একদিন তাকে দেখি ডাস্টবিন ঘাটতে, দেখি কুকুরের মুখ থেকে রুটি কেড়ে নিতে। এক অমৃতস্যঃ পুত্রার এমন কুকুরোচিত ব্যবহারে সেই কুকুরটির দুচোখ জুড়ে ফুটে ওঠা বিস্ময়, সেও দেখি আমি।
এই সব দেখি আমি। আমার সারাটা জীবন সিনেমার পর্দার মত–চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তখন আর মনটাকে বলতে পারি না–ওরে, একটু ভালোভাষায় ভালোবাসার কথা বল। তখন আমি তাকে বলি–বিদ্রোহ কর। ভাঙ, সব কিছু ভেঙেচুরে তছনছ করে দেবার রাগ প্রধান গান–ভৈরব বাহার ভীন-কানাড়া হাম্বীর আর সিংহেন্দ্র মধ্যম গা। মীরার ভজন তোর জন্য নয়। আগুন দুভাবে নেভানো যায়–জল ঢেলে বা কেরোসিন ঢেলে। তোর কাছে যেটা অনায়াস লভ্য সেটাই ঢাল। ছাইয়ের মধ্য থেকে আবার নতুন প্রাণ জাগবে।
তাই রান্না ঘরের এক কোণে কাগজ কলম নিয়ে বসি। উনুনে রান্না চাপিয়ে দিয়ে দু লাইন লিখি। রান্না নামিয়ে দু লাইন লিখি। বাচ্চাদের খেতে আসতে দশ মিনিট দেরি আছে-সেই ফাঁকে দু লাইন লিখি। আমার অবস্থা তখন ফাঁসির দড়ি গলায় চেপে বসা বন্দীর মত। শ্বাস নিতে পারছে, তবু প্রাণপণে শ্বাস টানছে যদি দু সেকেণ্ড বাঁচা যায়। ওরা আমাকে লিখতে দিতে চায় না, সেই ফাঁস ক্রমে এঁটে আনছে আর আমি প্রাণপণে চাইছি দু কলম লিখতে। আমি যে তখন নিরুপায়। কাগজ কলম ছাড়া তখন তো আর আমার কোন অবলম্বন নেই। কী নিয়ে বাঁচব। আর মিছিলে হাঁটতে পারব না। কার পিছনে হাঁটব? জেলে যেতে পারব না। শরীর পোক্ত নেই। গলা কাটতে পারব না। মনে সে জোর নেই। আছে শুধু কলম। তাই মনে প্রাণে যাদের মৃত্যু কামনা করি, আমার গল্পে তাকে মেরে ফেলি। এতেই পাই মানসিক তৃপ্তি আর বেঁচে থাকার রসন। এইভাবেই পদক্ষেপ আনোয়ান, অদলবদল, বহুজন নায়ক, রবিশস্য এই সব পত্রিকার জন্য লেখাগুলো তৈরি করেছিলাম। একদিন আনন্দবাজার পত্রিকার (২৪.৪.৯৯) পাতা খুলে দেখি পুস্তক সমালোচনা বিভাগে পুস্তক সমালোচক শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত রবিশস্য পত্রিকায় প্রকাশিত আমার “অভিশপ্ত অতীত অন্ধকার ভবিষ্যৎ নিয়ে দু লাইন লিখেছেন। কী লিখেছেন চোখ বোলাতে বোলাতে আমার মনে হল ছোট করে হলেও কিছু মানুষের কাছে এই বার্তা দেওয়া গেল যে রাঁধে যে চুলও বাঁধে।
উনি লিখেছেন..”পূর্বাঞ্চলের দেশভাগের এই মানব ইতিহাস এখনও সে ভাবে লেখা হয়নি…..। যত তাড়াতাড়ি লেখা যায় ততই ভালো…। আজ পাঁচ দশক পরে যখন সেই মারনাগ্নির বিবরণ পড়ি তখন একটাই প্রশ্ন কুড়ে কুড়ে খায়–কেন? উত্তরে অনেক কারণ দেওয়া যেতে পারে। তবে মূল কারণটি ব্যাখ্যা করেছেন বরিশালের নমঃশূদ্র, খেটে খাওয়া বিতাড়িত মনোরঞ্জন ব্যাপারী। তার অনবদ্য স্মৃতি কথা শেষ হয়েছে এইভাবে–সেই কিশোর বয়েসে সেই একটি মাত্র ঘটনা আমাকে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গার মূল রহস্য বুঝিয়ে দেয়। যে মানুষ কুকুরের চেয়েও নিকৃষ্ট বলে আর একজন মানুষের কাছেঘৃণার পাত্র বলে বিবেচিত হয়, সে তাকে শ্রদ্ধা করবে, ভালোবাসবে এ হতে পারে না। হওয়া সম্ভব নয়। ঘটনাটি হল–মুসলমান অতিথিকে পায়েস খাওয়ানোর পর রাতে থালা ধুয়ে চান করে আসার ভাবটা ছিল আমার (মনোরঞ্জনের) উপর। হ্যাঁ জায়গাটা গোবর দিয়ে ঝট দেবার কাজটাও আমাকে করতে হয়। এই অভ্রান্ত সাবঅন্টনি বিশ্লেষকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য ধন্যবাদ।”
.
রবিশস্য পত্রিকার সম্পাদকের নাম ধীরাজ বোস। এই পত্রিকাটা প্রকাশিত হয় বাঘাযতীন কাজিপাড়া থেকে। একদিন আমার একটু বাঘাযতীন যেতে হয়েছিল। তখন ভাবলাম–একবার সম্পাদক মহাশয়ের সঙ্গে দেখাই করে যাই। ইনি সেই সম্পাদক যার দরজায় কুকুর বাঁধা থাকে না, ঘর আর মনের দরজা হাট করে খোলা। সম্পাদকের সামনে গিয়ে আমি তো অবাক। ধীরাজ বোস আর কেউ নয়, এ আমার সেই সত্তরের দশকের সাথী নেতা, বাবলাদা। অবাক বাবলাদা, তার পত্রিকায় যার লেখা বের হয়েছে সেই মনোরঞ্জন তার চেনা মদন। প্রায় পঁচিশ বছর পরে দুজনের সাথে দুজনের পরিচয় ঘটল নতুন নামে নতুন এক ভূমিকায়। এরপর এই কাগজে প্রকাশিত হল আমার একটা বড় লেখা শমনসকাশে তিন দিন। তারপরে লাথখোর’আর পথ যেখানে পৌঁছলো। তারপর, সব কথা রাত জানে।
আমরা যখন কলকাতা ছেড়ে দণ্ডকারণ্যে চলে যাই আমার ছেলে মেয়ে সব ছিল ছোট ছোট। ওরা বিশেষ কিছু বুঝত না। এখন বড় হয়ে গেছে বুঝতে শিখেছে দণ্ডকারণ্যের পাহাড় পাথর বন জঙ্গলের সাথে বাংলাদেশের জল মাটি আবহাওয়া খাদ্যদ্রব্যের কী পার্থক্য। ওদের এখন মন কাঁদে বাংলার মাটি মানুষের জন্য।
অনু যে ভাবনায় যে আশায় দণ্ডকারণ্য গিয়েছিল সে এখন নিভে গেছে। ওখানকার রুক্ষ্ম জীবন এখন অসহ্য মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে গরম কড়াই থেকে বাঁচতে সে যেখানে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সেটা জ্বলন্ত উনুন। তাই বার বার চিঠি লিখছে সে-আমরা আর এখানে থাকব না। তোমার ওখানে যাব।
আমার মাইনে অনিয়মিত মেলে। আটমাসের মাথায় সেবার বেতন পেলাম। বেতন পেয়েই সর্বপ্রথম একখানা ঘর ভাড়া করে ফেললাম আমি। চারদিকে দরমার বেড়া, উপরে টালি, মেঝে কাঁচা–ভাড়া মাসে চারশো। এরপর অনুকে চিঠি লিখলাম–চলে এসো। ওরা তো আসবে বলে প্রস্তুত হয়েই ছিল। চিঠি পাবার সাতদিনের মধ্যে পৌঁছে গেল হাওড়ায়। ফোন পেয়ে আমি গিয়ে নিয়ে এলাম সেই ভাড়া করা বাসায়। ঘরটা খুবই ছোট। এত ছোট যে একখানা চৌকি পাতবার পর আর কোন জায়গা নেই। বাধ্য হয়ে কয়েকটা ইট দিয়ে চৌকি বেশ কিছুটা উঁচু করে নীচে যে জায়গা পাওয়া গেল আমাদের স্বামী স্ত্রী রাতে ঘুমানো যায়। বাচ্চা দুটো চৌকিতে কুলিয়ে যেত। রান্না খাওয়ার জন্য এক চিলতে বারান্দা আছে। এই হল আমার নতুন করে পাতা সংসার।
