এবার আমার মাথায় কিলবিল করে উঠল একটা গুবরে পোকা। আট মাস পরে একসাথে অনেক কটা টাকা পেয়ে গেছি, তাই তাকে টাকার গরমও বলা যায়। এই টাকা এখন যদি ফালতু ফালতু উড়িয়ে দিই আগামী আটমাস সংসার কী করে চলবে?না সে সমস্যা হবেনা। স্কুলের পাশে যে মুদি দোকান সে কথা দিয়েছে আট কেন পুরো এক বছর চাল ডাল নুন তেল সব বাকিতে দেবে। শর্ত একটাই, মাইনে পাবার সাথে সাথে সব বাকি শোধ করে দিতে হবে। আজ শোধ দাও, কাল থেকে আবার নাও।
তখন ভাবলাম–সেই উনিশশো একাশি থেকে নিরানব্বই প্রায় উনিশ বছর ধরে আমি লিখছি, এখনো আমার নিজের কোন বই নেই। একখানা বই ছাপাতে হবে। যার নিজের কোন বই থাকে না লেখকদের সমাজে সে বড়ই করুণার পাত্র বলে চিহ্নিত হয়ে যায়।
তা ছাড়া বহুকাল যাযাবর জীবন কাটাতে হয়েছে। ভারি বোঝা বয়ে বেড়ানোয় অসুবিধা বলে প্রকাশিত লেখাগুলো সব পত্রিকার পাতা থেকে ছিঁড়ে রেখেছিলাম। তার কিছু পোকায়, কিছু ইঁদুরে কেটে নষ্ট করে দিয়েছে। কিছু ছিঁড়ে ফেটে গেছে। এখন এগুলোকে সংরক্ষণের একটা ব্যবস্থা না করলে সব চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আর আমাকে যদি বই ছাপাতে হয়, তবে তা করতে হবে সম্পূর্ণ নিজের গাঁটের টাকায়। আমি এমন কোন নামী লেখক নই যে প্রকাশক তার টাকায় আমার বই ছাপাবে। তারা সেই লেখকের পিছনে টাকা ঢালে যে টাকা দশ বিশগুন বেশি হয়ে ফিরে আসার সম্ভাবনা আছে। এই অবস্থায় আমার নিজের বই নিজে না ছেপে আর কী উপায়? আমি যে সংস্থার অধীন সেই সংস্থার একটা নিজস্ব প্রেস আছে, তাই একদিন অফিসে গিয়ে ওই সংস্থার যিনি সর্বময় কর্তা তার সাথে দেখা করি।
বলি–দাদা, আপনাদের প্রেস থেকে আমার একটা বই ছেপে দেবেন?
–বই! দাদা আকাশ থেকে পড়েন তোর বই! কী বই?
–গল্পের বই।
–তুই গল্প লিখিস নাকি! লেখক?
মহাশয়ের গলা থেকে ঝলকে ঝলকে নামে কৌতুক। বড় অদ্ভুত ব্যাপার তো। যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে সেটা উনি জানেন। কিন্তু সে যে গল্প লেখে–কোনদিন শোনেন নি।
আমি বুঝতে পারি একটা মহাভুল হয়ে গেছে। সামলে নেবার জন্য বলি–না, মানে আমি গল্পটল্প লিখি না। আমার এক চেনাজানা-মদন দত্ত নাম, সে লেখে। সে বলল যে তোদের ওখানে তো প্রেস আছে, আমার একটা বই ওখান থেকে ছাপিয়ে দে। তাই–ধরে নিন আমারই বই। টাকা পয়সা সব আমি দেব।
ওঃ এই ব্যাপার! তা আমার কাছে কেন এসেছিল। বিশ্বাস বাবুর সঙ্গে কথা বল। প্রেসের সব কাজ উনি দেখেন। রেট ফেট যা সব উনি বলবেন।
–কথা বলেছি।
–কী বলল।
–আপনার সাথে দেখা করতে বলল।
–কেন!
–আমি এখন সব টাকা দিতে পারব না। পাঁচ হাজার দেব। বাকি আর যা থাকবে সেটা দেব বই ছাপা হয়ে গেলে বিক্রি করে, ধীরে ধীরে।
হেসে উঠলেন উনি–বই বিক্রি করে দিবি পাগল ছাড়া আজকাল আর কেউ বই কেনে না। ও বই বিক্রি হবে না।
–তা না হোক আমার মাইনে থেকে মাসে মাসে কিছু কিছু কাটিয়ে দেব।
–ঠিক তো?
-–একদম ঠিক।
–কত বই হবে?
–কত আর, এই ধরুন শ পাঁচেক।
-–ঠিক আছে যা। গিয়ে বিশ্বাস বাবুর কাছে পাঁচ হাজার জমা করে দে। আমি তাকে বলে দেব। কথা দিলাম বই হয়ে যাবে। যা।
আমি এখন এক অভাগা মানুষ, সবদিনই এমন হয়েছে যে সুযোগ পেয়েছে আমাকে আখ পেষার মতো পিষে সব রস নিঙরে নিয়েছে। এবারই বা তার ব্যতিক্রম কেন হবে? বাগে পেয়ে এবারও মানুষ জোঁকের মতো সব রক্ত রস শুষে নিল। বড় রস তোর। বই ছাপাবি, লেখক হবি। বের করছি রস।
লোকটার কী যে নাম জানি না। সবাই বিশ্বাস বাবু বলে ডাকে। তা বলে সে যে সবার বিশ্বাসী হবে তা কী করে হয়। এখানেই একটা বড় ভুল হয়ে গিয়েছিল আমার। নাম যাই হোক নামের শেষে বিশ্বাস আছে দেখে ভেবে বলেছিলাম–আমারই স্বজাতি যখন একে বিশ্বাস করা যায়। এই লোকটা অন্ততঃ আমার গলা কাটবে না।
এই সময়কালে আমার খুব গভীর এবং নিবিড় একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে যারা মহারাষ্ট্রের দলিত নেতা ভীমরাও রামজি আম্বেদকরের মতাদর্শ অনুসরণে দলিতদের সংগঠন গড়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশভাগী হবার জন্য সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
আমি নিজেও দলিত শ্রেণির মানুষ। ফলে স্বজাতির স্বশ্রেণির লোকের প্রতি এমন একটা দুবর্লতা জন্মে গিয়েছিল যে এরা আর যাইহোক উচ্চবর্ণ উচ্চবর্গের মতো কখনোই নয়। আমার তখন মনে ছিল না যে জাতি ধর্ম ভাষা কোনকিছুই মানুষকে মানবিক করে না, সহানুভূতিশীল বা দরদী বানায় না। তা যদি বানাত শিয়া-সুন্নি এক মুসলমান আর এক মুসলমানের গলা কাটত না, ধর্ম হাত চেপে ধরত। পূর্ববঙ্গ থেকে হিন্দুদের বিতাড়ন এখনো চলছে। চলত না, ভাষা এসে পথ আটকাত। সাঁওতালরা লোধাদের মারত না, নিম্নবর্ণ ঐক্য বাধা দিত।
এক ভদ্রলোক বাপ ঠাকুর্দার জমিদারির কল্যাণে বড় সুখে জীবন কাটিয়েছেন। বড় শান্তির নিকেতনে বসে কাব্যসুন্দরীর সেবা করেছেন সারা জীবন। মানুষ এসেছে তার দরজায় গুরুদেব বলে পদধূলি নিতে। তাকে কোনদিন গিয়ে দাঁড়াতে হয়নি মানুষের দুয়ারে। তাই বাতায়নে বসে দক্ষিণা বাতাসে লিখতে পেরেছিলেন–মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।
যদি উনি কোন বাড়িতে রান্নার কাজে যেতেন, কাজের শেষে মজুরি না দিয়ে চোর বলে মেরে তাড়াত, যদি কোন গয়লার দুধের ড্রাম মাথায় বয়ে নিয়ে যাবার অতি কষ্টে জমানো পারিশ্রমিকের টাকা, তারাই হাতিয়ে নিত, যদি রিকশা চালাতেন, প্রবল গরমে-ঘামে নেয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া যাত্রী ভাড়া না দিয়ে “দাঁড়া আসছি” বলে হাওয়া হয়ে যেত, তাহলে আর ওই বাণী বের হতো না। টের পেতেন বিশ্বাসের মা মারা গেছে বহু বছর আগে। তাই যে মানুষকে বিশ্বাস করা যায় তারা আর পয়দাই হচ্ছে না। এ আমার অভিজ্ঞতা লব্ধ একান্ত ব্যক্তিগত অনুভব।
