সে জানে না, তার জানার কথাও নয় যে চেষ্টা থাকলে কুঁজোও চিৎ হয়ে শুতে পারে। আমি ইতিমধ্যে চিৎ হয়ে গেছি চেষ্টার দ্বারা। সমাজ যাদের সম্মান করে সেই সব সম্মানীয় মানুষদের অনেকে আমার জীবন সংগ্রাম এবং লেখার প্রয়াসকে সাধুবাদ দেয়।
এই সবের ফলে আমার একটা ক্ষতি হয়ে গেছে। আত্মসম্মান বোধ বড় প্রবল হয়ে গেছে। আমি স্রষ্টা আমি শিল্পী, আমি শোষিত বঞ্চিত দলিত অত্যাচারিত প্রতিবাদী মানুষের মুখপাত্র। আমি যা লিখি–লেখার মধ্যেকার সেই প্রতিবাদমুখিনতা সঞ্চারিত হয়ে গেছে ব্যক্তি জীবনেও। সৃষ্টি এবং স্রষ্টা এক অবচেতন সময়ে মিলে মিশে একাত্ম হয়ে গেছে।
সেদিন দুপুরে সিঁড়িতে বসে একটা গল্প লিখছিলাম। এমন সময় ডাক্তার রায় আমাকে খুঁজতে এসে সেই অবস্থায় দেখে চোখ কুঁচকে বাঁকা হাসি হাসে। জানতে চায়–এটা কী হচ্ছে?
বলি, গল্প লিখছি।
ডাক্তার রায়ের জিভে যেন করাতের ধার–গল্প লিখে কী করবে? লেখক হবে! লেখক!
যদি হই আপনার কোনো আপত্তি আছে?
মুখ বেঁকিয়ে বলে ডাক্তার রায়, নিজের নাম লিখতে গাঢ় ফেটে যায়, সে হবে লেখক। পোঙায় নাই চাম–হরিকিষ্ট নাম। যান গিয়া কাপ দশেক চা বসান। বড়দির বাড়ি থেইক্যা লোক আইছে। আগে জল টল দেন। লিখন পড়ন ছাড়েন।
এতক্ষণ চোখে পড়েনি পিছনে আর একজন আছে। ডাক্তার রায়ের কথা শুনে হাসছে সে। শরীর জ্বলে আমার।
বলি, বড়দিকে গিয়ে বলেদিন, আমি এখন চা বানাতে পারব না। এটা আমার বিশ্রামের সময়। সকালের ডিউটি শেষ হয়ে গেছে। বিকালের ডিউটি শুরু হবে যখন তার কথা শুনব।
যা বলেছি, যেভাবে যে ভাষায় বলেছি সেটা তো রাজদ্রোহতুল্য অপরাধ। ডাক্তার রায় দ্রুত নেমে যায় সিঁড়ি বেয়ে নীচে।নালিশ করার একটা মস্ত সুযোগ ছাড়বে কেন? আর এটা তো আমার জানা কথা–যা বলেছি শুনলে সে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবে। উঠলেনও তাই। তিনিও তার বাড়ির লোকের সামনে নিজের প্রতাপ দেখাবার এমন সুযোগ ছাড়বেন কেন?
ছাদের সিঁড়িতে বসেই তার গর্জন শুনি–কেউ ওকে ডাকো তো।
ডাকতে এল বিহারি দারোয়ান। টিচার ইনচার্জ ডাক্তার রায়ের একান্ত অনুগত সে। স্কুলের কে কোথায় কী করছে, কী বলছে সব তার মাধ্যমে তারা পেয়ে থাকেন। বিহারি বর্তমানে সর্বক্ষণ স্কুলেই থাকছে। কিছুদিন পরে অন্যত্র থাকবে। সে জানে চাকরির প্রধান শর্ত বসের নেক নজরে থাকা। এখানে কাজ করা বা না করার কোনো গুরুত্বই নেই। বস খুশ তো সব খুশ।
এখন আমাকে টিচার ইনচার্জের সামনে যেতেই হয়। তার ঘরে ঢুকে দেখি আরো অনেক লোক। একজন তার মেয়ে, অন্যজন, যে তার জামাই হবে। আর একজন তার ছোট ভাই ছিল সম্ভবত।
রাগে গড়গড় করে বলেন তিনি, রায়দা আপনাকে চা বানাতে বলেছে। আপনি বলেছেন পারব না। বলেছেন?
বলেছি। ভয় পাচ্ছি না আমি, গলা বুক কাঁপছে না আমার। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ–এই দর্শনের উপর সুদৃঢ় আস্থায় শ্রম শ্রমিক মুনাফা মালিক নিয়ে আমি যদি কোন গল্প উপন্যাস লিখি, একজন শ্রমিক প্রতিনিধি মালিকের প্রতিনিধির সামনে যে যুক্তির অবতারণা করবে, এখন তাই করি। বড়দি যেরকম তার বাড়ির লোকেদের সামনে নিজের প্রতাপ প্রভাব দেখাবেন বলে আমাকে ডাকিয়ে এনেছেন, আমিও তো আমার শ্রেণির পক্ষ থেকে সচেতন সাহসী প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিচ্ছবি দেখাতে ইচ্ছুক।
বলি–সকালে সেই আধা অন্ধকার সময় থেকে দুপুর দেড়টা দুটো–প্রায় ছয় সাত ঘন্টা আগুনের সামনে ঝলসেছি। বিকেল থেকে রাত দুপুর, ছয় সাত ঘন্টা আবার খাটতে হবে। মাত্র দুপুরের কয়েক ঘন্টা আমার চান খাওয়া বিশ্রামের সময় থাকে। সেই সময় টুকুতেও যদি বিশ্রাম না দেন তাহলে কী করে পারা যায়।
রেগে ছিলেন দত্ত বাড়ির বউ। এখন আরো রেগে যান। বলেন–ওই সব বলবেন না। বলে কোনো লাভ হবে না। যারা রান্না করে তাদের চব্বিশ ঘন্টা ডিউটি। আপনি তো জেনে বুঝেই এই চাকরি করতে এসেছেন। যখন যা বলা হবে তখন তা করতে হবে।
কে আপনাকে বলেছে যে যারা রান্না করে চব্বিশ ঘন্টা ডিউটি তাদের? কোন কেতাবে লেখা আছে এমন অন্যায় কথা, দেখাতে পারবেন?
আমি বলছি।
ভুল বলছেন। ভারতবর্ষের কোথাও আর কারো আট ঘন্টার বেশি ডিউটি করাবার কোনো আইন নেই।
আপনাদের ইমারজেন্সি ডিউটি। অন্য ডিপার্টমেন্টের নিয়ম এখানে চলবে না।
হাসপাতাল, দমকল, পুলিশ, সেনাবাহিনী এইসব কটাই ইমারজেন্সি ডিপার্টমেন্ট। চব্বিশ ঘন্টা চালু। মনে রাখবেন ডিপার্টমেন্টটা ইমারজেন্সি। কিন্তু স্টাফ তা নয়। সবার আট ঘন্টা ডিউটি। কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে যদি কোনো কর্মচারিকে আট ঘন্টার অধিক সময় কাজ করতে হয় তার জন্য অধিক পারিশ্রমিক দিতে হয়। আমি এমনিতেই তো প্রতিদিন তিন চার পাঁচ ঘন্টা বেশি খাটছি। এর বেশি আর পারা যাবে না।
পারতে হবে। এখানে থাকতে হলে পারতে হবে। না পারলে চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে যান।
চলে তো যাবোই। বার বার বলার দরকার নেই। না পারলে তো চলে যেতেই হবে। তবে যখন আপনারা বলবেন–এসো, আসব, যখন বলবেন যাও, চলে যাব, ব্যাপারটা এত সহজ হবে না।
বড়দি এখন বাক্যহারা। কী করবেন আর কী বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। তখন আমি বলি, আপনার বোধহয় মনে নেই, অনেক বছর আগে আমেরিকা নামের এক দেশে শিকাগো নামের এক শহরে একদল শ্রমিক আট ঘন্টা কাজের দাবিতে লড়াই করেছিল। সেই আন্দোলন দমন করতে পুলিশ গুলি চালায়। আর বেশ কিছু শ্রমিক মারা যায়। তখন আন্দোলনরত অন্য শ্রমিকরা তাদের শহিদ সাথীদের রক্ত মাখা জামা কাপড় লাঠির মাথায় বেঁধে ফের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং বহু ক্ষয়ক্ষতির পরে তাদের আন্দোলন জয়যুক্ত হয়। সেই থেকে সারা পৃথিবীতে ওই আট ঘন্টা কাজের নিয়ম–আইন চলছে।
