হায় আমার পোড়া কপাল। মদ তো খেয়েছিলাম সেই আনন্দবাজার ‘আক্রমণে’র দিন। আজ তো জল ছাড়া আর কিছু খাইনি। তাহলে ইনি আমাকে মদখোর কেন ভাবছেন? আসলে আমার চেহারাটাই এমন যে, আমাকে নিয়ে কেউ ভালো কিছু ভাবতেই পারে না।
এইকদিন আগের কথা।নন্দনের সামনে থেকে গড়িয়ার মিনিবাসে চেপেছি। ছিলাম একেবারে পেছন দিকে। যাদবপুর থানা পার হবার পর ভিড় ঠেলে গেটের দিকে আগাবার সময় বিপত্তি। আমার কাঁধের সাইড ব্যাগটি আটকে গেল দুই ভদ্রলোকের চাপে। আমি এগিয়ে গেছি কিন্তু ব্যাগ বেঁধে রয়েছে। যেই সেই ব্যাগ ছাড়াবার জন্য হাত বাড়িয়েছি আর এক বিপত্তি। একটি বাইশ চব্বিশ বছরের ছেলে হাত চেপে ধরল আমার–প্যাকেটে হাত দিলেন কেন? আমি তাকে যত বোঝাতে চাই-যে পকেটমার নই, ব্যাগটা নিচ্ছিলাম। পাবলিকও খেপে যায়, পকেটমার নন তবে ব্যাগ (মানে মানি ব্যাগ আর কি) নিচ্ছেন কেন? সেদিন পকেট না মেরেও যা হেনস্তা হয়েছিলাম সে আর বলার নয়।
তবে এখন জোর প্রতিবাদ করি–আমি মদ খাইনি। আগে খেতাম, এখন ছেড়ে দিয়েছি।
সত্যিই এখন ছেড়ে দিয়েছি। যেদিন নিয়োগীজির মৃতদেহ দাহ করে ফিরে আসছিলাম আমার সাথে ছিলেন কাঁকেরের বাঙালী উকিল বিষ্ণুপ্ৰসাদ চক্রবর্তী। তিনি বলেছিলেন নিয়োগীজি আমাদের প্রিয় নেতা। তাকে হত্যা করেছে মদ্য মাফিয়ারা। উনি এক দিনে কুড়ি হাজার মজুরকে মদ্যবর্জনকরিয়েছিলেন। তারই অনুগামী হয়ে আমাদের মদ খাওয়া উচিৎনয়।ওনার প্রতি আমাদের এই হোক শ্রদ্ধাঞ্জলি-আর মদ স্পর্শ করব না। সেই দিন থেকে আমি আর ওই দ্রব্য মুখে তুলিনা।
কিন্তু দিব্যজ্যোতি বসু মানলেন না। বলে উঠলেন-আমি আপনার মুখে গন্ধ পেয়েছি। গন্ধ! ও হরি। ধনেপাতার কাঁচা লঙ্কা টমেটো আর রসুনের চাটনি দিয়ে ভাত খেয়ে এসেছি। শালা রসুন আমার মুখে গন্ধ হয়ে বদনাম ছড়াচ্ছে। দিব্যজ্যোতি বসুকে বলি সেই কথা র-সুন। রবীন্দ্রনাথ সুকান্ত নজরুল, এই তিন মহান মানুষের নামের অদ্যাক্ষরই তার বিভ্রান্তির কারণ। এরপর উনি মন দিয়ে শুনলেন আমার জীবন ও সাহিত্য চর্চার কথা। তারপর একদিন রিপোর্টার আর ক্যামেরা ম্যান পাঠালেন আমার বাসায়। দিন দুয়েক পরে এক সন্ধ্যায় প্রচারিত হল টিভির পর্দায় “বৃত্তের শেষ পর্ব” আর তার লেখকের কথা। তাতে লেখকের মানব জীবন আবাদ হল না, তবে বইমেলায় বইখানির ব্যাপক বিক্রি হল। স্টল তো ছিল না, খবরের কাগজ পেতে ঘাসের উপর ছড়িয়ে দিয়েছিলাম। তবু তিনদিনে প্রায় দুশো কপি উড়ে গিয়েছিল।
আমার কর্মস্থলে এতদিন তো গোপন করে রেখেছিলাম, আমি কে আমি কী। কিন্তু এখন আর কারো জানতে বাকি নেই। আমি আসলে এক লেখক। কী লিখি কেমন লিখি কেন লিখি–সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা আমাকে টিভির পর্দায় দেখা গেছে। তারা লেখক বলেছে।
মানুষের মতো বুদ্ধিমান যেমন জগতে কেউ নেই, বোকাও বোধ হয় দুটো পাওয়া যাবে না। বোকা বাক্সের পাল্লায় পড়ে মানুষ আরো বোকা হয়ে গেছে। তা না হলে এই সময়ের এক নামী গল্পকার, যার সাথে কতবার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, আমার বইখানাকে একবার হাতে ধরেও দেখেননি, সেই তিনি খাস খবরে আমাকে দেখার ফলে দাম দিয়ে দুখানা বই কিনে নিয়ে গেছেন। একখানা তিনি রাখবেন, একখানা বোনকে দেবেন।
বর্তমানে সমাজ জীবনে টিভির প্রভাব বড় সাংঘাতিক। শ্রবণ মাধ্যমের চেয়ে দৃশ্য মাধ্যম অধিক শক্তিশালী। এদের দাপটে সরকার বদলে যায়, এক অনামী অখ্যাত হয়ে যায় আলোচিত বিখ্যাত।
কাল পর্যন্ত আমি ছিলাম এক অতি সাধারণ মানুষ। টিভির কল্যাণে এখন লক্ষ লোক আমার মুখ চেনে–নাম জানে। দলে দলে তারা আমাকে দেখতে আসে আমার কর্মস্থলে। এতেই আমার সহকর্মীদের শরীর জ্বলে ঈর্ষায়, মন পোড়ে। লোকে বলে যার একবার নাম ফাটে তার….ফাটে। এবার এসে গেল আমার পেছন ফাটার কাল। শুরু হয়ে গেল ব্যঙ্গ বিদ্রূপ–টিকা টিপ্পনি।
তবে এই পর্বে সবটাই কী নিরানন্দ আর নিরাশার অন্ধকারাচ্ছন্ন কাল। না তা নয়, নব রসের অন্যতম–একটা হাস্যরসের ঘটনাও ঘটেছিল এই সময়ে। সেই করুণ আর হাস্যরসের বিষয় নিয়ে একটা গল্প লিখেছিলাম সবুজ আঙিনা পত্রিকার পাতায়। সেটা না বলে পারছি না। তারই কিছু অংশ তুলে দিলাম এখানে।
.
‘গত বইমেলার সময়ে আমার একখানা ছোট গল্পের বই অতিকষ্টে, ধার দেনা করে নিজেই ছাপিয়েছিলাম। পাঁচশো কপির খান পাঁচেক মাত্র বিক্রী হয়, তাও বাকিতে। কিছু বই নিজে ব্যাগে বয়ে পৌঁছে দিয়েছিলাম বিভিন্ন পত্র পত্রিকার দপ্তরে। সাথে সকাতর অনুরোধ–দাদা, দয়া করে রিভিয়্যু করবেন।’ কিন্তু কেউ কথা রাখেনি। বই পৌঁছে দিয়েছিলাম বিশিষ্ট সাহিত্যিকদের ঠিকানায়। বলেছিলাম পড়ে কেমন হয়েছে যদি দু-লাইন লিখে দেন শ্রম সার্থক হয়েছে বলে মনে করবো। কেউ লিখে দেয়নি। লিখতে হলে পড়তে হবে। সেই ভয়ে সবাই পিছিয়ে গেছে।
বন্ধু-বান্ধব যারা আমার পিঠ চাপড়ে উৎসাহ দিয়েছিল তাদের কাছে জানতে চাই, কেমন হয়েছে আমার গল্পগুলো? উত্তর পাইনা ভাই, এখনও সময় করে উঠতে পারিনি। পড়বো পড়বো। অত তাড়া দিও না। সময় পেলে ঠিক পড়ে নেবো। ওই একই প্রশ্ন করেছিলাম এক প্রখ্যাত পুস্তক সমালোচককে, তিনি আমাকে এইমারেন তো সেই মারেন। অভিযোগ, তার অমূল্য সময় আমার ওই অখাদ্য বইয়ের জন্য বরবাদ করে দিয়েছি।
