একজন বলে–এগুলোর যা বাড় বেড়েছে। এদের সাইজ করার জন্য দরকার একজন মোদির। সব এদের তেল দেয় ভোটের জন্য। বাপের ব্যাটা একমাত্র নরেন্দ্র মোদি।
মোদি কেন একমাত্র বাপের ব্যাটা, আমি তা জানি না। মোদি যদি এদের সাইজ করে যোবা স্কুলের হার্মাদদের কে সাইজ করবে। একদিন সরল সোজা মানুষ বোতল খুলে যে দৈত্যকে মুক্ত করেছিল, কে তাকে আবার বোতলবন্দী করবে?
এখনও তার কোন লক্ষণ নেই। এটা শূন্য দশক যে। চারদিকে শুধু শুন্য। হাসপাতালের চিকিৎসাশূন্য, শিক্ষা ব্যবস্থা শুন্য, পুলিশ প্রশাসনের তৎপরতাশূন্য, পথঘাট, জল বিদ্যুৎ, পরিবহন শূন্য, বিপিএল কার্ড, একশো দিনের কাজ শূন্য। বন্ধ কলকারখানা খোলার চেষ্টা শূন্য। সমস্ত শূন্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় শূন্য সর্বার্থে শূন্য একটা সরকার। দু’লক্ষ কোটি দেনা করে শুধু ক্যাডার পোষা ছাড়া যার ঝুলিতে আর কোনো কৃতিত্ব নেই।
এই দল আর দলের নেতাদের সংস্পর্শে যার বেঁচে বেড়ে ওঠা সে বা তারা মানবিক গুণ পাবে কোথা থেকে। যেদিন থেকে জ্যোতি বসু তার ছেলে চন্দন বোসকে হাজার হাজার কোটি টাকার অন্যায় অসৎ উপার্জনের অনুমোদন দিয়েছিলেন সেদিন থেকে দলের নেতাকর্মী বুঝে গেছে–আমাদের “কী করিতে হইবে।”উহাই একমাত্র সঠিক পথ সুচেতনা, এই পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে।
***
একদিন মাদার কিলার ছোট ওভেনের একটায় তার মাপ মতো ভাত নিয়ে সেদ্ধ বসিয়েছে। আর একটা ফোঁটাচ্ছে ডাল, মাছের ঝোল। এইভাবে জাত বাঁচাচ্ছে। এখন আমার সাথে তার সম্পর্ক মেঘ রোদের। এই আকাশ কালো, এই রোদ ঝলমল।
তখন বলি তাকে–একটা গল্প শুনবেন? এই গল্পে আপনার জীবনের খুব মিল আছে। শুনবেন?
চশমার উপর দিয়ে বাঁকা চোখে তাকায় মাদার–বলো। দেখি কী মিল আছে আমার সাথে।
একজন লোক বারো বছর হিমালয়ের গুহায় বসে কঠোর তপস্যা করেছে।
আমি তপস্যা করেছি।
আগে সবটা শোনেন। তপস্যায় তার এমন ক্ষমতা অর্জন হয়েছে যা সাধারণ মানুষ পারে না। সে তার ক্ষমতার প্রমাণ দেবার জন্য একদিন সমতলে নেমে এল।
তারপর? তারপর এক গ্রামে গিয়ে লোকজনকে ডেকে বলল–আমি এক যোগী পুরুষ। যোগ বলে আমি অসাধ্য সাধন করতে পারি। তোমরা কী তার প্রমাণ চাও? বারো বছরের সাধনায়
আমি এমন ক্ষমতা পেয়েছি যে যোগবলে শুকনো বিচালিতে আগুন ধরিয়ে দিতে পারি।
আর কী পারেন? বোকা ধরনের একজন লোক বলে–এর চেয়ে বড় ধরনের কিছু পারেন কী?
যোগীরাজ কুদ্ধ–যোগবলে আগুন জ্বালানো এটা কম বড় কাজ। কেউ পারে?
বোকা লোকটা বোকা বোকা গলায় বলে–বারো বছর নষ্ট করে এই সামান্য ক্ষমতা! কেউ সে চেষ্টাই করবে না।
তার মানে!
একটা পয়সা দিলে এক বাকসো দেশলাই কাঠি মিলে যায়। এক মাস অনায়াসে আগুন জ্বালানো চলে। মাত্র একটা পয়সা বাঁচাবে বলে জীবনের মহামূল্য বারোটা বছর নষ্ট করে দিলে! তোমার মতো বোকারাম আর কেউ আছে?
গল্প শুনে মাদারের মুখ হাঁ হয়ে যায়। বলে–এই গল্পের সাথে আমার জীবনের মিল আছে বললে। সেটা কোথায়?
মিল আছে, বলি আমি–যে বাড়িতে জীবন কাটালেন, পশ্চিমবঙ্গের কত নামকরা বাড়ি। সেখানে কত নামি-দামি লোকজনের যাওয়া আসা ছিল। বলেন ছিল না?
জ্যোতি বসুর সাথে তো ওখানেই চেনা। উনি তখন বিধান সভার বিরোধী দলনেতা। খুব যেতেন ওই বাড়িতে। কত চা যে বানিয়ে খাইয়েছি তখন। জ্যোতি বসু, হরেকৃষ্ণ কোঙার, প্রমোদ দাশগুপ্ত কে আমার হাতের বানানো চা খায়নি!
বলি–যদি তাদের কাছ থেকে কিছু শিখে নিতে পারতেন তাহলে আজ আপনি একজন মহিলা নেত্রী হতে পারতেন। কিছুই শিখলেন না। শুধু রান্নাঘর আর ভঁড়ার ঘর আগলে জীবন কাটিয়ে দিলেন।
আমাদের যেখানে স্কুল এখানে একজন নেতা থাকে তার নাম চোর বাপ্পা। পার্টিতে ঢোকার আগে চুরি করত বলে ওই নাম। কয়েকবার তাকে সিপিএমের লোকরাও পিটিয়েছে। শেষে এক নেতা তাকে পার্টি অফিস ঝাড়ু দেওয়া, চা ফা বানানো এই সব একটা কাজ দেয়। কিছু মাইনেও দেয়। সেখানে থাকতে থাকতে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের দপ্তরে চাপরাশি হয়ে যায়। আর যখন এই অঞ্চলে জনবসতি গড়ে ওঠে এখানে এসে হয়ে যায় নেতা। বাজারে যার হোটেল আছে-বাগে ফেলে সেই অমূল্য মাঝির দোতলা দখল করে নেয়। এখন বড় ভালো আছে বাপ্পাদা, আর কেউ চোর বাপ্পা বলে না, বলে কমরেড বাপ্পা। লোকে বুঝে গেছে কমরেড বললে আর কিছু বলার দরকার পড়ে না।
আমার কথায় মাদারের শরীর জ্বলে। বলে-উপদেশের চেয়ে উদাহরণ ভালো। কে কী করেছে আর করেনি সে সব না বলে পারলে নিজে কিছু করে দেখাও।
বলি–করছি।
কী করছো হাতি না ঘোড়া?
দেখবেন একদিন। ফুল ফুটলে তার গন্ধ তো চাপা থাকে না।
ইঁদুর পচা গন্ধ এখন পাচ্ছি।
ঠিক। একদম ঠিক বলেছেমাদার…। আমি একদল লোকের কাছে পচে গেছি। স্বভাব পরিবর্তন ঘটে গেছে আমার। নিম্নবর্গ নিম্নবর্ণ সেই প্রথাগত মানসিকতার মধ্যে বাইরের সচেতন বাতাস ঢুকে পড়েছে। আমার শিক্ষাই এই সর্বনাশ করে ফেলেছে। এই শিক্ষা প্রথাবিরোধী প্রতিষ্ঠান বিরোধী। প্রথা বিরোধী শিক্ষার তিনটি স্তর। এক–এর কোনো বাঁধা পাঠক্রম, পাঠ্য পুস্তক বা প্রতিষ্ঠান থাকে না। দুই, কোনো পরীক্ষা, পাশফেল, ডিপ্লোমা ডিগ্রির সার্টিফিকেট পকেটে থাকে না। তিন, চাকরি-বাকরি বা সামাজিক মান মর্যাদার ক্ষেত্রে এর কোনো ব্যবহারিক মূল্য নেই। আমি যা শিখেছি তা একান্তই নিজের জানার জগৎটাকে আরও বিস্তৃত করার জন্য। সেই জগত আমাকে বিচ্ছিন্নতা থেকে সমগ্রতার সাথে যুক্ত করেছে। নিজের দুঃখকষ্ট যন্ত্রণার সাথে সমস্ত দরিদ্র দলিত মানুষের যন্ত্রণাকে এক করে দেখতে শিখেছি। এই শিক্ষায় আমার কোনো শিক্ষক নেই। আমার জীবনই আমার বড় শিক্ষক। তাই আমি আর কারও আজ্ঞাবহ-দাসানুদাস হতে পারি না। শুধু বুদ্ধি বিদ্যা বিবেকের দাসত্ব করি। যেটা সাধারণত চাকর-বাকর ঝি-রাঁধুনিদের থাকাটা জরুরি। না থাকাটা ঔদ্ধত্য। এরা চায়–আমরা সবাই পুরাতন ভৃত্য কেষ্টা হয়ে জীবন কাটাই। তা করছি না বলে এদের এত রাগ আমার উপরে।
