রবীন্দ্র সদনের সামনে থেকে মিনিবাসে চেপেছি। বেশ ফাঁকাই বাসটা। ড্রাইভারের পিছনের দিকে সিটের কাছে একটি বছর কুড়ির মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাবু ঘরের নয়, খেটে খাওয়া ঘরের মেয়ে। আর একটা গুণ্ডা গোছের লোক তাকে ঠেলছে। টাল খেতে খেতে মেয়েটা একেবারে কোনায় সেঁটে গেছে আর কাতরাচ্ছে–একটু সরে দাঁড়ান না। কঁহা হটেগা। জাগা কাহা, বলে সেই দুবৃত্ত গোছের লোকটা।
মেয়েটার দিকে দেখি, বিরক্তিতে তার কুঁচকে যাওয়া কপালে বিন বিনে ঘাম, চোখে ভয়। যাত্রীদের দেখি, রাত এখনও ন’টা বাজেনি এর মধ্যে অর্ধেক যাত্রী কী সুন্দর সিটে বসে ঘুমিয়ে পড়েছে। বাকি অর্ধেক জানালা দিয়ে রাতের কলকাতার অপূর্ব আলোকমালা অবলোকন করে চলেছে।
বয়স আমার কোনকালে পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে, সেইকাল কবে পিছনে ফেলে চলে এসেছি–হাতে অস্ত্র দাও আর সামনে দাও শত্ৰু তারপর আমাকে দেখো। যখন লোকে বলত–মদনের পেটে এক পাইট মদ আর হাতে চপার থাকলে একাই একশো।
বারবার এমন হয় না। সে হয়েছিল মাত্র একবারই। যেটা আজও ভোলেনি যাদবপুর স্টেশন রোডের লোক। সেদিন পেটে মদ ছিল হাতে চপার ছিল। তখন পুলিশ খুঁজতো আমাকে। কিছু পুরানো শত্রু আমাকে ধরে চেন দিয়ে বেঁধে ফেলেছিল। খবর দিয়েছিল পুলিশে–আমাকে নিয়ে যাবার জন্য। তখন মত্ত মস্তিষ্ক আমার বুঝে ফেলেছিল আসন্ন বিপদ। আর তাতে ঝাঁকুনি খেয়ে জেগে উঠেছিল আমার ভেতরের বন্য বরাহ। এক ঝটকায় শেকল ভেঙে ছুটে গিয়ে তুলে নিয়েছিলাম মাংসের দোকান থেকে একখানা চপার। তখন কত লোক ঘিরে ছিল আমাকে? একশো দুশো। জানিনা, তবে কাছে কেউ আসার সাহস পায়নি, দুর থেকে ইট পাথর ছুড়ছিল আমার দিকে। রক্তাক্ত করছিল আমাকে। আর আমি ওদের আক্রমণ প্রতিহত করে ভেঙে দিয়েছিলাম পাঁচখানা দোকান, ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতির মোটর কার, আর সেক্রেটারির চেপে আসা রিক্সা।
ডান হাতে আমার চপার ছিল বাঁহাতে বাঁধা লম্বা লোহার চেন। সেই চেনটা ঘোরাচ্ছিলাম বনবন করে। সেটা একটা পোস্টে প্যাঁচ খেয়ে গেলে–আর পালাতে পারি না। ধরা পড়ে যাই।
বোকামো করে জীবনে বহুবার বিপদে পড়েছি। সারা শরীর পুড়িয়েছি, বেড়ে গেছে শরীরে কাটা ছেঁড়া দাগ। যা মানুষেরই দান। তবু আজও শিক্ষা হয়নি। মাঝে মাঝে ভুলে যাই বয়স, ভুলে যাই স্থান কাল পাত্র। ভুলে যাই মৃত্যুর কথা।
সেটা এক মহালয়ার দিনের বেলা বারোটা। স্কুলের কাজ শেষে বাড়ির পথ ধরেছি। যখন গলি থেকে বের হয়ে বড় রাস্তায় পড়েছি, খেয়াল করিনি একটা মোটর সাইকেল আসছে। চালক সেও মত্ত যে পিছনে বসে আছে সেও তাই। দুজনই যুবক। মোটর সাইকেল আমার সাইকেলকে পাশ কাটিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। চালক খেঁকিয়ে উঠল, __ মাদারচোদ অন্ধ্যা হ্যায়। দিখতা নেহী?
চারদিকে তাকাই, কাছে পিঠে চেনাজানা কেউ নেই। কেউ যখন দেখছে না, দুটো গালিতে আর কী হবে? যা বাবা, চলে যা, সরি। আমি ওদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলি। কিন্তু ওরা এত অল্পে থামবে না। মোটর বাইক নিয়ে আমার পিছনে পিছনে গাল দিতে দিতে আসতে থাকে। অসহ্য লাগে আমার। সাইকেল থামিয়ে নেমে দাঁড়িয়ে পড়ি। ওরা চলে যাক। পরে আমি যাব।
না, ওরা গেল না, দাঁড়িয়ে পড়ল, ক্যা করেগা বে! সাইকল বরাক দিয়া! ক্যা কর লেগা তু? আর পারা যায় না, এগিয়ে গিয়ে চালকের সামনে দাঁড়ালাম–গালি কাহে দেতা বে? সে খপ করে আমার কলার ধরলখিচকে শালে তেরেকো পুলিশ পাড়া লেযায়েগা। দেখলাম–সামনের কাঠগোলাটা ভোলা। সাজানো আছে চেলা করা পিস কাঠ। একটা তুলে নিলে দুজনকে পেড়ে ফেলতে দুই মিনিট। কিছু বোঝার আগে শুয়ে পড়বে, তবে আর কেন! এক চড় জমিয়ে দিলাম চালকের গালে–শালে বটি বটি কর দুঙ্গা। রোক দু মিনিট। এক চড়েই তার নেশা হাওয়া। আভি আতা বলে পালিয়ে গেল মোটর বাইক চালিয়ে।
দুজনে ঘুরে দাঁড়ালে সেদিন কী হতো কে জানে। সাময়িক উত্তেজনা কেটে গেলে বুঝতে পারি–একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি। সেই বাড়াবাড়ি সেদিন ওই মিনি বাসেও হয়ে গেল। মেয়েটাকে দেখে মনে হল এ আমার মেয়ে। হাসপাতালে সেবিকার ডিউটি করে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। এই বাসে আমি ওর বাপ। ওকে বিড়ম্বনা থেকে আমি বাঁচাব। বাপের কর্তব্য করব। যে ঘুমাচ্ছে ঘুমাক–আমি জেগে আছি।
এগিয়ে গেলাম লোকটার সামনে। টের পেলাম তার মুখে সস্তা মদের তীব্র গন্ধ। বললাম-বাসে তো অনেক জায়গা, ওদিকে সরে যাও না। লেডিস সিটের সামনে কেন দাঁড়িয়ে আছো!
লাল ঢুলু ঢুলু চোখে সে আমাকে দেখল, পাত্তা দিল না। কহাঁ জায়েগা! জাগা কঁহা!
এবার লোকটাকে ঠেলে সরিয়ে দিলাম–এই যে জায়গা।
তখন উড়াল পুলের কাজ চলছে। রাস্তা জ্যাম। লর্ড সিনহা স্টপে এসে বাস দাঁড়িয়ে পড়েছে। আর আগাচ্ছে না। লোকটা বাস থেকে নীচে নেমে কোমর থেকে একটা ক্ষুর বের করল। আয়, এ্যাই বুড়া চোদ্দা, লিচ্চে লেবে আয়। শালে–।
আমাকে ডাকছে।বড় আদরের ডাক। আমি নেমেই যাচ্ছিলাম। পথ রোধ করল সেই মেয়ে, জেই যাবেন না–ক্ষুর মেরে দেবে। তাই নামা হয় না। যতক্ষণ বাস দাঁড়িয়ে থাকে সে সমানে গাল দিয়ে যায়। তবে বাসে ওঠে না।
বাস ছাড়ার পর ঘুমন্ত লোকেরা জেগে ওঠে। ঝপায় আমার উপর। কী দরকার মশাই ফালতু ঝামেলার। যদি ও ক্ষুরটা নলিতে টেনে দিত কী করতেন। এত সাহস দেখাবেন না। বিপদে পড়ে যাবেন।
