বড়দির বাড়িতে একজন রান্নার লোক আছে, তার চেনা জানা বহু লোকের বাড়িতেও রান্নার লোক দেখেছেন। তারা স্বভাব ভীরু, সাত চড়ে রা না কাড়া এক বিরল প্রজাতির জীব। কিন্তু এ তিনি কী দেখছেন। এক রান্নার ঠাকুর রাজনীতির কথা বলছে। আমেরিকা ফামেরিকার গল্প শোনাচ্ছে।
আমি তখনও বলে চলেছি–পরবর্তীকালে যখন শ্রমিক শ্রেণির পার্টি কমিউনিস্ট পার্টি গঠন হয়, তখন সেই রক্তমাখা জামার অনুকরণে পার্টির পতাকার রঙ লাল রাখে। পশ্চিমবঙ্গে সেই লাল পতাকা বাহক এক পার্টির নেতা বড় সাহেব। তার দ্বারা এই স্কুলের প্রতিষ্ঠা। সেই স্কুলের প্রধান হয়ে আপনি আমাকে বলছেন আমার চব্বিশ ঘন্টা ডিউটি? বড় আশ্চর্য কথা তো।
একটু দম নিয়ে আবার বলি–এটা একটা আবাসিক স্কুল। সরকারি নিয়ম অনুসারে আপনি, আমি, হোস্টেল সুপার, দারোয়ান, সুইপার, ওয়ার্ডেন এই ছয় জন চব্বিশ ঘন্টা এখানে থাকব। পুলিশ মিলিটারি যেমন ব্যারাকে থাকে সেই রকম। যেন দরকার পড়লেই পাওয়া যায়। তবে ডিউটি হবে ওই আট ঘন্টাই। আপনার জন্য একটা ছাড় আছে। আপনি ম্যানেজিং কমিটির অনুমতি ক্রমে অন্যত্র থাকতে পারেন কিন্তু তা যেন কোনক্রমে এই স্কুল থেকে তিন কিলোমিটারের চেয়ে অধিক দূরত্বে না হয়।
মুচকে হাসি আমি–অথচ দেখেন বড়দি, আপনি জয়নগর থেকে আসা যাওয়া করছেন। জয়নগর কত দূর। তবু কেউ কিছু বলছে না। ছাড় দিয়েছে।
এবার বড়দি ধৈর্য হারান–এসব আপনি পেলেন কোথায়। কে বলেছে?
বই। বই বলেছে। আপনাকে কেউ বলেনি, আমি বই পড়ি। শুধু পড়ি না লিখিও। লিখতে গেলে তো পড়া লাগে।
আমি যে লিখি সেটা এখনো কারো তেমন একটা বিশ্বাস হয় না। হতে পারে যে অন্য কেউ এমন একজন আছে যার নাম আমার নামে। হতে পারে আমি কারো লেখা নিজের বলে চালাচ্ছি। হতে পারে–কী ছাই যে হতে পারে মাথা মুন্ডু কিছু বোঝার উপায় নেই। ফল মার্কশিট দেখিয়ে চাকরি করছি। হাতের লেখা কাকের ঠ্যাং বগের ঠ্যাং, ছুটির দরখাস্তে ইনচার্জ বানানের জায়গায় ইনচার্য লিখি, আমি লেখক হলে চামচিকেও পাখি।
টিচার ইনচার্জ ফরসা মানুষ। মেয়ে জামাইয়ের সামনে অপমানে সে মুখ লাল। তর্কে না পেরে সেই ব্রহ্মাস্ত্র ছোঁড়েন তিনি, যে অস্ত্রে আমার মতো সব ছোট কর্মী ঘায়েল।
আমি কিন্তু বড় সাহেব এলে তাকে জানাব। উনি বলে গেছেন এই স্কুলে কোনো ঘড়ি ঘন্টা দেখে কাজ করা চলবে না।
বলি–নিশ্চয় তাকে বলবেন। বলা তো দরকার। কারণ স্কুলটা তো তার। তিনি যা বলবেন তাই তো হবে। আমরা সবাই তো তার চাকর। কেউ কম বেতনের ছোট চাকর কেউ বেশি বেতনের বড় চাকর। মালিক কেউ নই। উনি তো এও বলেছিলেন, সবাইকে সব কাজ করতে হবে। করে সবাই সব কাজ? যে এত বড় নেতা হয়ে নিজে মাথায় করে মাটির ঝুড়ি বয়ে নেন, তার দয়ায় চাকরি পাওয়া লোক এক কাপ চা ঢেলে খেতে চায়না, ওতে নাকি তার সম্মান চলে যায়। বলবেন আপনি যা বলার, আমিও বলব।
কথা শেষ করে আমি আমার ছাদে যাবার সিঁড়িতে সবে পা দিয়েছি, ছুটে এসে আড়ালে টেনে নিয়ে গেল দারোয়ান দাস–কই ছিলেন ঋণ রাখিনা। এত তাড়াতাড়ি ঋণ সুইধ্যা দিবেন ভাবতে পারি নাই।
এই বোধহয় বস্তুবাদী দর্শনের ব্যাখ্যায় ঐক্যের মধ্যে দ্বন্দ্ব আবার দ্বন্দ্বের মধ্যে ঐক্য। কোনো এক সময় দাসদা বড়দির কাছে ঝাড় খেয়েছিল। সে কিছু করতে পারেনি। এখন তারই মতো আর এক চতুর্থ শ্রেণীর কর্মীর কাছে বড়দিকে অপদস্ত হতে দেখে সে আনন্দিত। এখন আমি তার মিত্র। আর শত্রু নেই। পুরানো শোক ম্লান।
তবে কিছুক্ষণ পরে তার হাসি মুখ কালো হয়ে যায়। বলে–তবু আমার মনে হয় বড়দিকে এইভাবে বলাটা ঠিক হয় নাই। ওনার পোস্টটাতো বড়। তার একটা সম্মান আছে।
বলি–আপনার সেই ইঁদুরের গল্পটা কী জানা আছে?
আছে আছে। বলে দাস, একটা ইঁদুর বিড়ালের তাড়া খেয়ে এক মুনির কোলে গিয়ে লুকায়। তখন মুনি তাকে বিড়াল বানিয়ে দেয়। একদিন বিড়ালটাকে কুকুরে তাড়া করে তা দেখে মুনি বিড়ালটাকে কুকুর বানায়। এইভাবে একদিন কুকুরকে বাঘ বানিয়ে দেয় মুনি। তারপর বাঘ একদিন মুনিকেই খেতে যায়, সেই গল্প তো?
বলি–সেই গল্প তবে একটু ভিন্ন। এখানে একমুনি একপাল ইঁদুরকে কাউকে বেড়াল কাউকে বাঘ এইসব বানিয়ে রেখেছে। আসলে সবাই ইঁদুর–কিন্তু তারা নিজের যোগ্যতায় নয়, মুনির দয়ায় এই সব হয়েছে। যাদের কাছে তারা রোয়াব ঝাড়তে চায়, ঝাড়ুক, আমরা যারা তাদের জন্ম ইতিহাস জানি, আমাদের কাছে কেন? ওরা আমাদের চেয়ে এই জন্য বড় হয়ে গেছে কারণ ওদের অনেক টাকা ছিল। আর কিছু নয়-স্রেফ টাকা। আমাদেরও যদি পাঁচ দশ লাখ খরচ করার দম থাকত, এইট নয়, এম.এ. পাশের সার্টিফিকেট কিনে আনতাম। কে বলতে পারে তখন আমি ওই চেয়ারে বসতাম কী না, যেখানে এখন উনি বসে আছেন।
চমকে ওঠে দাস–চুপ করেন। বিপদে পইড়া যাইবেন।
***
আরাম আয়েশের জায়গা, মাদার কিলার নামে খ্যাত মহিলার এটা সত্যিই বড় আরাম আয়েসেরই জায়গা। বাবু বাড়ির বাসন মেজে রান্না করে করে হাড় কালি হয়ে যাচ্ছিল। এতদিনে সুখ এসেছে কপালে। এই জন্যে লোকে বলে–ভগবানের রাজ্যে দেরি আছে অন্ধকার নেই। ভগবানকা দুয়রমে দের হ্যায় অন্ধেরা নেহী। সে যা হোক, দেরি হলেও পেয়েছেন তো। সেটাই আসল। এখন শেষপাতে পায়েসের মতো সব সুখ চেটে পুটে খাচ্ছেন।
