তবে তাদের দশা এখন সেই সাপের ছুঁচো গেলার মতো। না পারছে গিলে নিতে না পারছে উগরে ফেলতে। বড় সাহেব আমাকে এনেছে। তাকে কে গিয়ে বলবে ওকে বের করে দিন। উনি কী তা করবেন? তাহলে এত বাচ্চার রান্না খাওয়ার কী হবে? পথ একটাই–অত্যাচার তীব্র করা। যেন আমি নিজেই পালাই। এভাবে সাপ মরে যাবে লাঠিও ভাঙবে না। দোষ পড়বে না কারও ঘাড়ে।
এই কাজে মাদার তাদের প্রথম পছন্দের। তাকে সবাই উস্কে দেয়। আর সে সুযোগ পেলেই হামলে পড়ে। সেই যে সে একবার বড় সাহেবকেরাখি বেঁধেছিল–সেই সম্পর্কের জোরে ভাইয়ের স্কুলের মালিক মনোভাবে সবার কাছে যেমন মূর্তিমতি ত্রাস–আমাকেও ত্রাসিত করে তুলতে চায়।
***
আমি আমার পেট চালাবার জন্য রান্নার যে কাজটা করি তাতে লেখালেখি করার মত সময় বের করা খুবই মুশকিল। রোজ সকাল ছটা-সাড়ে ছটায় শুরু করতে হয় কাজ। দুখানা বড় দুখানা ছোট চারখানা উনুন জ্বলে আমার চারপাশে। বাইরে যখন বিয়াল্লিশ ডিগ্রি গরম রান্নাঘরের কি অবস্থা সহজে অনুমেয়। এই অবস্থায় বেলা এগারটা বারোটা, স্কুল ছুটির দিন দুটো আড়াইটা পর্যন্ত লেগে যাবে দুপুরের খাওয়ার সব কাজ মেটাতে। আবার রাতের খাবারের জন্যে কাজ শুরু করতে হবে সন্ধে ছটা থেকে রাত দশটা-সাড়ে দশটা পর্যন্ত। এর মধ্যে লেখার সময় বলতে দুপুরের কিছু সময় আর রাতের কিছু সময়। কাজ শেষ করার পরে ক্লান্তিতে শরীর অবসন্ন হয়ে পড়ত। শ্রান্ত শরীর আর নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকতে চাইত না। দুপুরে চান করে খাবার পর শরীর চাইত বিশ্রাম। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসত আমার। তখন নিজেকে বোঝাতাম আমি, এটাই লড়াই। লড়াই শুধু মাঠেময়দানে হয়না-লড়াই সর্বত্র। এই লড়াই তোকে জিততে হবে। হেরে গেলে চিরতরে হারিয়ে যাবি। তুমি লুডো খেলছো না, গল্প লিখছো। এটাও একটা যুদ্ধ। তোমার একটা প্রতিপক্ষ আছে। যাদের দিকে অস্ত্র ছুঁড়ছো তুমি। তারা তোমাকে সাহায্য সহযোগিতা দেবে, সহানুভূতি দেখাবে তা হয় নাকি। তারা উল্টো করবে। পদে পদে বাধার সৃষ্টি করবে যাতে তুমি লিখতে না পারো। ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করে তোমাকে নিরস্ত্র করবার চেষ্টা চালাবে। তোমার সহজ কাজটাকে জটিল করে দিয়ে মানসিক দিক থেকে বিপর্যস্ত করবার প্রয়াস চালাবে। দুপুরের বিশ্রামের সময়টা কী ভাবে কমিয়ে আনা যায় সেই বুদ্ধি খাটাবে। যদি তাতে সফল না হয় তখন তারা আরও হিংস্র হয়ে উঠবে। তোমার কাজে খুঁত খুঁজবে–যদি তরকারিতে একটু নুন বেশি হয়ে যায় তিন চারজন এমনভাবে আঁপিয়ে পড়বে–যেন তুমি মানুষ খুন করার চেষ্টা করেছে। যত তোমার যশ খ্যাতি পরিচিতি বাড়বে আক্রমণ তত তীব্র হবে।
এইসব সয়ে যদি তুমি লিখে যেতে পারো তবেই জয়ী হবে। এদেশ সেই দেশ যেখানে জ্ঞান চর্চার অপরাধে রাম শম্বুক ঋষিকে হত্যা করেছিলেন। মহাগুরু কেটে নিয়েছিলেন একলব্যের আঙ্গুল। এ দেশের মধ্যে বহুকাল ধরে আছে ”ওরা” আর “আমরা” এই বিভাজন। যে জ্ঞান, বিদ্যা, দক্ষতা “আমরা”দের বিপক্ষে যায় তা সহ্য করে না। উৎপাটন করে।
আমার চারপাশের মানুষ, যত তারা দাঁত নখ বের করছিল, আমার জেদ তত বেড়ে যাচ্ছিল। একটা কিছু করতে হবে, এমন একটা কিছু যাতে প্রতিপন্ন হয়ে যায় ওই দাঁত নখের ভয়ে আমি ভীত নই। এমন একটা কিছু করতে হবে যেটা হয়ে ওদের মুখের মত জবাব। সারা পশ্চিমবঙ্গ আমার পাশে এসে দাঁড়াবে।
আমি নিজেকে যতটা জানি, তাতে জানি যে–যে কাজ আমি প্রেমে পারি না, ক্রোধে পারি। তাই আজ আমি ওই মানুষগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। ওরা যদি প্রতিনিয়ত আমার ক্রোধের বারুদে আগুন দেবার কাজটা না করে যেত আজ আমি এখানে পৌঁছতে পারতাম না। প্রদীপ যখন নিভু নিভু হয়ে আসে একটা কাঠি দিয়ে পলতেটাকে ঠেলে উপরের দিকে তুলে দিতে হয়। ওরা সেই কাঠিবাজিটা নিষ্ঠার সাথে নিয়মানুবর্তিতার সাথে করে গেছে। যাতে পরোক্ষে আমার উপকারই হয়েছে। আমার ঝিমিয়ে পরা প্রতিজ্ঞা ঝাঁকুনি খেয়ে জেগে উঠেছে। হ্যাঁ, আমার এই সাহিত্যচর্চা, এই সৃজন, এসব আমার ক্রোধেরই সন্তান। দশ-বার খানা উপন্যাস শতাধিক গল্প যা লিখেছি এতদিন ধরে আমি, সবই উৎপন্ন হয়েছে এক ক্রুদ্ধ লেখকের লেখনি থেকে। প্রায়শঃই আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে–আমি কেন কোন প্রেমের গল্প লিখিনি। মিষ্টি মিষ্টি ভালোবাসার গল্প লিখিনি, কারণ লিখতে পারিনি। কী করে লিখব? আমার জীবনে যে কোন প্রেম নেই। যা আমার ভাগ্যেই নেই তা আমি মানুষের সাথে ভাগ করব কী করে? যার জীবন জুড়ে শুধু আকাল আর আকাল। ধ্বংস-রক্ত-চোখের জল, অভিশাপ আর অবমাননা সে কী করে লিখতে পারে হাতে হাত চোখে চোখ রেখে স্বপ্ন সাগরে ভেসে যাবার আখ্যান। আমার সঞ্চয়ের ঝুলিতে যা
আছে তাই-ই তো বিলোতে পারি সবাইকে। যা কেউ আমাকে দেয়নি, আমি কাউকে কী ভাবে দেব? আমি চোখ বুজলেই দেখতে পাই সেই কিশোরকে যার খেলবার জন্য একটা কাঁচের গুলিও নেই। নেই পড়বার জন্য দুআনা দায়ের একখানা বাল্যশিক্ষা। পেছন ভেঁড়া প্যান্ট পরে যে দুহাতে পেছনে রেখে ঢাকতে চায় লজ্জা-হীনমন্যতা। যে খিদে ভুলতে পশুর মত দুর্বাঘাসের মাথি তুলে চিবোয়। আমি দেখি সেই বালককে যে জনহীন জঙ্গলে হিংস্র শেয়ালের আক্রমণের ভয়ে কুঁকড়ে যেতে যেতে ছাগল চড়ায়। সকাল সন্ধ্যায় তার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয় জল বওয়া বাঁক। বাঁক বইতে বইতে কাঁধের মাংস জোয়াল বওয়া গরুর কাঁধের মত খরখরে হয়ে যায়। উপর থেকে চাপের ফলে শরীরটা বাড়তে না পেরে খর্বকায়–বনসাই আকার নেয়। দেখি এক বালকের গেলাস প্লেট ধুতে ধুতে হাজায় পচে যাওয়া হাতের আঙ্গুল-পায়ের পাতা।
