এই সময় আমার কাছে সম্বল মাত্র আট টাকা। বাড়ি ফেরার পথ খরচ। যাদবপুর স্টেশন থেকে বাসে মুকুন্দপুর তিনটাকা সেখান থেকে রিকশায় দাস পাড়া পাঁচ টাকা। তারপর আর বাস রিকশা নেই। আধঘন্টা পায়ে হেঁটে আমার নিবাস। বাস আর রিকশা ভাড়া বাবদ কোনক্রমে আটটা টাকা বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। এখন সেটা দিয়ে দিতে হয়। যেহেতু আটটাকার জন্য ছোটোলোকামি ঠিক নয়, মদ্যপানও করিনি। চক্ষু লজ্জায় পকেট খালি বলতে পারি না। পরে যা হবার ভেবে রিকশা ভাড়া মেটাই। তারপর হাঁটতে শুরু করি তার পিছনে পিছনে।
গলিটা সরু অন্ধকার আকাবাকা উবর খাবর। কোন এককালে পিচ খোয়া দেওয়া হয়েছিল। মেরামতির অভাবে এই দশা। বোঝা যায় এই গলিতে কোন নেতার নিবাস নেই। তাই তেমন আলোর ব্যবস্থাও নেই। সারা পাড়া এসময়ে ঘুম ঘোরে কাতর। হোঁচট খেতে খেতে সামনে এগিয়ে লোকটা একটা একতলা বাড়ির সামনে দাঁড়ায়। দরজা স্বাভাবিক নিয়মে ভিতর থেকে বন্ধ থাকার কথা। তাই আছে। স্বামী সেই বন্ধ দরজার কড়া ধরে বার কয়েক নাড়িয়ে কোন সাড়া না পেয়ে রাগে গলার শিরা ফুলিয়ে চিৎকার করে ওঠে, এ্যাই শালি খোল, দরজা খোল–দ্যাখ তোর সেই লোককে ধরে নিয়ে এসেছি। কী বলেছিলাম তখন? বের হয়ে দ্যাখ মালটাকে চিনি কিনা। কথার সাথে সমানে সে কড়া নাড়তে থাকে। তার চিৎকারে গৃহকর্তীর হৃদয় তো গলে না কিন্তু আশেপাশের বাড়ি দু চারটে জানালা খুলে যায়। জানালায় দেখা যায় কিছু কৌতূহলী মুখ। আশংকা হয়। এক্ষুনি মাথার উপর ঢিল পোঁচড়া পচা ডিম কিছু একটা পড়বে। আমার তটস্থতা দেখে সে সাহস জোগায়, ভয় পাবেন না। কেউ কিছু বলবে না।
কিছু বলবে না। কেন বলবে না। তাহলে কি এ পাড়ার সবাই মদখোর। রাত হলে সবাই সমান চিৎকার করে। চিৎ হয়, চিৎকরে। আমার অমূলক সন্দেহ নিরসন করতে বলে সে, পনেরো বচ্ছর এই পাড়ায় আছি তো। রোজ রাতে শুনে শুনে সবার অভ্যাস হয়ে গেছে। ওরা জানে আধ ঘন্টার তো ব্যাপার। ঝগড়া হলে তার চেয়ে কত বেশিক্ষণ লাগবে। বোঝে সবাই।
আধঘন্টা নয় মিনিট পনেরোর চিৎকার আর দরজা ধাক্কার পর শুনতে পাই ছিটকিনি খোলার আওয়াজ। দরজা সামান্য ফাঁক হয়। সেই ফাঁক দিয়ে দেখতে পাই একটি অনিন্দ্য সুন্দর মুখশ্রী, কপালে জ্বলছে সিঁদুরের বড় টিপ! তার নিচে পদ্ম দিঘির মত দুটো কাজল কালো চোখ। দেখতে পাই কমল কোয়ার মত দুটো রসালো ঠোঁট। বাঁশির মত টিকালো নাক। নাকে সোনার সরু নথ। সব মিলিয়ে মুখটা এমন চোখ ফেরানো যায়না। মনে হয় এমন রূপ দেখার জন্য আটটাকা অনেক কম খরচ। মনে হয় এইরাতে এভাবে এসে আমি কোন ভুল করিনি। ইচ্ছা করলে এখন আমি একটা কবিতা লিখে ফেলতে পারি। গান গেয়ে ওঠাও কোন কঠিন নয়। দরজা আর একটু ফাঁক হলে দেখতে পাই একটা রঙ বেরঙের চুড়ি পরা নরম কোমল হাত যে হাতকে কবির ভাষায় করকমল বলে। দরজার ফাঁকা থেকে বাইরে বের হয়ে আসে সেই সুন্দরী রমণীর সুন্দর হাতখানা। হাতে ধরা আছে একখানি বিশুদ্ধ সম্মার্জনী। গোদা বাংলায় যার নাম আঁটা। এরপর সেই সুন্দরীর সুন্দর মুখ থেকে ছুটে আসে মধুর সংলাপ, এটা ভদ্রলোকের বাড়ি। দরজায় দাঁড়িয়ে ষাঁড়ের মত চেল্লালে দুই মদখোরকে আঁটা দিয়ে ধুনে নেশা ছুটিয়ে দেব।
স্বামী বড় কাতর গলায় বলে, শালি একে দ্যাখো। চেনো, কাকে এনেছি।
–চলো চুপচাপ ঘরে ঢোকে। আমাকে নয়, শালিনীর নির্দেশ মদ্যপ স্বামীকে, আর একটা কথা বলবে না। রোজ রোজ এক নাটক। চলো।
স্বামী আমার দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে বলে, দেখছেন তো কী রকম বাজে মেয়ে ছেলে–লেখক চেনেনা। একদম আনকালচার। সেই জন্য আপনাকেও ইয়ে ভাবছে। দরজায় একটা লেখক দাঁড়িয়ে আছে। কীভাবে লেখকদের সম্মান দিতে হয় কিছু শেখেনি। একটু কঁদার চেষ্টা করে স্বামী, ফের বলে, এমন মেয়েছেলের হাতে পড়ে জীবনটা ঝাঁঝড়া হয়ে গেল মশাই। কান্নায় কান না দিয়ে রাগী স্ত্রী গজরায়, কী হল, ঘরে ঢুকবে নাকি আমি বাইরে বের হবো? ঝটা দোলায় সে–দেখছো এটা কী? মনে আছে পরশুর কথা?
শেষবারের মত স্ত্রীকে বোঝাবার চেষ্টায় বলে স্বামী–শালি বিশ্বাস করো এ সেই লোক যাকে সন্ধেবেলা টিভিতে দেখেছো? যার উত্তরে গলায় চরম অবিশ্বাস জড়ো করে জবাব দেয় সে, ঠেকে গিয়ে আর দুচার গেলাস গিলতে বলো, একেবারে কবিগুরু হয়ে যাবে।
স্বামী ভদ্রলোক আবার আমার দিকে তাকিয়ে বলে, দেখলেন তো কিছুতে বিশ্বাস করছে না। ওর বা কী দোষ। আপনার চেহারা পোষাক কিছুই তো লেখকের মত না। কী আর করবেন সবই আপনার কপাল। আমি আর কী বলব। যান আপনি আমিও যাই। পরে আবার দেখা হবে। গুড নাইট।
স্বামী ঘরে ঢুকে গেলে সশব্দে দরজা বন্ধ করলেন রাগী স্ত্রী। হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম বন্ধ দরজার সামনে। তারপর হাঁটা দিলাম বাড়ির দিকে। রাজা সুবোধ মল্লিক রোড পিছনে ফেলে সুকান্ত সেতু পার হয়ে সন্তোষপুরের মধ্য দিয়ে মুকুন্দপুর দাসপাড়া রুমঝুম মাঠ সব শেষে গোপাল নগর। বড় দীর্ঘ একক যাত্রা। পথে পাগলা কুকুরে কামড়াতে পারে, কোন ছিনতাই বাজ কেড়ে নিতে পারে হাত ঘড়িটা, চোর ভেবে পাহারাদার ধরতে পারে, সে সব ভয় এখন আমার কাছে তুচ্ছ। আমি ভয় পাচ্ছি ঘরের দরজায় রাত দুপুরে ধাক্কা দিলে আমার স্ত্রী বিরক্ত হয়ে ঝাঁটা হাতে দাঁড়ালে তখন কী হবে?
