আমি সেদিন এসে দেখা করলাম প্রেসের ম্যানেজার বিশ্বাসবাবুর সাথে। লম্বা রোগা ফাঁসফেসে গলায় কথা বলা সত্তর বাহাত্তর বছর বয়সের বুড়ো, তিনি আমার মুখে সব কথা শুনে চশমার নিচে চোখ কুঁচকে হেসে বলেন–তাহলে আর কী, আমার তো আর কিছুই বলার মতো নেই। তুমি তো একেবারে আসল লোকের অর্ডার নিয়ে এসেছে। যাও পাণ্ডুলিপি আর পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে এসো। পাঁচ হাজার আগাম দেবে বলেছো তো? সেটা জমা করে দাও, আমরা কাজ শুরু করে দিই।
একটু রেটটা বলবেন। পাঁচশো বইয়ে কী রকম কী পড়বে।
বলেন তিনি–আমার উপর বিশ্বাস আছে কী? বিশ্বাস রেখো তোমার কাছ থেকে এক টাকাও বেশী নেব না। পারলে দু টাকা কম নেব। কেন বেশী নেব? নিয়ে আমার কী লাভ? এই টাকা আমার পকেটে তো আর যাবে না। তবে? তা ছাড়া তুমি তো আমাদের লোক। ঠিক কিনা। তা, কবে জমা দিচ্ছ টাকা, পাণ্ডুলিপি?
পাণ্ডুলিপি ও পাঁচ হাজার টাকা সেদিনই জমা করে দিলাম। খুঁজে পেতে বাইশটা গল্পই পাওয়া গেছে। কথা দিলেন বিশ্বাস বাবু, দুর্গাপুজার আগেই বই পেয়ে যাবে। পূজার তখনও তিন চার মাস বাকি।
দুর্গাপূজা বাঙালি জীবনের সবচেয়ে বড় উৎসব। যারা চাকরি করে এই সময় তাদের হাতে খরচ করার মতো বাড়তি কিছু টাকা থাকে। বোনাস পায় বেতন পায়। এই সময় প্রচুর পত্র পত্রিকা শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশ হয়। বিক্রিও হয়।
বর্তমানে এই শহরে আমার বিস্তর চেনা জানা লোক। প্রচুর লোক আমাকে ভালোবাসে। তারা এই সময়ে অবশ্যই আমার বই কিনবে। আমি বই নিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ালে কেউ না বলবে না। আর নিজের বই নিজে বেচা এটা কোন অন্যায় নয়। লজ্জার বিষয়ও নয়। বামপন্থী কবি বীরেন চট্টোপাধ্যায়ও নিজের বই নিজে বেচতেন। বেচে থাকেন আরো অনেকেই।
পুজোর সময় আমার স্কুলের সব বাচ্চা বাড়ি চলে যায়। প্রায় কুড়ি বাইশ দিন রান্না করতে হবে না। ফলে ঘুরে ঘুরে বই বেচতে পারব। বড় আশায় বুক বেঁধে বসে থাকি আমি। কিন্তু কোথায় কী! দিন দুই তিনেক ধরে মাত্র কয়েক পাতা কম্পোজ করে সেই যে ফেলে রেখে দিল পাণ্ডুলিপিতে আর হাত পড়ল না। একটা বড় কাজ এসে গেছে, সেই কাজ নিয়ে মেতে উঠল পুরো প্রেসকর্মী। দেখতে দেখতে দুর্গাপুজো পার হয়ে গেল।
রোজ খোঁজ নিই কবে আমার কাজটা শুরু হবে। বলেন বিশ্বাস বাবু, আর কোন কাজ হাতে নেব না। বড় কাজটা শেষ হয়ে গেলেই তোমারটা ধরব। ভাইফেঁটার পর ধরলেন “আমারটা”। কিন্তু দিন দশেক ধরে আবার আমারটা ছেড়ে দিয়ে অন্য একটা ধরে নিলেন।
একদিন অধৈর্য হয়ে বলি-কী হল বিশ্বাস বাবু? বলেছিলেন পুজোর মধ্যেই বইটা দিয়ে দেবেন। পুজো তো গেল। বইমেলা আসছে, তার আগে ছাপিয়ে দিন।
বিশ্বাস বাবু চশমার নিচে সেই চোখ কুঁচকে হাসলেন। খোঁচা খোঁচা মুখ ভর্তি দাড়িতে খেলে গেল ধূর্ত ঢেউ–তুমিও দাও।
–কী?
–টাকা।
–পাঁচ হাজার তো দিয়েছি।
সে টাকার কাজ তো পাঁচ দিনে হয়ে গেছে। টাকা না পেলে কাজ হবে কী করে?কর্মচারীদের বেতন, ইলেকট্রিক, ফোন, কত খরচা। সব দায় তো আমার। আমি হিসেব করে দেখেছি এখন পর্যন্ত তোমার যা কাজ হয়েছে সাড়ে বারো হাজার। পাঁচ বাদ গেলে থাকে সাড়ে সাত। এত তো বাকি রাখা আমার পক্ষে অসম্ভব।
বলি–আমার তো দাদার সাথে এই রকম কথা হয়েছিল, প্রথমে পাঁচ হাজার দেব। এরপর বাকিটা দেব বই হয়ে যাবার পরে–ধীরে ধীরে।
–এই রকম কথা হয়েছিল বুঝি!
–আপনাকে বলেনি?
–না তো! তোমার সাথে কী কথা হয়েছে তা আমি জানি না। আমি আমার কথা বললাম। প্রেসটা তো আমি চালাই। আমার এক কথা, টাকা যদি পাই কাজ এগুবে। না পেলে আর এগুবে না। যেমনকে তেমন পড়ে থাকবে। পুজো গেছে, বই মেলাও যাবে।
আমি এখন কী করব। আমার কাছে তো টাকা নেই আর। কবে মাইনে হবে তা-ও তো কিছু জানি না।
–তুমি এক কাজ করো। পরামর্শ দেন বিশ্বাস বাবু–দাদার কাছে চলে যাও। গিয়ে তোমার সমস্যাটা বুঝিয়ে বলো। বলা যায় না হয়ত উনি নিজের পকেট থেকে ওই পরিমাণ টাকা ধারও দিয়ে দিতে পারেন।
বিশ্বাসবাবু কথা শেষ করে অন্যদিকে চলে গেলেন। আমি সেখানে বসে আর কী করি, গেলাম দাদার কাছে। বললাম, একী হল দাদা। যেমন কথা ছিল আমি তো তেমনই করেছি। পাঁচ হাজার দিয়েছি। এখন আর টাকা কোথায় পাব? এদিকে বিশ্বাস বাবু বলছেন টাকা না দিলে হবে না। আপনি একটু বলে দিন, বইটা ছেপে দিক। আমি তো আর কাজ ছেড়ে চলে যাব না। যা বাকি থাকবে দিয়ে দেব ধীরে ধীরে।
হাসেন দাদা–বিশ্বাস বাবু ভীষণ ত্যাড়া লোক। কারো কথা মানে না। অনিল বিশ্বাসের জাত তো, যখন বলেছে টাকা না পেলে কাজ করবে না, আমি কেন, আলিমুদ্দিন কলিমুদ্দিন বললেও করবে না।
–তাহলে আমি এখন কী করি। আমার কাছে এক টাকাও নেই।
–শিশুর মতো সরলয়োস্থবলেন গঙ্গা-তুই এত উতলা হচ্ছিস কেন। যার বই তাকে বল। বই ছাপা হচ্ছে তার। পুরস্কার পাবে সে, টাকা পাবে সে, নাম হবে তার। ফালতু তুই হেঁদিয়ে মরছিস। তাকে বল টাকা না পেলে প্রেস বই ছাপছে না, দেখ কী করে।
–তার কাছে আর নেই। যা ছিল সব দিয়ে দিয়েছে। খুবই গরিব তো। রিকশা চালায়, ভাড়া বাসায় থাকে রিকশাটাও ভাড়ার।
হেসে হেসে বলেন দাদা–গরিবের এসব ঘোড়া রোগ কেন! এই সব ছাইপাশ না ছেপে একটা রিকশা কিনে নিত। পাঁচ হাজারে নতুন রিকশা হয়ে যেত না একখানা?
