যাইহোক কেমন করে এক টিভি সাংবাদিকের মনে হয় যে এমন একটা উদ্ভট গল্পকারকে টিভি দর্শকদের দেখিয়ে বেশ একটা কৌতুকময় ব্যাপার সৃষ্টি করা যায়। সেই পরিকল্পনা মত সে একদিন সদলবলে আমার উপর জঙ্গী হামলা চালায়। বসিয়ে, দাঁড় করিয়ে হাঁটিয়ে ছুটিয়ে লিখিয়ে কথা বলিয়ে আরও নানান ভাবে নানা কসরত করিয়ে সেসব দৃশ্য ক্যামেরা বন্দী করে নিয়ে যায়। যথা সময়ে তা দুর দর্শনের জনপ্রিয় প্রোগ্রাম খাস খবরে দেখানো হয়। আমি কি করে জানবো যে এই সংবাদ আমার কপালে কী দুর্ভোগ নিয়ে আসছে।
যেদিন টিভির পর্দায় সংবাদটি পরিবেশন হয় সেদিন একবাড়িতে বসে সান্ধ্য সংবাদ দেখছিলেন এক অসাধারণ স্বামী আর তার রাগী স্ত্রী। স্বামী বেচারার চিরদিনকার অভ্যাস সূর্য ডুবে যাবার আগেই আকণ্ঠ মদে ডুবে যাওয়া। মদ্যপের ধর্ম হচ্ছে কারণ অকারণে অকথ্য বকবককরাধর্মানুসারে সে তা করে যাচ্ছিল। সংবাদের শুরুতেই টিভির পর্দায় ভেসে উঠল মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর সহাস্য মুখ। তিনি নন্দনে ফিল্ম ফেস্টিভালের উদ্বোধন করছেন মোমবাতি জ্বালিয়ে। আশা আছে যে কটি ফিল্ম প্রদর্শিত হবে জ্বালিয়ে দেবে। সে রকমই জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীকে দেখেই স্বামী ভদ্রলোক ভয়াবহ চিৎকার করে উঠলেন, চিনি চিনি একে চিনি। এর নাম বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। নাটক ফাটকও লেখে টেখে। আগে–
–তোমার সাথে এক ঠেকে মাল খেতো?
–আগে আমার কথা শোন।
–কোন কথা নয়। রাগী স্ত্রী স্বামীকে শাসন করে, ‘একদম চুপচাপ বসে থাকো। মাতলামো করোনা। খবরটা দেখতে দাও।’
পরের দৃশ্যে টিভির পর্দায় এলেন ইন্ডিয়ান ক্রিকেট টীমের অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি। সে শুধু ব্যাটে বল ঠুকতেই দক্ষ নয় তলোয়ার চালাতেও সিদ্ধ হস্ত। এবং এই ক্ষমতা অর্জন করেছেন এক বিশেষ কোম্পানীতে প্রস্তুত বিশেষ দ্রব্যর কারণে। সেটাই বললেন তিনি। স্ত্রীর নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে আবার গর্জে উঠল স্বামী, চিনি চিনি। একে চিনি। এর নাম মহারাজা। বেহালায় বাড়ি। এর সাথে আমি
–ডাংগুলি খেলেছিলে? এবার একটু জোরে স্বামীকে ধমক দেয় রাগী স্ত্রী–চুপ করবে? চুপ করে বসতে না পারলে রাস্তায় চলে যাও। মদখোরের জ্বালায় জীবনটা জ্বলে গেল। সারাদিন পরে সন্ধ্যেবেলায় একটু টিভি দেখারও জো নেই। খানিক গিলে এসে বকর বকর। ইচ্ছে করে ধাক্কা মেরে ঘর থেকে বার করে দিই, আর না হয় নিজে বার হয়ে যাই।
স্ত্রীর ধমক স্বামী ভদ্রলোকের মন মস্তিষ্কের উপর বিশেষ কোন প্রভাব ফেলতে পারল না। যতবারই টিভির পর্দায় কারও না কারও মুখ ভেসে ওঠে ততবার সে চিৎকার করে ওঠে–চিনি, চিনি একে। তার চেনবার তালিকা থেকে কবিসভা আলো করে বসে থাকা জয় গোস্বামী, হাজতে বসে থাকা শেখ বিনোদ কেউ বাদ গেল না। মন্ত্রী সান্ত্ৰী কবি কষাই খেলোয়াড় লাথখোর সাধারণ অসাধারণ এত মানুষকে চেনা সোজা কথা নয়। মদ সত্যিই মহান পানীয়। মুহূর্তে মানুষকে মহাজ্ঞানী করে দেয়। কিন্তু রাগী স্ত্রী স্বামীর এই প্রতিভাকে স্রেফ মাতালের প্রলাপ ভেবে কোন সম্মান তো দিলইনা উল্টে যাচ্ছেতাই ভাষায় অপমান করতে লাগল। রাগ শুধু অন্ধই নয় অজ্ঞও বটে। সম্ভবত রাগী মহিলা হবার কারণে তার এই মতিভ্রম, অধঃপতন।
এক সময় পর্দায় এল আমার ছবি। এবারও স্বামী যথারীতি গর্জে উঠল চিনি, চিনি একে। এ রোজ রাতে স্টেশনের বইয়ের দোকানের সামনে ধর্না দিয়ে বসে থাকে। একে তাকে বই গছাবার চেষ্টা করে।
এবার আর স্ত্রীর ধৈর্যের বাঁধ অটুট রইলো না। বালির বাঁধের মত ভেঙে গেল। তারপরই প্রচণ্ড হুংকার-কী! কী পেয়েছো তুমি এঁ। মোটে যে বারণ শুনছে না! তখন থেকে বলে যাচ্ছি কথা বোলো না। মুখটা বন্ধ রাখো। গু গোবর গিলে কোন কথা মানছোনা যে। তখন থেকে খালি চিনি চিনি। সব তোমার চেনা? সব্বাই চেনা? কেমন করে চেনো? সবাই বুঝি তোমার সাথে এক ঠেকে বসে মদ খায়? মাতাল বাচাল কোথাকার!
এ কথায় স্বামীর অহংবোধ আহত হয়। মদ জনিত কারণে আবেগাতুর হয়ে ওঠা অনুভূতিতে ধাক্কা লাগে। কী কী বললে তুমি? আমি মাতাল? আমি বাঁচাল? এত বড় কথা তুমি বলতে পারলে! জেনে রাখো, হা জেনে রাখো, যে কথা বারো বছরে জানতে পারোনি আজ জানিয়ে দিচ্ছি, আমি মদ খেতে পারি তা বলে মাতাল নই। আমার বাপ কোনদিন ই মিথ্যা কথা ইক্ বলেনি। আমিও কোনদিন ই বলিনা। আমি বলছি তো–বলিনা।ও কে চিনি। ওই লেখকটাকে। বিশ্বাস না করলে বললো, আমি প্রমাণ দেবো। বলছি তো প্রমাণ করে দেবো। চাও প্রমাণ? এক্ষুণি মালটাকে ধরে নিয়ে আসবো।
–ফের? তুমি ও কে ধরে নিয়ে আসবে?
–বললাম তো, ধরেই নিয়ে আসবো।
–চোপ। একদম চুপ। আর একটা কথা বললে ধাক্কা মেরে বাড়ির বাইরে।
–আমি বলছি তো।
–চোপ।
স্ত্রীর দাবড়ানি অসহ্য হয়ে উঠল ভদ্রলোকের। তবে রে। নিকুচি করেছে বাড়ির। থাকবো না বাড়িতে। চল্লাম। যদি লোকটাকে ধরে আনতে পারি সেদিন ফিরবো। তার আগে আসছি না। বলে সে ছুটলো রেল স্টেশনের দিকে। আমাকে ধরবে। বইয়ের দোকানে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো আমি এক বন্ধুর কাছে গেছি। ফিরবো রাত দশটা নাগাদ। যত রাতই হোক এই পথটাই আমার বাড়ি ফেরার পথ জেনে পরম নিশ্চিন্তে সে পাহারায় বসে গেল। তবে নির্জন নির্জলতায় নয়, মাঝে মাঝে সে বটগাছের ঘন অন্ধকারে মাসিমার মালের ঠেক থেকে চুক চুক চুমুক মেরে আসতে থাকল।
