–সে হতো। বলি আমি-রুমঝুম মাঠে পার্টির লোকেরা চার হাজার টাকায় দুকাঠা করে প্লট দিচ্ছে খাস জমিতে। একটা প্লট নিলে আর ভাড়া ঘরে থাকতে হতো না। কিন্তু ওর যে সে সব ইচ্ছা হয়নি। বই ছাপার বাই উঠেছে।
–তবে টাকা জোগাড় করুক।
এ প্রসঙ্গে দাদার সব কথা বলা হয়ে গেছে। হাতের পেন দুবার টেবিলে ঠুকে বলেন, চা খাবি? খা একটু চা। ওই মোড়ের কাছে দোকানে গিয়ে দুটো লাল চা নিয়ে আয়। তুই কী বিস্কুট খাবি? খেলে একটা আনিস।
চা খেয়ে আমার দিতে হাত বাড়ান তিনি–দে একটু খইনি দে। খইনি খেয়ে বলেন–তোর কাজ কর্ম কেমন চলছে? মন দিয়ে রান্না বান্নাটা করিস। রোড রিপোর্ট পাচ্ছি খাবার নিয়ে। ভালো হচ্ছে না কেন? কী প্রবলেম?
এই সব শুনতে এখানে আসিনি। আমার যা কাজ একাজে কাউকে সন্তুষ্ট করা যায় না। যেমন পারে না বাসের চালক কন্ডাক্টার। জোরে চালালে দোষ, ধীরে চালালে আরো দোষ। থামালে দোষ না থামালে আরো দোষ।
আবার কাজটাও এই রকম। কেউ বলবে নুন কম কেউ বলবে নুন বেশি। কেউ বলবে ঝাল কম কেউ বলবে ঝাল বেশি। কেউ বলবে ভাত গলে গেছে কেউ বলবে শক্ত আছে। মোট কথা সুনাম পাবার কোন পথ নেই। একশো পরিবার থেকে আসা একশো রকম মানুষের একশো রকম রান্না খাওয়া জিভ। সবার মন জয় করা আমি কেন, কেউই পারবে না। সে বলে আর কী হবে।
আমি বলতে এবং শুনতে চাই আমার বইখানা ছাপা হবে কী হবে না।
দাদা একটু থামতেই সেই ফাঁকে আমার কথা গুঁজে দেই–কী হবে! তাহলে আমার বইটা কী হবে না?
–হবে। বিশ্বাস বাবু তো বলেই দিয়েছে, টাকা দিলেই হবে। কী করব বল, লোকটা মহা ইয়ে। কারো কথা মানে না। সেটা যেন তার পৈত্রিক সম্পত্তি। একটা কথা বললে যদি সেটা না রাখে আর বলতে ইচ্ছা করে, তুই-ই বল। আমি তোকে পাঠিয়েছি সে তো জানে, তবু এই রকম করছে। কোন মানে হয়?
একটু দম নিয়ে আবার বলেন তিনি–আমি বলি কী, সেই তো তুই টাকা দিবি। তাহলে ফালতু দেরি করে কী হবে, আগেই দিয়ে দে।
–পাবো কোথায়?
–জোগাড় কর। ধারনে কারো কাছ থেকে।
যদি কেউ দিতে পারে–সে আপনি। আপনি দেন না কিছু টাকা ধার দেবেন?
আবার হাসেন তিনি—বই বের হবে তার? ওহঃ তোর না, রিকশাঅলা মদনের। আর গচ্চা যাবে আমার? বাহঃ বেশ বলেছিস তো। একটু থেমে আমার দিকে তাকিয়ে ফের বলেন তিনি আমাকে তোর কী বলে মনে হয়? বোকা? মাথা মোটা? না, গৌরি সেন? বল বল, আমি কিছু মনে করব না। বলে ফ্যাল।
বলি–আমি তো আপনাকে এই সব বলিনি। খালি কিছু ধারের কথা বলেছি। আগে আপনার সাথে যে রকম কথা হয়েছিল সেই রকম হলে আর তো ধারের কথা বলতেই হত না। আমার মনে হয় আপনি একবার বিশ্বাস বাবুকে বলে দিলে সব ঝামেলা মিটে যাবে। বিশ্বাস বাবু আপনার কথা মেনে নেবেন।
এবার দাদা রেগে গেলেন-কী তখন থেকে প্যানর কচ্ছিস! বিশ্বাসকে তুই আমার চেয়ে বেশি চিনিস? সে একবার বলেছে–টাকা ছাড়া হবে না তার মানে-হবে না। আমি কেন ব্রহ্ম বিষ্ণু মহেশ্বর গিয়ে বললেও হবে না। কথা না বলে, গিয়ে টাকার ব্যবস্থা কর। আমার কাছে নেই। এক দুশো হলে দেখতাম। এখন তুই যা, আমাকে আমার কাজ করতে দে।
গলায় আমার একরাশ হতাশা এসে জমা হয়। বলি–বইটা তাহলে আর হবে না। কী আর করব, যা হয়েছে ওই পর্যন্ত থাক। যায় যাক আমার পাঁচ হাজার টাকা গচ্চা। অন্য কোন উপায় নেই।
এখন মনে হয় বড় ভুল হয়ে গেছে। এর চেয়ে রুমঝুম মাঠে চার হাজার টাকায় দুকাঠার একটা প্লট নিলে অনেক ভালো করতাম। স্কুল থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে গড়ে উঠেছে নতুন জনবসতি। শত শত লোক খাস জমিতে বাড়ি বানাচ্ছে। বইয়ের পিছনে যদি টাকা না ঢেলে ওখানে ঢালতাম আর ভাড়া ঘরে চৌকির নিচে কুকুর কুণ্ডলি পাকিয়ে শুতে হতো না। সেদ্ধ হতে হতো না গরমে। পাখা একটা আছে, কিন্তু তার হাওয়া চৌকি ভেদ করে নিচে কী করে পৌঁছবে।
সারাদিন উনুনের সামনে তারপর গরমে রাতের পর রাত ঘুম নেই, একটু ভুল না করলে ওই কষ্ট থেকে পরিত্রাণ পেয়ে যেতাম। আক্ষেপে মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করে আমার।
কিন্তু আক্ষেপের আমার তখন সবে তো শুরু। যে সাপ একবার ব্যাঙের পা ধরে তাকে পুরোপুরি গিলে নেয়। তার আগে নিস্তার মেলে না। আমার ওরা পা ধরেছে, কেন নিস্তার দেবে?
আবার সেই হাসি ফিরে এসেছে দাদার মুখে। আগের রাগ আর নেই। হেসে হেসে বলে–এই জন্য লোকে বলে ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না। তোর আগে ভেবে পথে নামা উচিৎ ছিল। পরের জন্য ফালতু ফেঁসে গেছিস।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ফের বলে-তুই আসার একটু আগে বিশ্বাস বাবু আমাকে ফোন করে সব বলেছে। সাড়ে বারো হাজার টাকার কাজ হয়ে গেছে। এখন বই নিস আর না নিস, ছাপাস আর না ছাপাস সে তোর ব্যাপার। কিন্তু যে টাকার কাজ হয়ে গেছে সেইটুকু টাকা তো তোর দিতেই হবে। এখন দিতে না পারিস, কোন কথা নেই। যখন বেতন পাবিকাটিয়ে দিস! না দিলে ওরা স্কুলে জানাবে, তোর রেকর্ড খারাপ হয়ে যাবে। টাকা তো না দিয়ে পার পাবি না। মাঝখান থেকে একটা ব্যাড রেকর্ড।
আমাকে বিষয়টা নিয়ে ভেবে দেখার জন্য সময় দেওয়া হয়েছিল দুমাস। কারণ হিসেব মতো আমার মাইনে পেতে দুমাস দেরি আছে। এরপর বিশ্বাস বাবু স্কুলে জানাবে। তাই সিদ্ধান্ত নিই, শুধু সাড়ে সাত কেন–আর যা দু-এক হাজার লাগবে সেটাও দিয়ে বইটা বানিয়েই নেব। তাতে আর কিছু না হোক আমার একটা বই তো হবে।
