এক সময় পেয়ে গেল আমাকে। ছুটে এসে হুমড়ি খেয়ে আমার উপর পড়ে, জড়িয়ে ধরে উৎকট গন্ধ ভরা মুখ মস্তকটা কাঁধে রেখে খানিকক্ষণ কাঁদল হাউ হাউ করে। ওহঃ সে কী কান্না। মনে হচ্ছে কোন মাতৃহারা সদ্য শ্মশানের কাজ সমাপ্ত করে ফিরে কোন সমশোকাতুরকে সামনে পেয়ে আপ্লুত হয়ে উঠেছে। অনেকক্ষণ পরে বলে–দাদা, আপনি আমাকে বাঁচান। আমার মান সম্মান সব গেছে। মান ছাড়া মানি মণিহারা ফণী সমান। লজ্জা অপমানে মরে গেছি আমি। সব আপনার জন্য। আপনার–সব আপনারই জন্য। হয় আপনি আমার হারানো মান সম্মান ফিরিয়ে আনুন আর না হয় হাত পা বেধে আমাকে রেল লাইনে ফেলে দিন। যেটুকু যা বেঁচে আছি সেইটুকুও মেরে ফেলুন। কথা দিচ্ছি কাউকে আপনার নাম বলবো না।
লেখকরা সব পারে। এক আধটা মানুষ মেরে ফেলা তাদের কাছে কোন ব্যাপার না। বিশেষ করে সে যখন কারও কাছে নাম প্রকাশ করবে না। একান্তই মারতে না চাইলে বাঁচাতে হবে। তাও পুরোপুরি নয়, মানহারা হয়ে যেটুকু মরো মরো মাত্র সেটুক। কিন্তু সেটুকু কেমন করে করবো বুঝতে পারি না। বুঝিয়ে বলে সে–দয়া করে একবার আমার বাড়ি চলুন। সাথে প্রলোভনও জুড়ে দেয়-চা খেতে বলবো না, রাত্রে থাকতে হবে না। যাবেন আর চলে আসবেন।
–সে না হয় গেলাম। কিন্তু কেন যেতে হবে সেটা না জানলে।
-–আমার বউকে দেখাবো। শালি—
–আহঃ গালাগালি করবেন না।
–গালাগালি দিচ্ছি না। ওই শালি–মানে শালিনী।
লোকটার স্ত্রী ভাগ্যে ঈর্ষান্বিত না হয়ে উপায় নেই। বউয়ের মধ্যে শালি সুখও পাচ্ছে। বলে সে আমি জীবনে অনেক রকম অপমানিত হয়েছি। কিন্তু আজ যা হলাম সে আর কারও কাছে বলার নয়। শালি কী বলে জানেন? আমি নাকি আপনাকে চিনি না। চলুন একবার। ওকে দেখিয়ে দেবো চেনা না অচেনা।
শুধু এই কারণ। মনটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে আমার। বলি, রাত অনেক হয়ে গেছে, আজ থাক। কাল না হয় সকালে।
লোকটা ঝপ দিয়ে আমার পায়ের উপর পড়ে, জীবনে আমি কারও পা ধরিনি। বিশ্বাস করুন কারও ধরিনি। আপনি আর কী এমন, কত নাম করা মানুষ রাস্তায় দেখি, কাউকে পাত্তা দিইনি। বিপদে পড়ে আজ, কথায় বলে না বিপদে পড়লে গাধাকে বাপ ডাকতে হয়। আমার এখন সেই দশা। পায়ে ধরছি আপনার। বল্লে দশবার ধরবো, তবু একটু চলুন। লেখকরা মানি লোক। মানি লোকরা জানে মান হারাবার কী যন্ত্রণা। আপনি একটু চেষ্টা করুন। চেষ্টা করলেই বুঝবেন কত কষ্টে আছি। না বলবেন না, চলুন। আপনি না গেলে আমি নিজেই লাইনে গলা দেবো। মরার আগে সবাইকে বলে যাবো আমার মৃত্যুর জন্য আপনিই দায়ী। প্লিজ একবার চলুন।
এত কথার মধ্যে এই প্রথম ইংরাজী শব্দের প্রয়োগ। দুশো বছর ইংরেজের গোলাম। কত ইংরেজের বুটের লাথি কপালে পড়ছে গোনা গাঁথা নেই। বড় সমীহ করি ওই ভাষাকে। সকালে কানে গুড মর্নিং দিয়ে দিন শুরু হয় গুড নাইট দিয়ে শেষ। জুতোর স্মৃতি বুকে নিয়ে আমরা আগাপাশতলা ঐতিহ্যের প্রতি সমর্পিত প্রাণা। এখন ইংরাজী শব্দ শুনে মনটা বড় নরম হয়ে যায় আমার। মনের আর কি দোষ, সে তো সন্ধেবেলায় টিভির পর্দায় নিজেকে দেখার পর থেকে এরকম কোমল হয়েই ছিল। কত লোক খাস খবরের শেষ খবরে আমাকে দেখেছে। আমি কি সেই আমি আছি, “জলে-গল” হয়ে গেছি। এমন দিনে কারও মনে কষ্ট দিতে নেই। স্বামী লোকটা মারা গেলে স্ত্রী বেচারার না জানি কত কষ্ট হবে। সেই ভেবে বলি–ঠিক আছে, এত করে বলছেন যখন আমি যাবো।
চকাস করে লোকটা আমার গালে একটা চুমু দিয়ে দেয়–তাহলে চলুন।
–কিন্তু যাবো কি করে। হেঁটে?
–ছিঃ। জিভ কামড়ায় সে–আপনি লেখক মানুষ। হেঁটে গেলে লোকে কি বলবে। ট্যাক্সি তো এখন পাওয়া যাবে না। কি আর করা যাবে, চলুন রিকশায় যাওয়া যাক।
কথা শেষ করে সে সামনে দাঁড়ানো একটা রিকশায় চেপে বসে আমাকে ডাকে, আসুন। আমি উঠতেই রিকশা সামনে গড়ায়। তখন আবার স্বামী লোকটি বলে, আমার স্ত্রীর ঘুমের কোন প্রবলেম নেই। একবার ঘুমিয়ে পড়লে যেন মরা। সকাল আটটার আগে ভাঙে না। কাল-না-কাল, নয়-পরশু। পরশু ফিরতে একটু দেরী হয়েছিল। তার ঘুম ভাঙেনি। কি করবো, সারা রাত বাইরে বসেছিলাম। একটু খাইটাই তো। খেলে ঘড়ির কথা খেয়াল থাকে না। তাড়াতাড়ি ফেরা হয় না। সারাদিন খাটাখাটুনির পর স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়ে। মাঝে মাঝেই বাইরে। সে জন্য আমার কোন অসুবিধা হয়না। রাতের বাতাস শরীরের পক্ষে খুব উপকারী তো। ঠিক কিনা বলুন।
সারাটা পথ সে বক বক করে চলে। বাধ্য হয়ে আমাকে শুনে যেতে হয়। না শুনে উপায় বা কি! বধির যে নই। বধিরদের এই কারণে ভাগ্যবান বলা চলে, বক বক বক্তৃতা বাণী উপদেশ শুনতে হয় না। যদিও নাম চারটে কিন্তু চরিত্রগত দিকে দিয়ে সব সমান। যা মানুষের কান ঝালা পালা করা ছাড়া আর কোন উপকার করে না।
মিনিট দশ পনেরো চলবার পর এক অন্ধকার গলির সামনে রিকশা থামে। সে আগে নেমে বলে, নামুন। যেই রিকশা থেকে নিচে নেমেছি বলে সে-কিছু মনে করবেন না, ভাড়াটা দিয়ে দিন। আমি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যাই। সমস্যা তার, গুনাগার যাবে আমার! এ কী বিড়ম্বনা। আবার বলে সে, মাত্র আটটাকার ব্যাপার তো, দিয়ে দিন। আমার কাছে থাকলে আপনাকে বলতাম না। আট টাকার জন্য ছোটোলোকামি কে করে বলুন। পকেট ফকেট খালি বলে। সন্ধে থেকে আপনার জন্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যা ছিল সব উড়ে গেছে।
