এবার ছয় মাস নয়, মাইনে এসে গেল পাঁচ মাসেই। ভাগ্য ভালো ছিল হয়ত। সেই মাইনে থেকে সাত হাজার তুলে দিলাম বিশ্বাস বাবুর হাতে। আগের পাঁচ এই সাত সব মিলে বারো হল। হিসেব কষে বুঝিয়ে দিলেন বিশ্বাস বাবু–আরো হাজার তিনেক টাকা লাগবে বই বের করতে। কম্পোজ প্রুফ রিডিং প্রিন্টিং বাঁধাই সব এখানে হবে। শুধু কভারটা হবে না। সেটা আমাকে অন্য জায়গা থেকে ছেপে এনে দিতে হবে।
মাইনের সাত হাজার এখানে দিয়ে যে টাকা কটা ছিল কোন মতে মুদির দেনা অল্পকিছু শোধ দেওয়া গেল। কিন্তু তারপরেও যে আরো টাকা লাগবে। বাধ্য হয়ে আমার সেই সোদপুরের যোগেনদার কাছে হাত পাতলাম। উনি দিলেন দুহাজার। অন্য এক দুবন্ধু দুশো পাঁচশো করে দিয়ে পূর্ণ করে দিল আমার ঝুলি। ‘অদল বদল’ পত্রিকার পূজা সংখ্যায় আমার একটা গল্প ‘একটি দেবী স্থানের পত্তন কাহিনী’ প্রকাশ করেছিল। তাতে একটা ছোট পুরস্কার পাই অল্প কিছু টাকা-আর একখানা মানপত্র।
সে যাইহোক সেই কভার ছাপিয়ে আনবার প্রয়োজনে প্রেসে প্রেসে চক্কর দিতে দিতে জ্ঞান-চক্ষু উন্মেলিত হয়ে গেল আমার। দেখলাম আমি শুধু বোকাই নয় আস্ত একটা বোকা পাঠা। যে পাঠাকে কোন পুজো ছাড়াই হাড়িকাঠে পেলে ইচ্ছে মতো কেটেছে জনৈক বিশ্বাস।
যে কাগজের রীমের দাম অন্য জায়গায় তিন হাজার, ওরা দাম ধরেছে সাড়ে চার হাজার টাকা। ষোল-পাতায় এক ফর্মা, যার কম্পোজের রেট তিনশো টাকা ফর্মা। ওরা তার জন্য নিয়েছে সাড়ে আটশো করে। যে বই বাঁধাইয়ের দাম বাইরে প্রতিপিস দু টাকা ওরা তার জন্য নিয়েছে পাঁচ টাকা পিস।
তখন হিসেব করে দেখি একশো চুরাশি পৃষ্ঠার চারশো আটানব্বই খানা বই ছাপাতে এরা যে পনের ষোল হাজার টাকা নিয়েছে ওই টাকায় পুরো একটা সংস্করণ–এগারো শশা বই ছাপা হয়ে যেত। কায়দায় ফেলে ওরা আমাকে ইচ্ছামত জবাই করে দিয়েছে।
সবচেয়ে বাজে কাগজ, সবচেয়ে বাজে বাঁধাই, বিচ্ছিরি ছাপা।তবু ২০০০ সালের বই মেলায় প্রকাশিত হল আমার প্রথম বই ‘বৃত্তের শেষ পর্ব’।
১১. বৃত্তের শেষ পর্ব
বৃত্তের শেষ পর্ব এটি একটি ব্যাকরণ বহির্ভূত নাম। বৃত্তের কোন শেষ বা শুরু হয় না। বহু বুদ্ধিজীবী বন্ধুদের ব্যাখার পরেও আমি ওই নামটা এই জন্যে বাছাই করেছিলাম এই কথা ভেবে যে–জন্ম থেকে মৃত্যু এটা তো একটা বৃত্ত। যার জন্ম হয়েছে অথচ মৃত্যু হয়নি সে তো অসম্পূর্ণ। জন্মে যার শুরু মৃত্যুতে তার শেষ।
কিন্তু সত্যিই শেষ কী? না মৃত্যুর সাথে জীবনের সব শেষ হয়ে যায় না। তার কৃতকর্ম থাকে। খ্যাতি অখ্যাতি যশ অপযশ সব পড়ে থাকে। আর কিছু যদি নাও বা থাকে মৃত মানুষের শরীর পড়ে থাকে। দাহ হলে ছাই পড়ে থাকে। আত্মীয় স্বজনদের পরলৌকিক ক্রিয়াকর্ম পড়ে থাকে।
সেটাই তো আর এক পর্ব। বৃত্তের শেষ পর্ব। একটা জীবন-যার শুরু হয়েছিলনিরক্ষর মা-বাবার নিরক্ষর সন্তান হিসাবে। নিরক্ষর থেকে সাক্ষর হয়ে ওঠা এটা একটা বৃত্ত। এখন সেই সাক্ষরতাকে সৃজনশীলতার সঠিক দিশায় এগিয়ে নিয়ে চলা–আমার ধারণায়, সেটাই বৃত্তের অন্তিম পর্ব।
বৃত্তের শেষ পর্ব তো আসলে বৃত্ত ভেঙে দেবারও গল্প। যা লেখা হয়েছে প্রচলিত “বৃত্তের” বাইরের এক ক্ষুব্ধ ক্ষুধার্ত মানুষের কলম থেকে তার নিজের ভাষায় নিজের ভাবনায়। এতকাল উঁচু তলার মানুষেরা নিচুতলার মানুষকে নিয়ে সাহিত্য করতেন। যার শুরু হয়েছিল সেই শৈলজানন্দের ‘কয়লা কুঠি’ গল্প দিয়ে। তারপর কল্লোল যুগের কলমকাররা তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন এক বিশেষ ভাবনায় জারিত হয়ে। বৃত্তের শেষ পর্বের লেখক সেই ধারা প্রবাহেরই আর এক ঢেউ। তবে এর বিশেষত্ব বলা যায় বিশেষ বিশেষত্ব, এই বইয়ের লেখক নিচুতলা থেকে উঁচুতলার মানুষগুলোকে দেখার এবং দেখানোর চেষ্টা করেছে।
বৃত্তের শেষ পর্বে সর্বমোট বাইশটা গল্প ছিল। এর প্রথম গল্প ‘খাঁচার পাখিরাও গান গায়। এটি এক জেলবন্দীর আত্মকথন। সে অনুভব করে যে আসল সুখ যদি কোথাও থাকে তবে তা জেলখানাতেই আছে। বাইরে না খেয়ে মরে গেলেও কেউ ফিরেও তাকাবে না, অথচ এখানে দুবেলা গরম খাবার পাওয়া যায়। এখানে থাকবার জন্যে মাথার ওপর পাকা ছাদ আছে, অসুখ হলে চিকিৎসা মেলে। বাইরে যা তার মত গরিব মানুষের ভাগ্যে সহজে জোটে না।
পরের গল্প-নেশা। এ নেশা মদের নেশা নয়–ভাতের নেশা। এক অসুস্থ এবং ক্ষুধার্ত রিকশা চালক সওয়ারি নিয়ে যেতে যেতে মাথা ঘুরে পথের উপর পড়ে যায়। পথচলা মানুষ মনে করে রিকশাঅলা নেশা করেছে তাই তার পতন ও মূচ্ছ। কেউ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার কথা ভাবে না। শেষ পর্যন্ত পথে পড়ে মরে যায় রিকশা চালক।
তৃতীয় গল্প-স্বাধীনতা–একজন মুটে যে রেশন দোকানের মোট বয়ে যা মজুরি পায় তা দিয়ে কোনক্রমে পেট চালায়। একদিন সে মোট বয়ে চাল কিনে ঘরে নিয়ে যাবার আশায় রেশন দোকানে এসে দেখতে পায় দোকানে তালাবন্ধ। কেন না আজ পনেরই আগস্ট–স্বাধীনতা দিবস।
এই বইয়ের আর একটা গল্প ভাতের রাজা। একজন খেতে দিতে না পেরে রাগে দুঃখে তার ক্ষুধার্ত ছেলেকে মেরে ফেলে শেষে নিজে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেঁচে যায়। এরপর সেই কেসে বিচারে তার দশ বছর জেল হয়। জেলে এসে কাজ পায় ভাত ঘরের পাহারায়। পাঁচ সাত হাজার লোকের খাদ্য, পাহাড় প্রমাণ ভাতের স্তূপের সামনে বসে কেঁদে ওঠে সেবাপকে তোরা ভাত না পেয়ে মরে গেলি। দ্যাখ আজ আমার কাছে কতো ভাত।
