বইটা পড়ে কেউ কেউ বলল-মর্মান্তিক, কেউ নাক সিঁটকালো না খাওয়া মানুষের পাঁচালী বলে। কেউ কেউ তারিফ করল লেখকের লেখার মুনশিয়ানার। পুস্তক সমালোচক সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় অনীক’পত্রিকার জুন ২০০০ সংখ্যায় লিখলেন–মনোরঞ্জন গল্প লিখেছেন। আসলে তিনি কোন না কোনভাবে নিজের জীবন কাহিনীই বলে গেছেন। এই সংকলনের প্রতিটি রচনায় মিশে আছে মনোরঞ্জনের জীবন–তার যাপিত জীবনের স্বেদরক্ত। তার প্রতিটি গল্পেই পাওয়া যাবে একটি আখ্যান–বেঁচে থাকার সংগ্রাম।দরদী মন নিয়ে তিনি অপরের সংগ্রামের কথা লিখছেন
, লিখছেন সেই সংগ্রামের কথা, যার ভিতর দিয়ে ক্ষত বিক্ষত হতে হতে এগিয়ে চলেছে তার নিজেরই জীবন। এ রকম গল্প পড়া তাই এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা। এরকম গল্প পড়ার সুযোগ আমরা এর আগে খুবই কম পেয়েছি। যে ধরনের আখ্যান পাঠে আমরা অভ্যস্ত মনোরঞ্জন তাকেই লেখেন বিপরীত দিক থেকে।…..সে তো হল, যেটা আসল কাজ, কাজের কাজ তার তো কিছু হল না।বই যে মোটেই বিক্রি হয় না। এটাও ঠিক যে আমার বই তাক্-এ সাজিয়ে রাখার মত সুন্দর মোটেই নয়।
সেটা ২০০০ সাল। আর কিছুদিন পরে শুরু হব বইমেলা। নিজে আমার কোন স্টল দিতে পারার মত আর্থিক সঙ্গতি নেই। বিজ্ঞাপনে ব্যয় করি তা-ও ক্ষমতার বাইরে। কীভাবে বইমেলাকে ব্যবহার করি! বইয়ের এত বড় বাজার আমার হাত ছাড়া হয়ে যাবে। ভাবি আর ভাবি, কিন্তু কোন কুল পাইনা।
এটা বিজ্ঞাপনের যুগ। এই সময় প্রচারের জোরে অনেক অচল মালও বাজারে চলে যায়। আর প্রচারের অভাবে বহু প্রতিভা শেষ হয়ে যায় লোকচক্ষুর আড়ালে। যদি একটা ভালো প্রচার পাওয়া যেত, এই বইমেলা আমার বড় কাজে আসত। কী যে করি!
আমার মাথায় একটা পোকা আছে। সেটা মাঝেমাঝে নড়ে ওঠে। যখন নড়ে ওঠে আমি যে কী করে বসব তা আমি নিজেও জানি না। সে নড়লে অসম্ভব-কঠিন, এই শব্দগুলোকে আমি মোটেই সমীহ বা সম্মান দিতে পারি না। মাথায় এখন সেই পোকা নড়ছে, অসম্ভবকে সম্ভব করতে হবে। যে ভাবে তোক নিজেকে প্রচারের আলোয় নিয়ে গিয়ে ফেলতে হবে। না হলে বই বিক্রি হবে না। পনের হাজার টাকা আটকে গেছে, তোলা যাবে না। মুদি দোকানে সব টাকা দিইনি। তার ধার শোধ না করলে বাকি দেওয়া বন্ধ করে দেবে। না খেয়ে মরব সবাই।
তখন টিভি-র অসম্ভব জনপ্রিয় প্রোগ্রাম ছিল-খাস খবর। সন্ধে ছটায় সেই প্রোগ্রাম শুরু হলে শহর কলকাতার পথঘাট প্রায় জনশূন্য হয়ে যেত। যে যেখানে থাকুক ছুটে গিয়ে টিভির সামনে বসে পড়ত। খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারলাম–এদের অফিস নবীনা সিনেমা হলের দোতলায়। তারপর আর কী! একদিন হামলা করে দিলাম আত্মঘাতী জঙ্গির মত খাস খবরের অফিসে। ঠিক এই রকম হামলা আর একবার করেছিলাম ১৯৮৮ সালে আনন্দবাজার পত্রিকার অফিসে। তখন “কলকাতার কড়চা” বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন নিখিল সরকার যার আর এক নাম শ্রীপান্থ।
একগলা চোলাই গিলে সোজা গিয়ে পৌঁছেছিলাম শ্রীপাস্থের সামনে। সেদিনের আনন্দবাজার খানা ওনার সামনে মেলে ধরে জিজ্ঞাসা করেছিলাম–এতে কে একজন বাস কন্ডাক্টার বাঁশি বাজায় তার কথা আছে, একজন তরকারি বেচে, তবলা বাজায়, তার কথা আছে, একজন ড্রাইভারি করে, অভিনয় করে, তারও কথা আছে। কিন্তু আমার কথা নেই, কেন?
কতবড় সম্মানীয় মানুষ। উনি কী কোনদিন ভাবতে পেরেছিলেন কেউ এসে ওনার সাথে এইভাবে কথা বলবে। তিনি অবাক হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন–তুমি কে? আমার চটের ব্যাগ আমি উবুর করে দিয়েছিলাম ওনার সামনে। সাত বছর ধরে যা লিখছি সব রক্ষিত ছিল এই ব্যাগে–আমি এক রিকশাঅলা, আর এই আমার লেখা। এই যোগ্যতা আমি অর্জন করেছি আমার নিজের চেষ্টায়। তবু আমার কথা কোনদিন আনন্দবাজার লেখেনি। কেন? এর ফলে ওই বছরই ২৮শে মার্চ বাংলা ভাষায় সর্বাধিক প্রচারিত পত্রিকার পাতায় লেখা হয় আমার কথা।
সত্যি কথা এটাই যে-কুয়ো কখনও তৃষ্ণার্তের কাছে যায় না। যে তৃষ্ণার্ত তাকেই আসতে হবে কুয়োর কাছে। আর মহাসত্যি এটাই যে মদঅলা অন্ধকারে বসে থাকলেও মদখোর তাকে খুঁজে বের করবে, দুধঅলাকে তার দুধভান্ড নিয়ে যেতে হবে মানুষের দরজায়।
যারা নিজের মুখে নিজের গুণ গায়-প্রচার বিমুখ যোগেনদা তাদের সহ্য করতে পারে না। বলে—’মানুষের এক বিচ্ছিরি প্রবণতা, সে নিজের ঢাক নিজে বাজায়।’ উনি তো আমার মত জীবন যাপন করেননি। আমিও নই তার মতন। তাহলে তার যে জীবন দর্শন তা আমি গ্রহণ করব কী করে? আমি জানি, আমার একটা ছোট্ট ছেঁড়াফাটা ঢাক আছে। বড় এবং সুন্দর ঢাক ফেলে আমার সে ঢাক বাজাতে কেউ আগ্রহী হবে না। তাই আমার নিজের ঢাক নিজেকেই বাজাতে হবে। কথায় তো বলে ভাগ্যবানের ঢাক ভগবান বাজায়। ভাগ্যহীনদের ঢাক নিজেই বয়ে নিয়ে যেতে হয়, বাজাতে হয়। আমি তো আমি–এমন যে বার্নাডশ, একদিন সে তার নিজের বই বিক্রি করার জন্য কত রকম না ছল চাতুরির আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। আর আমি তো এক মদন।
এখন যে খোঁজ-খবর খ্যাত টাক মাথার দিব্যজ্যোতি বসু–তিনিই তখন ছিলেন একমাথা কালো চুল নিয়ে খাস খবরের প্রধান। তিন চার দিনের অক্লান্ত চেষ্টার পর অবশেষে একদিন পৌঁছতে পারা গেল ওনার টেবিলের সামনে। কিন্তু একী! যেই আমি কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছি অমনি উনি আমাকে থামিয়ে দিলেন–আপনি আর একদিন আসুন। সেদিন মদ খাবেন না। তখন আপনার যা বলার সব শুনব।
