাচ্চারা খেপে যায় আমার উপর।
উদ্দেশ্য যা থাক এইসব সমস্যার তবু মোকাবিলা করা যায়, করা যায় না সেইসব সমস্যার যা শুধু আমাকে বিবৃত বিপদাপন্ন করে দেবার জন্য পরিকল্পিত ভাবে করা হয়ে থাকে। কোনো ভাবে কষ্টেসৃষ্টে হয়ত রান্নাটা সেরেছি, আমার কোনো এক অসতর্ক মুহূর্তে কেউ ভাতে এক মুঠো ধুলো মিশিয়ে দিয়ে চলে গেল। এটা একবার মাদার করেছিল। কেউ হয়ত তরকারিতে খানিকটা নুন ঢেলে দিল। এটা করেছিল বড় সাহেবের বাল্যবন্ধু। দুপুরে বাড়ি গেছি খেতে বলা হয়নি, তখন আর আমি এখানে খাই না, বড় সাহেবের কঠোর হুকুম বাচ্চাদের কোনো খাবার মুখে তুলবি না। সেটা বেআইনি। কারণ এখন তোরা মাইনে পাস। সে যা হোক বিকালে রান্না করতে এসে দেখব। আমার অবর্তমানে কেউ ক্ষতি করে রেখে দিয়েছে গ্যাস ওভেনের। এতে একটা দুর্ঘটনা যদি ঘটে তাদের মনে শান্তি আসে। যদি তা না হয় একটা বিশৃঙ্খলা তো হবেই। যথা সময়ে রান্না নামানো যাবে না। ক্ষুধার্ত বোবা বাচ্চারা ক্ষেপে উঠবে। এই ওদের লাভ এই ওদের আনন্দ।
আমার একখানা সাইকেল আছে। যা চেপে আমি ডিউটিতে আসি। আমার যেখানে বাড়ি সেখানে কোনো অন্য বাহন চলে না। রাতের রান্না শেষ করে খাইয়ে দাইয়ে বাড়ি যাবার জন্য সাইকেলের কাছে গিয়ে দেখব কেউ টিউব থেকে নজেলটা খুলে দিয়ে চলে গেছে বা চাকায় মেরে দিয়েছে পিন, টায়ার কেটে দিয়েছে ব্লেড মেরে। তখন সেই রাত সাড়ে দশ এগারোটায় আর সাইকেল সারাইয়ের দোকান ভোলা পাওয়া যাবে না। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে ফিরতে হবে বাড়ি। পরদিন ভোরে আবার কাজে আসতে হবে হেঁটে হেঁটে।
শুধু এই নয়, আমার একখানা মোবাইল ফোন আছে। বাড়ি বহুদুরে পথ অতি দুর্গম। কেউ যদি আমাকে খোঁজে কী করে পৌঁছবে আমার ঠিকানায়। এখানে পিওনও চিঠি দিতে আসে কালভদ্রে। তাই নিতে হয়েছে একখানা মোবাইল। এখন সেই মোবাইলে রাতদিন মিসকল আসছে। যদি ফোন রিসিভ করি মা বোন তুলে নোংরা গালাগালি।
আমি আর কী করতে পারি। বাধ্য হয়ে ফোন নম্বরগুলো একটা কাগজে লিখে নিয়ে বড় সাহেবের কাছে দিয়ে আসি। সাথে থাকে একখানা দরখাস্ত।
লিখি–আমি আপনার বধির স্কুলের রন্ধনশালার একজন কর্মী। আমাকে কেন কে জানে কিছু লোক ভীষণ মানসিক উৎপীড়ন করে চলেছে। যারা পঁচিশ তিরিশখানা ফোন থেকে অনবরত মিসকল এবং ফোন ধরলে অশ্রাব্য গালিগালাজ করে থাকে। আমি জানিনা এরা কারা এবং কী উদ্দেশ্যে এসব করে। কোথা থেকে কী ভাবে এরা আমার ফোন নাম্বার পেয়েছে তাও আমার অজানা। আমার ধারণায় এরা সব কোনো না কোনোভাবে আমাদের স্কুলের সাথে যুক্ত। তাই বিষয়টি আপনার গোচরে আনলাম। এবং সমস্যাটি সমাধানের প্রার্থনা জানালাম।
