তবে মনে সামান্য একটু কষ্ট-লোকে আড়ালে তাকে মাদার কিলার বলে–সামনে মাসিমা। কিলার মানে যে খুনি আগে সেটা জানতেন না। এখন জানেন। আগে ভাবতেন মাদার টেরেসার মাদার আর হেলেন কেলারের কেলার–এই দুই মহীয়সীর নাম জুড়ে বুঝি তাকে কেউ সম্মান দিয়েছে। সে ভুল ভেঙে দিয়েছে একটি গ্রাম থেকে আসা কলেজে পড়া ছেলে–সম্মান নয়, ওরা আপনাকে অপমান করে। আপনি তো বাচ্চাদের মারেন তাই।
এটা ঠিক যে বাচ্চাদের প্রতি উনি একটু কঠোর। তা বলে একেবারে খুনি। বাচ্চা হচ্ছে একখণ্ড নিরেট পাথর। তাকে হাম্বর মেরে ভাঙতে হয় তারপর ছেনি হাতুড়ি দিয়ে ছাটতে হয়। তবেই তার মূর্তি নির্মিত হয়। বিগ্রহ রূপে মন্দিরে স্থান পায়, পূজিত হয়। এর কোন স্তরে দয়ামায়া দেখাবার প্রশ্নই নেই। সে করলে পাথর মুর্তি হবে না, বাচ্চারা মানুষ হবে না। তাই উনি বাচ্চাদের প্রতি এত নির্দয়, যা নিয়ে লোকে বলে–উনি তো বাচ্চার মা হতে পারেননি, সে কারণে বাচ্চাদের দেখলেই মাথা গরম হয়ে যায়।
শুধু বাচ্চা নয়–এইমহিলার আবিশ্বের সবকিছুর প্রতি অসম্ভব আক্রোশ। গাছপালা, পশুপাখি, কীট-পতঙ্গ, মানুষ তো বটেই সব কিছুর উপর সর্বক্ষণ ক্ষেপে আছে। যৌনসুখ থেকে বঞ্চিত বিধবা এই মহিলা যেন বেঁচেই আছে তার অতৃপ্তির চরম প্রতিশোধ নেবার জন্য। কারও কোনো কাজ, কোন কথা, হাঁটা, হাসা, হোস্টেলের মেয়েদের সাজগোজ–এদিক ওদিক তাকানো, ছেলেদের দেখা–সবকিছুতে তার রাগ বেড়ে যায়। তখন চিৎকার করে যাচ্ছেতাই গাল পাড়ে, মেরেও বসে কাউকে কাউকে। আর যদি কারও সাথে ঝগড়া বাধে সে পুরুষ হোক কী মহিলা-তাহলে তো তার মুখের লাগাম থাকে না। কুকুরের বাচ্চা, শুয়োরের বাচ্চা তো জলভাত–এমন সব ভাষার প্রয়োগ শুরু হয় যা লেখার অযোগ্য।
কথায় বলে–যার একটা অঙ্গ অকেজো হয়ে যায় তার অন্য কোনো অঙ্গ অধিক শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মহিলার গর্ভাশয় অক্ষম-অনুর্বরা-উৎপাদনহীন হয়ে যাওয়ায় পাকস্থলির কার্যক্ষমতা যেন দশ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে গেছে। সারাটা দিন সে পাগলের মতো রান্নাঘর ঘিরে পাক খায়-কোন্টা নেব কোন্টা খাব এই ধান্ধায়। যা দেখে আমার কাছে রাগত গলায় বলেছিল একজন–মাগীর পেটে ঝ্যান হজম মেশিন বসানো আছে। ইট, পাথর যা ঢোকাবে সব গলে গোবর হয়ে যাবে। আর বাগানের এক মালি বলে–বুড়ি বিষ খায় না মরবার ভয়ে, গু খায় না গন্ধ বলে, নালি সব খায়। একে দেখে আমার মনে হতো–ভগবান বলে যদি কেউ থেকে থাকে তিনি বড়ই বিবেচক। সেই জন্য এর কোনো সন্তান দেননি। যদি এর ছেলে থাকত–ইনি যা হিংস্র এবং আক্রামক-একটা বধু পোড়ানোর ঘটনা অবশ্যই ঘটত। অকালে প্রাণ হারাত কোনো বেচারা।
পৃথিবী বড় বিচিত্র জায়গা। এখানকার নিয়ম বড় অদ্ভুত। এখানে কারও ক্ষতি না করলে কারও উপকার হয় না। কারও উপকার হলে তাতে কারও না কারও ক্ষতি অনিবার্য হবে। রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ রোধ করেছিলেন। তিনি কী জানতেন যে এর ফলে সমাজে বিরাট সংখ্যক যৌনসুখ বঞ্চিত নারীর বৃদ্ধি হবে। তারা তাদের বিকৃত মানসিক অসুখ নিয়ে যখন মানুষের উপর আক্রমণে নামবে, তখন কী সমস্যার সৃষ্টি হবে। মাদার কিলারের সেই আক্রমণ সহ্য করতে না পেরে একের পর এক পাঁচজন আয়া কাজ ছেড়ে চলে গেছে। যারা বড় গরিব, এই চাকরিটা যাদের জীবন ধারণের জন্য ধরে রাখা জরুরি ছিল।
মাদার…যে বাড়িতে কাজ করত, সেই বাড়িতে বর্তমান সময়ে যারা নেতা মন্ত্রী এক সময়ে তাদের খুব যাওয়া আসা ছিল, সেই সূত্রে তার সবার সাথে চেনা জানা। কিন্তু সে চেনা কোনও কাজে আসেনি। কাজে লাগাবার মতো কোনো ইচ্ছা উদ্যম কিছুই ছিল না তার। সে শুধু সেই বিখ্যাত কুলীন কমরেডের বাড়ির রান্নাঘর, ভাড়ার ঘর, ফ্রিজের রকমারি খাবার আর সে বাড়ির অন্যসব কাজের লোকের উপর নেতাগিরি–এই করে এতটা বছর কাটিয়ে দিল। এই নিয়েই সে সন্তুষ্ট হয়েছিল।
লোকের উপর খবরদারি করা, পীড়ন করা এটা একটা নেশা। এ নেশা যার ধরেছে সব নেশাকে ছাপিয়ে গেছে। জেলখানায় একদল লোককে আর একদল লোকের উপর অত্যাচারের খোলাছুট দিয়ে তাদের কেমন বছরের পর বছর আজ্ঞাবহ বানিয়ে রেখে দেয় জেল কর্তৃপক্ষ।
আমি আমার জাত গোপন করিনি। সেই একবার জাত গোপন করে বামুন বাড়ির রান্নাঘরে ঢুকে যে অপমান অত্যাচার সইতে হয়েছিল তার পর থেকে আর নিজেকে শুধু নমোশুদ্দুর বলেই থেমে থাকিনা, এও বলে দিই আগে আমাদেরই চণ্ডাল বলা হত।
আমাদের নমঃশূদ্রদের প্রায় সবাই, সে কথা মনে করতে চায় না। মনে পড়লে কষ্ট পায়। একটু পয়সাঅলা হয়ে গেলেই অনেকে নাম-পদবি বদলে নেয়। ছিল মিস্তিরি হয়ে গেছে মিত্তির। ছিল হালদার হয়ে গেল হাওলাদার। ব্যাপারী থেকে ইচ্ছা করলে ব্যানার্জী বলা যায় না এমন নয়, যদি চেহারায় চাকচিক্য আর এক গাদা টাকা থাকে।
আমাদের মাদার…ইনিও এমন কোনো কুলীন কুলবালা নন। তবে বড়লোক বাড়ির ননী মাখনে চেহারায় একটা বাবু বাবু জেল্লা আছে। আর মানসিকতায় তো বামুনের চেয়ে বড় বামনি, সে নমঃশূদ্রদের ঘৃণা করে মুসলমানদের মতোই।
সে যেমন আমাকে ঘৃণা করে, আমিও সমানঘৃণা করি তাকে। সেই যে বুদ্ধদেব গুহ লিখেছিলেন যদি খারাপ লোকের সাথে ভালো ব্যবহার করি, তাহলে ভালো লোকের সাথে কী করব! আমিও খারাপ লোকের সামনে বুদ্ধের প্রেমবাণী দিতে পারি না।
