ওই নিমন্ত্রিত মুসলমানদের একজনের একটা রেডিও সেট ছিল সে সেটা সর্বক্ষণ সাথে নিয়ে ঘুরত। ওটা সে এখানে ফেলে চলে গিয়েছিল। সুইচ অফ থাকায় তার অস্তিত্ব কেউ টের পায়নি। কিছুদূর পথ পার হয়ে গিয়ে রেডিও ফেলে যাবার বিষয়টা মনে পড়ে যাওয়ায় সেটা নিতে তারা ফিরে এসেছিল। কিন্তু ডাক্তারের গিন্নির বিষবাক্য আর গোবর জলের বন্যা দেখে তারা আর বাড়ির ভিতর ঢুকতে পারেনি। পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল পুকুর পাড়ের রাস্তার উপর।
বাড়ির কেউ তাদের দেখতে পায়নি। পুকুরে জল আনতে গিয়ে দেখে ফেলেছিলাম আমি। মৃদুজোছনার আবছা আলো অন্ধকারে অপমানে পাথর হয়ে যাওয়া সেই মানুষগুলোর দুচোখে যেন জ্বলছিল সর্বনাশা আগুন। যে আগুনে ঘর পোড়ে শান্তি সম্প্রীতি পোড়ে সমাজ পোড়ে দেশ পোড়ে।
কেন জানিনা সেদিন আমার অপরিণত কিশোর মনে ছায়া ফেলেছিল একটা অশুভ আশংকা, ওরা এই অপমান হজম করতে পারবে না। কোন একদিন পেটের মধ্যে যাওয়া পায়েস বমি হয়ে বেড়িয়ে আসবে। সেই ঘৃণার স্রোতে ভেসে যাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সকল প্রয়াস। কারণ ঘৃণা তো ঘৃণারই জন্ম দেয়, যেমন ভালোবাসা জন্ম দেয় ভালোবাসার। যে ঘৃণা নিয়ে আজ এরা ফিরে যাচ্ছে, কাল দ্বিগুণ করে ফিরিয়ে দিতে আসবে।
শত শত বছর ধরে এই অভাগা দেশে একদল মানুষ আর একদল মানুষকে ধর্মের নামে বর্ণের নামে বিনা কারণে যে অপমান অত্যাচার করে চলেছে নিউটনের সূত্র যদি সত্যি হয় তবে তা একদিন ফেরত আসবেই। কোন উপায় নেই সেদিন চোখের জলে, বুকের দীর্ঘশ্বাসে তোমার পাওনা, তোমাকে বুঝে নিতেই হবে।
সেদিনের সেই আশংকা আমার সত্যে পরিণত হয়েছিল মাত্র অল্প কিছুদিন পরেই। সেটা যতদূর মনে পড়ে ১৯৬৩ সাল। যেবার কাশ্মীরের কোন এক মসজিদ থেকে যেন হজরত সাহেবের “বাল” চুরি গিয়েছিল। সত্যিই চুরি গিয়েছিল না নিজেরাই লুকিয়ে রেখে গুজব ছড়িয়ে ছিল কিছু দুষ্ট লোক, তা কে জানে। তবে সেই উপলক্ষ্যে সারাদেশ জুড়ে দাঙ্গা শুরু হয়েছিল। যে দাঙ্গায় বহু নিরীহ মানুষও মারা যায়। সে দাঙ্গার রক্তদাগ আমার কিশোর হাতেও লেগে ছিল। আমার হাতে লেগে যাওয়া সে রক্তের গন্ধ এখনও টের পাই।
শুনেছি সেই সময়ে কে বা কারা ডাক্তারের বাড়িতে রাতের অন্ধকারে আগুন ধরিয়ে দেয়। তার আগে ঘরের মূল্যবান যা কিছু লুঠপাট করে নেয়।
.
শহর কলকাতার মধ্যে একটা জায়গার নাম আমার জানা ছিল। সেটা যাদবপুর। একদিন এসে পড়লাম সেই যাদবপুরে। যেখানে নানা রকম কাজ পাওয়া যায়। আমার বাবা এখানে এসে কাজ পেতেন। বাবা যখন পেয়েছেন ছেলেও পাবে। তাই ট্রেন থেকে নেমেছিলাম এখানে। প্রথম রাতটা কাটাতে হল এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে এখন যেখানে গণশক্তি সাঁটা হয় সেই দেওয়ালের কাছে পানের পিক পোড়া সিগারেটের টুকরো ছেঁড়া কাগজ ধুলোময়লার মধ্যে শুয়ে। সে রাতে ধুম জ্বর এসেছিল আমার। সারা গায়ে ছিল পাকা ফোঁড়ার মত বিষ ব্যথা। ডাক্তারের বেপরোয়া কঞ্চি চালনায় শরীরের নানা জায়গা ছিল দাগড়া দাগড়া ফোলা।
পরের দিন সকালে জ্বর আর ছিল না, ছিল পেটে ভীষণ খিদে। আর গায়ের ব্যথাটা বেড়ে গিয়েছিল বেশ খানিকটা। কিন্তু এইসব অসুবিধার কাছে আত্মসমর্পণ করে বসে থাকলে সমস্যা যে বেড়ে যাবে। তাই সব শারীরিক ক্লেশ অস্বীকার করে খুঁজতে বের হলাম একটা কাজ। তখন কতই বা বয়স আমার। এই বয়সে এমন কীবা কাজ আমি পেতে পারি। তাই যে কাজ আমার সামর্থে কুলায় যে কাজের আমি যোগ্য, পেয়েছিলাম সেই কাজ, এক হিন্দুস্থানির চায়ের দোকানে গেলাস ধোবার চাকরি। যার মাইনে মাসে দশটাকা। আমার মনের মধ্যে ডাক্তারের বাড়ির স্মৃতি তখন একেবারে টাটকা, নিম্নবর্ণ হবার যে যন্ত্রণা-অপমান তা আমার হাড়ে হাড়ে জানা। তাই নিজের নামটা বদলে একটা নাম রেখে নিলাম যাতে আমাকে কেউ নমঃশূদ্র বলে শনাক্ত করতে না পারে। তাহলে হয়ত আর কাজেই রাখবে না। যদি বা রাখে ব্যবহার করবে ঘৃণ্য কোন জীবের মত। দোকান মালিক উত্তর প্রদেশের লোক। যাদের মধ্যে জাতপাত ছুয়াছুত বাঙালীদের চেয়ে ঢের বেশি। তবে আমার ভাগ্য এসময়ে ভালো বলে তারা আমার জাত বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখাল না।
সঠিক মনে নেই বোধ হয় চার পাঁচ মাস এই দোকা্নে কাজ করেছিলাম। এরা মাসমাইনের দশ টাকা মাসের শেষে চাইলেই দিয়ে দিত। তবে ধোবার সময় হাত ফসকে পড়ে গিয়ে গেলাস ভেঙে গেলে তার দামটা মাইনে থেকে কেটে নিত। এটা শাস্তি, যাতে কাজের লোক কাজের প্রতি অমনযোগী না হয়। প্রায় মাসেই শত সাবধানতা সত্ত্বে একটা দুটো গেলাস ভেঙেই যেত। একবার প্রায় চারসের দুধ হাত থেকে পিছলে নিচে পড়ে গিয়েছিল। সে মাসে মাইনে মেলেনি।
আমি তখনও কোন খুন জখম দেখিনি। দাঙ্গা কাকে বলে জানি না। রামায়ণ মহাভারত পাঠ শুনেছি, মানুষ মানুষকে বধ করে সেটা জানি। কিন্তু সেটা যে কী মর্মান্তিক দৃশ্য। সেই দৃশ্যের সামনে পড়তে হল একদিন।
এক সকালে দেখি সামনের রাস্তা ধরে বাঁশ টালি বয়ে নিয়ে দলে দলে লোক চলেছে পুর্বদিকে। কারা এরা! যাচ্ছে বা কোথায় এইসব নিয়ে? এরা চলেছে সন্তোষপুর খাল পার হয়ে এখন যেখানে ইস্টার্ন বাইপাস সেখানে। ওখানে বিশাল এলাকা জুড়ে জমিদারদের কবজা করে রাখা জমি এরা দখল করে নিচ্ছে। এখানে আর একটা জবরদখল কলোনি করবে। অহীন রায় চৌধুরী নামের এক কংগ্রেস নেতার নেতৃত্বে এসব হচ্ছে। তার সাথে রয়েছে সোনাইয়া নামের আর একজন। যে পরে হাতকাটা সোনা নামে খ্যাত হয়। যখন জমি জবর দখল হয় তখন তার হাত ছিল। প্রায় আট দশ দিন ধরে চলল এই পথে দখলদার লোকদের মিছিল। এক দুপুরে আমি সেই নতুন কলোনি দেখতে গিয়েছিলাম। দেখেছিলাম যতদূরে চোখ যায়, তৈরি করা হয়েছে ছোট ছোট ঘর। কোনটা হোগলার কোনটা মুলিবাঁশের। গোনা যায় না, তবে মনে হয় কুড়ি পঁচিশ হাজার পরিবার বসে গেছে ইতিমধ্যে। ইচ্ছে হয়েছিল এখানে এক খণ্ডভূমি আমিও দখল করব। আমাদেরও তো কোথাও থাকবার মত জায়গা নেই। কিন্তু আমার ভাবনাটা ছিল যে পরিমাণ বড় বয়স আর শরীরটা ছিল সে তুলনায় ছোট। তাছাড়া একটা ঝুপড়ি খাড়া করতে যে কটা বাঁশ আর হোগলা দরমা দরকার সে টাকাই বা কোথায় পাব।
